হৃদরোগ কীঃ
হৃদরোগ যা হার্ট ডিজিজ বা কার্ডিওভাসকুলার নামে পরিচিত। এটি হৃদযন্ত্র এবং রক্তনালীর কতিপয় রোগ যাকে সমষ্টিগতভাবে হৃদরোগ নামে অভিহিত করা হয়। বর্তমানে উন্নত বিশ্বে এক নম্বর মরণব্যাধি হলো হৃদরোগ। হৃদরোগের বিশাল ছাতার নিচে অর্-ভূক্ত হলোঃ হৃদযন্ত্রের রোগ (হৃদযন্ত্রে রক্ত সরবরাহকারী ধমণী, হৃদপেশী ও কপাটিকার বিভিন্ন ধরনের রোগ), রক্তনালীর রোগ (যে সকল ধমনী ও শিরা হৃদযন্ত্র হতে ও হৃদযন্ত্র্রে রক্ত বহন করে নিয়ে যায় তাদের রোগ) এবং জন্মগতভাবে হৃদযন্ত্রে ত্রুটি।

হৃদরোগের প্রকারভেদ;
করোনারি হার্ট ডিজিজঃ হৃদযন্ত্রের ধমণীগুলো (যা হৃদযন্ত্রকে খাবার সরবরাহে সাহায্য করে) সরু হয়ে যাওয়াই এ রোগের কারণ। যার ফলে পরিমানমত অক্সিজেনযুক্ত রক্ত হৃদযন্ত্র পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। বুকে ব্যথা এবং হার্ট অ্যাটাকের মত উপসর্গ এ রোগের কারণেই হয়ে থাকে।

কার্ডিওমায়োপ্যাথিঃ
এটি হৃদযন্ত্রের মাংসপেশির রোগ। যে কোনো কারণে হৃদযন্ত্রের মাংসপেশির কার্যক্ষমতা কমে যায়। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি হঠাৎ মৃত্যুবরণও করতে পারেন।

কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজঃ
এ রোগ হৃদযন্ত্র এবং রক্তনালীতন্ত্রের পরিবর্তন সাধন করে। প্রধানত যে সকল শিরা ও ধমনী হৃদযন্ত্রে ও হাদযন্ত্র হতে রক্ত বহন করে নিয়ে যায়। উল্লেখযোগ্য কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজগুলো হলো-ইসকেমিক হার্ট ডিজিজ, হার্ট ফেইলুøর, কর পালমোনালি, হাইপারটেনসিভ হার্ট ডিজিজ, ভালভুলার হার্ট ডিজিজ ইত্যাদি।

হার্ট অ্যাটাকের ওয়ার্নিং সাইনঃ
 ০ বুকে ব্যথা বা অস্বস্থি বোধ করা ০ হাতে, গলায়, চোয়ালে, দাঁতে বা পিঠে ব্যথা হওয়া ০ বমি ভাব, বদ হজম বা বমি হওয়া ০ শরীরে ঘাম হওয়া বা ত্বক ঠান্ডা হয়ে যাওয়া ০ শ্বাস-প্রশ্বাসে কষ্ট হওয়া

কী করণীয়ঃ
হৃদরোগে আক্রান্ত হলে ব্যক্তিকে যতো দ্রুত সম্ভব নিকটস্থ কার্ডিয়াক হাসপাতালে বা অন্য হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। যেখানে কার্ডিয়াক কেয়ার ইউনিটের ব্যবস্থা আছে সেখানে স্থানা-র করতে হবে। কেউ যদি বুকে অস্ঁি- বোধ করেন তাহলে তাঁর জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসা প্রয়োজন। কোনো ক্রমেই বেশি সময় ক্ষেপন করা যাবে না। হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত জরুরি পদক্ষেপগুলো গ্রহন করা যেতে পারেঃ

০ অ্যাম্বুলেন্সের জন্য যে কোন কার্ডিয়াক হাসপাতালে জরুরি বিভাগে ফোন করতে হবে ০ আক্রান্ত ব্যক্তিকে শুইয়ে বা বসিয়ে রাখতে হবে ০ আক্রান্ত ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করে জেনে নিতে হবে, তিনি বুকে ব্যথা কমানোর জন্য পূর্বে থেকে কোনো ওষুধ খেয়ে থাকলে তাকে সেই ওষুধ খাওয়াতে হবে ০ অ্যাসপিরিন অ্যালার্জি না থাকলে তাকে তা খাওয়াতে হবে ০ নিজে শা- থেকে এবং আক্রান্ত ব্যক্তিকে উত্তেজিত না করে প্রতিটি পদক্ষেপ নিতে হবে ০ শ্বাস বন্ধ হয়ে গেলে মুখে মুখ দিয়ে কৃত্রিমভাবে শ্বাস প্রশ্বাস শুরু করতে হবে ০ পালস্‌ বন্ধ হলে সিপিআর শুরু করতে হবে

