মূত্রনালির সংক্রমণ ও প্রদাহ বলতে সাধারণত মূত্রথলির ও মূত্রদ্বারের সংক্রমণকে বোঝায়, যা সময়মত চিকিত্সা না করালে মূত্রনালি বা ইউরেটার এবং বৃক্ক বা কিডনির সংক্রমণ ও প্রদাহে রূপ নিতে পারে।

মূত্রনালির সংক্রমণ খুব বেশি দেখা দেয় মেয়েদের মধ্যে। কারণ মেয়েদের ক্ষেত্রে মূত্রদ্বার ও যোনিপথ খুব কাছাকাছি অবস্থান করে। মেয়েদের যোনিপথে নানা কারণে সংক্রমণ ও প্রদাহের সৃষ্টি হয় খুব সহজেই। যেমন ধরুন মাসিক ঋতুস্রাবের সময় যোনিপথে রক্তক্ষরণ হয়, এটা একটা স্বাভাবিক শরীরবৃত্তীয় ব্যাপার। কিন্তু রক্তে ব্যাকটেরিয়া বা জীবাণুর বংশবৃদ্ধির জন্য খুবই উপযুক্ত মাধ্যম। মাসিক ঋতুস্রাবের সময় অনেক ক্ষেত্রে মেয়েরা ময়লা, ছেঁড়া ও নোংরা নেকড়াজাতীয় কাপড় স্ত্রী-অঙ্গে ব্যবহার করেন, এতে জীবাণু প্রথমে যোনিপথে ও পরে তত্সংলগ্ন মূত্রনালিকে সংক্রমিত করে।

এ সময় যোনিপথে সন্তান প্রসবের কারণে নানা প্রকার ক্ষতের সৃষ্টি হয় এবং রক্তক্ষরণ ও রস নিঃসৃত হয়। শারীরিক দুর্বলতার জন্যও এ সময় জীবাণু সহজেই শরীরকে কাবু করে ফেলে। আগেই বলেছি, রক্তমিশ্রিত রস জীবাণুর বংশবৃদ্ধি ও বিস্তারে অত্যন্ত সহায়ক। তাই এ সময় জরায়ু ও যোনিপথের প্রদাহ এবং সংক্রমণের সঙ্গে মূত্রনালির সংক্রমণটা ঘটা খুবই স্বাভাবিক।

গর্ভবতী অবস্থায় ও প্রসব-পরবর্তী প্রচুর পরিমাণে পানি পান করা উচিত। এ সময় পানি কম খেলে মূত্রনালির প্রদাহ ও সংক্রমণ বেড়ে যায়। কারণ গর্ভকালে মেয়েদের শরীরের প্রোজেসটেরন নামক এক প্রকার স্ত্রী হরমোন খুব বেশি পরিমাণে নিঃসৃত হয়। এ হরমোনের প্রভাবে শরীরের নরম ও মসৃণ মাংসযুক্ত নালিগুলো সমপ্রসারিত হয়। ফলে মূত্রবাহী নালিও সমপ্রসারিত হয়। এর ফলে ওই সময় পানি কম খেলে প্রস্রাবের বেগ আরও কমে যাবে এবং প্রস্রাবের কিছুটা তলানি সবসময় মূত্রবাহী নালিতে জমে থাকার আশঙ্কা থাকবে, যা জীবাণু বৃদ্ধির জন্য খুবই সহায়ক। তাই গর্ভাবস্থায় প্রস্রাবের প্রদাহ এবং মূত্রনালির সংক্রমণ ও প্রদাহ বেশি হয় অন্য সময়ের চেয়ে।

