কাঁধের জোড়ার বার বার ডিসপ্লেসমেন্ট হলে
মানব শরীরের একটি জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ জোড়া। অন্যান্য জোড়ার তুলনায় কাঁধের জোড়ায় সব চেয়ে বেশী মুভমেন্ট হয় বলেই এই জয়েন্ট অতি সহজেই ডিসপ্লেসমেন্ট বা ডিসলোকেশন হয়। কোন জোড়া একের অধিক ছুটে গেলে তাকে রিকারেন্ট ডিসলোকেশন (ডিসপ্লেসমেন্ট) বা রিকারেন্ট সাবল্যক্সাশন বলে। একবার জোড়া ডিসপ্লেসমেন্ট হলে পরবর্তীতে জয়েন্ট ছুটে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে শতকরা ৮৬.৬ ভাগ এবং ইহা প্রথম আঘাতের ২ বৎসরের মধ্যে শুরু হয়। স্ক্যাপুলার গ্লেনয়েড ক্যাভিটি ও হিউমেরাল হেড-এই দুই হাড়ের সমন্বয়ে কাঁধের জয়েন্ট গঠিত। ল্যাবরোক্যাপসুলার কমপ্লেক্স, লিগামেন্ট এবং রোটাটর কাফ মাংস বেশী দ্বারা কাঁধের জোড়ার স্ট্যাবিলিটি মেইনটেন হয়।

জোড়া ডিসপ্লেসমেন্টর কারণ সমূহঃ

১. আঘাতের কারণে কাঁধের জোড়া ডিসপ্লেসমেন্ট হয় শতকরা ৬০ ভাগ। ২. ক্যাপসুলো ল্যাবরাল ছিড়ার দিকে ৬৫% ডিসপ্লেসমেন্ট হয়। ৩. বেশীরভাগ ক্ষেত্রে জয়েন্ট ডিসপ্লেসমেন্ট হয় সামনের দিকে (৯৫%)। পিছনের দিকে ৪% ভাগ এবং নীচের দিকে ১% ভাগ ডিসপ্লেসমেন্ট হয়।

৪. জন্মগতভাবে জয়েন্টের লিগামেন্ট ও ক্যাপসুল ল্যাক্সিটি থাকলে জয়েন্ট সব দিকে ডিসপ্লেসমেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। একে মাল্টি ডিরেকশনাল ইনস্ট্যাবিলিটি বলে। ৫. ক্রিকেট, ভলিবল, বাস্কেটবল, জ্যাবলিন থ্রো খেলোয়ারদের মাঝে শোল্ডার জয়েন্ট ডিসপ্লেসমেন্টের সম্ভাবনা বেশী। ৬. মৃগী রোগী খিচুনির জন্য পরে গেলে জোড়া ডিসপ্লেসমেন্ট হয়। ৭. ইলেকট্রিক শকের কারণে পিছনের দিকে জোড়া ডিসপ্লেসমেন্ট হয়। ৮. স্ট্রোক এবং পেশী দুর্বলতা রোগের জন্য বেশী দুর্বল হলে জোড়া ডিসপ্লেসমেন্ট হয়। ৯. জোড়া প্রথম ডিসপ্লেসমেন্টের পরবর্তী রিহেবিলিটেশন ভালভাবে না হলে জোড়া বারবার ছুটে যায়।