পরীক্ষা-নিরীক্ষাসমূহঃ
 হৃদরোগ নিরুপণে সাধারণত নিম্নলিখিত পরীক্ষা নিরীক্ষাসমূহ করা হয়ে থাকে; (ক) শারীরিক পরীক্ষাঃ

০ রোগীর পালস্‌ এবং ব্লাড প্রেসার মাপা ০ রোগীকে সার্বিকভাবে পর্যবেক্ষন করা ০ হৃদযন্ত্রের শব্দ অস্বাভাবিক কিনা তা শোনা ০ শ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ অস্বাভাবিক কিনা তা শোনা ০ পেটে রক্ত প্রবাহের শব্দ শোনা ০ রোগীকে প্রশ্ন করে জেনে নেয়া-হার্ট অ্যাটাকের পূর্বে উপসর্গ কি ছিলো, পূর্ব থেকে কি কি ওষুধ সেবন করেন, পরিবারের অন্য কারো হৃদরোগ আছে কিনা এবং ইতিপূর্বের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসার ইতিহাস।

(খ) রক্ত পরীক্ষাঃ
 ০ রক্তনালীর ভেতর দিয়ে রক্ত চলাচলে গতি ০ রক্ত জমাট বাঁধার কারণ ও উপাদান ০ রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমাণ ০ রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ ০ রক্তে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ

(গ) অন্যান্য পরীক্ষাঃ
০ ইসিজি ০ বুকের এক্স-রে ০ ডপলার আল্ট্রাসনোগ্রাফি ০ ইকোকার্ডিওগ্রাম ০ হল্টার বা ইভেন্ট মনিটরিং ০ ইটিটি ০ এনজিওগ্রাফি ০ ইলেট্রোফিজিওলজি স্টাডিজ ০ কাডিয়াক ক্যাথেটারাইজেশন ০ থ্যালিয়াম স্ক্যান ০ টিল্ট টেবিল এক্সামিনেশন ০ ট্রান্স ইসোফেজিয়াল ইকোকার্ডিওগ্রাম

হৃদরোগের চিকিৎসাসমূহঃ

ক. মেডিকেল ট্রিটমেন্টঃ
০ রোগের অবস্থা বুঝে ওষুধ প্রয়োগঃ ০ বুকের ব্যথা কমানোর জন্য ০ কোলেস্টেরল কমানোর জন্য ০ হার্ট ফেইল্যুর হলে ০ উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য ০ অনিয়মিত হার্ট রেট সংশোধনের জন্য।

খ. ইন্টারভেনশনাল পসিডিউরঃ
০ পিটিসিএ বা পিসিআই বা এনজিওপ্লাস্টি ০ পিটিএমসি ০ পিপিআই ০ আর এফ এ

গ. সার্জিকেল ট্রিটমেন্টঃ
০ বাইপাস সার্জারি বা সিএবিজি ০ হার্টের ভালভ্‌ কার্যকর বা পরিবর্তন করা ০ ভেন্ট্রিকুলার রি-সেকশন বা রিমডেলিং ০ হার্ট প্রতিস্থাপন

প্রতিরোধ ব্যবস্থাঃ
দৈনন্দিন কতিপয় জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে হৃদরোগের প্রতিরোধ করা সম্ভব যেমনঃ ০ ধূমপান না করা ০ উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং উচ্চ কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা ০ প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০ থেকে ৬০ মিনিট শারীরিক ব্যায়াম করা ০ স্বাস্থ্যসম্মত খাবার গ্রহণ করা ০ সঠিক শারীরিক ওজন রক্ষা করা ০ মানসিক চাপ কমানো বা নির্বাহ করা ০ ভালো স্বাস্থ্যভ্যাস গড়ে তোলা

**************************
ডাঃ পারভেজ আহমদ
দৈনিক ইত্তেফাক,  ২৪ এপ্রিল ২০১০।