লক্ষণগুলো
—মূত্রনালি এবং বৃক্ক বা মূত্রগ্রন্থির বা মূত্রথলির প্রদাহ হলে প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া করবে।
—প্রস্রাব পরিমাণে কম হতে পারে।
—খুব ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ হবে।
—তলপেটে ব্যথা ও যন্ত্রণা হবে। প্রস্রাব করার পরও রোগী অস্বস্তি ও যন্ত্রণা থেকে রেহাই পাবে না এবং বারবার সে বাথরুমে ছুটে যাবে কিংবা দীর্ঘসময় প্রস্রাবের জন্য বসে থাকবে।
—কাঁপুনি দিয়ে জ্বর হবে এবং জ্বরের সময় বেশ শীত অনুভূত হবে।
—রোগিণী বেশ অসুস্থ ও দুর্বল থাকবে।

প্রতিকার কী?
এ প্রদাহ বা সংক্রমণের প্রকোপকে অতি সহজেই প্রতিকার করা সম্ভব। আর তা হলো একটিমাত্র সহজ উপায় এবং এতে কোনো টাকা-পয়সাও খরচ করতে হয় না। আজকের দুর্মূল্যের বাজারে টাকা-পয়সার কথাটাও ভাবতে হবে বৈকি। এই আপাত সহজ অথচ মারাত্মক পরিণতির হাত থেকে রেহাই পাওয়ার একমাত্র উপায় প্রচুর পরিমাণে পানি পান করা। সারা দিন অন্তত ১৫/২০ গ্লাস পানি বা পানিজাতীয় খাবার খাবেন, যেমন ধরুন শরবত, ডাবের পানি, ফলের রস ইত্যাদি। ডাব প্রস্রাবের বা মূত্রনালির সংক্রমণ প্রতিকারে খুবই উপকারী।
এছাড়া মাঝেমধ্যে প্রস্রাবের প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা করে দেখা উচিত কোনো প্রকার জীবাণু সংক্রমণ আছে কি-না। বিশেষ করে গর্ভাবস্থায় নিয়মিত চেকআপ করানো এবং প্রস্রাবে অ্যালবুমিন এবং সুগার আছে কিনা তাও অবশ্যই দেখতে হবে।

মূত্রনালির সংক্রমণে ক্ষতির আশঙ্কা
মূত্রনালির প্রদাহে ও সংক্রমণে শরীরে সমূহ ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। এ জাতীয় প্রদাহ ও সংক্রমণে আস্তে আস্তে কিডনি বা বৃক্ক আক্রান্ত হয়ে কিডনির কার্যক্ষমতা নষ্ট করে ফেলতে পারে। এছাড়া জ্বরের প্রকোপে ও প্রস্রাবের অসহ্য জ্বালা-যন্ত্রণায় রোগিণী খুব দুর্বল ও ভগ্নস্বাস্থ্য হয়ে পড়ে। এটি বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে, মূত্রনালি সংক্রমণের চিকিত্সা যথাসময়ে না করালে কিডনি নষ্ট হয়ে যাওয়ার এবং রোগিণীর প্রাণনাশের সমূহ আশঙ্কা থাকে।

মূত্রনালি প্রদাহ ও সংক্রমণ খুবই ছোঁয়াচে রোগ এবং এ রোগের জীবাণু খুব সহজেই সংক্রমিত হতে পারে। মূত্রনালি, মূত্রথলির বা কিডনির কোনো প্রকার প্রদাহ ও সংক্রমণ যাতে না হয় সেজন্য সামান্য সতর্কতাই যথেষ্ট। যেমন—সব সময় প্রচুর পানি পান করা, গর্ভবতী মায়েদের নিয়মিত চেকআপ করানো এবং প্রদাহ বা সংক্রমণের সামান্য লক্ষণ প্রকাশ পেলে সত্বর চিকিত্সার ব্যবস্থা নেয়া উচিত। এতে আমরা সুস্থ থাকব এবং কিডনি হারানোর মতো গুরুতর বিপত্তির হাত থেকে রক্ষা পাব।


*************************
প্রফেসর ডাঃ সুলতানা জাহান
লেখক : সাবেক চেয়ারম্যান ও বিভাগীয় প্রধান
গাইনি অ্যান্ড অবসেটট্রিকস বিভাগ, বিএসএমএমইউ
দৈনিক আমার দেশ, ২৭ এপ্রিল ২০১০।