জয়েন্ট ডিসপ্লেসমেন্টের লক্ষণসমূহঃ

১. কাঁধে ব্যথা হয়। তবে বার বার জয়েন্ট ডিসপ্লেসমেন্ট হলে কাঁধে কম ব্যথা অনুভব হয়। ২. ডিসপ্লেসমেন্টের পর বাহু একটি নির্দিষ্ট অবস্থানে থাকে এবং নাড়ানো যায় না। ৩. কখনও জোড়া কিছুটা ডিসপ্লেসমেন্টে হয় এবং স্ঁতঃস্ফুর্ত বসে যায়। এক্ষেত্রে শুধু ব্যথা অনুভব হয়। ৪. হয়েন্টে ডিসপ্লেসমেন্ট হলে জয়েন্টের জায়গায় ফাঁকা এবং ডিসপ্লেসমেন্টের জায়গায় ফুলা দেখা যাবে। ৫. ঘুমের মধ্যে, সাতরানোর সময় এবং খেলার মধ্যে বাহুর নির্দিষ্ট একটা মুভমেন্টের জন্য কাঁধের জোড়া ছুটে যায়। ৬. জোড়া প্রথম ডিসপ্লেসমেন্ট হওয়া ৪০% রোগীর ক্ষেত্রে হিউমেরাল হেডে ফ্র্যাকসার বা হিল স্যাকস লেশন হয়। ৭. বারবার জোড়া ডিসপ্লেসমেন্টের জন্য গ্লেনয়েড রিম (বোনি ব্যাংকার্ট) ভেঙ্গে যায়। ৮. জয়েন্ট বারবার ডিসপ্লেসমেন্টের জন্য ওসটিওআর্থ্রাইটিস হয় এবং জয়েন্ট নষ্ট হয়। ৯. জয়েন্টে পেইন হয় এবং জোড়া ষ্টিফ হয় বা জমে যায়। ১০. বয়স্কদের জোড়ার পেশী ছিড়ে যায় এবং হাত উপরে তুলতে পারে না। ১১. স্ক্যাপুলার অনিয়মত মুভমেন্ট হয়, পেশী শুকিয়ে যায় এবং পিঠে ব্যথা হয়।

চিকিৎসাঃ কাঁধের জোড়া ডিসপ্লেসমেন্টের চিকিৎসার আগে এক্সরে, আর্থোগ্রাফী, আলট্রাসনোগ্রাফী বা এম, আর, আই এর মাধ্যমে রোগের ডায়াগনোসিস করতে হবে। এক্স-রে এর বিভিন্ন ভিউ দ্বারা রোগীর অসুবিধা এবং রোগীকে শারীরিক পরীক্ষার মাধ্যমে অতি সহজেই এই রোগ ডায়াগনোসিস করা সম্ভব। রিকারেন্ট শোল্ডার ডিসপ্লেসমেন্টের মেডিকেল বা কনজারভেটিভ চিকিৎসা খুবই সীমিত এবং সার্জিকেল চিকিৎসাই প্রধান। বাহুর যে মুভমেন্টে কাঁধের জোড়া ছুটে যায়, সেই ধরনের মুভমেন্ট না করা এবং পেশী শক্তিশালী হওয়ার ব্যায়ামের সাহায্যে কিছু সময়ের জন্য সুস্থ্য থাকা যায়। বিভিন্ন পদ্ধতির অপারেশন করা যায়, তবে প্রতিটিরই সুবিধা ও অসুবিধা আছে। এর মধ্যে “ল্যাটারজেন্ট” (ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এই অপারেশন করা হয়) পদ্ধতিতে অপারেশন করা হলে জোড়ার স্ট্যাবিলিটি বেশী হয়। বর্তমানে হাড় ও জোড়ার চিকিৎসার এক সফল ও কার্যকর সমাধান এনেছে বিস্ময়কর আর্থ্রোস্কোপিক সার্জারী। এটি হলো অর্থোপেডিক চিকিৎসায় বর্তমান যুগের সর্বশেষ ও সর্বাধুনিক পদ্ধতি। আর্থ্রোস্কোপিক সার্জারী মূলত মিনি ইনভেসিভ বা কি হোল (কবু ঐড়ষব) সার্জারী অর্থাৎ ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে ক্যামেরাযুক্ত যন্ত্র (স্কোপ) জোড়ায় প্রবেশ করিয়ে এবং যন্ত্রের সাথে যুক্ত বাহিরে টিভি স্ত্র্নিন বা মনিটর দেখে ল্যাবরাম, ক্যাপসুল ও লিগামেন্ট রিপেয়ার করা হয়। এই পদ্ধতিতে রোগী অতি তাড়াতাড়ি সুস্থ্য হয়ে উঠে।

**************************
ডাঃ জি এম জাহাঙ্গীর হোসেন
কনসালটেন্ট, হাড, জোড়া ট্রমা ও আর্থ্রোস্কোপিক সার্জারী
ডিজিল্যাব মেডিকেল সার্ভিসেস, মিরপুর, ঢাকা।
দৈনিক ইত্তেফাক,  ১০ এপ্রিল ২০১০।