অস্টিওপোরোসিস এমন একটি রোগ, যা হলে মানুষের শরীরের হাড়গুলো ক্ষয়ে গিয়ে হালকা-পাতলা ও ভঙ্গুর হয়ে যায়। অস্টিওপোরোসিস হলে সামান্য আঘাতেও পিঠ ও কোমরের এর হাড়গুলো ভেঙ্গে যেতে পারে। হিপ-এর হাড় ভেঙ্গে গেলে হাসপাতালে ভর্তি হওযার ঝামেলা পোহাতে হয়। আর মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙ্গে গেলে পিঠে প্রচণ্ড ব্যথা হয়। আর যে কোনও হাড় ভাঙ্গা মানেই হল-এক ধরনের শারীরিক অক্ষমতা বা ডিজ-অ্যাবিলিটি, যা কারোরই কাম্য হতে পারে না। অস্টিওপোরোসিস রোগে আক্রান্ত হওয়া না- হওয়া কতগুলো ফ্যাক্টরের ওপর নির্ভর করে। যেমন-আপনার শৈশবকালে দেহের হাড়গুলো তকটা মজবুত ও শক্ত ছিল, বয়সকালে আপনার স্বাস্থ্য, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম ইত্যাদি।

অস্টিওপোরোসিসের কারণঃ শৈশবকালে মানবদেহে নতুন হাড় দ্রুত তৈরি হয় ও পুরানো হাড়ের সাথে যুক্ত হয়। এ সময়ে বিদ্যমান হাড়গুলো খুব ধীরে-ধীরে ক্ষয় হয়। ৩০ বছর বয়সের পরে ব্যাপারটি ঘটে ঠিক উল্টো। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবে বয়সবৃদ্ধি জনিত কারণে হাড় ক্ষয়ে যেতে থাকে। নতুন হাড় তৈরি হওয়ার আগেই পুরানো হাড়গুলো আরও ক্ষয়ে যায়। ফলে হাড়ের পুরুত্ব কমে যায়, হাড় পাতলা হয়ে যায়। শিশুকালে যাদের ‘বোন মিনারেল ডেনসিটি’ ঠিকমতো থাকে না, তারা পরবর্তীতে অস্টিওপোরোসিসে আক্রান্ত হতে পারেন। ক্যালসিয়াম, ভিটামিন-ডি ফসফরাসের অভাবজনিত কারণেও অস্টিওপোরোসিস হতে পারে। ৫০ বছর বয়সের পর মহিলাদের ক্ষেত্রে ইস্ট্রোজেনের অভাজজনিত কারণে এবং পুরুষদের ক্ষেত্রে টেস্টোস্টেরনের অভাবজনিত কারণেও অস্টিওপোরোসিস রোগ দেখা দিতে পারে। অস্টিওপোরোসিস রোগের পারিবারিক ইতিহাস থাকলে পরবর্তী বংশধরদের মাঝেও অস্টিওপোরোসিস হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়।

এ রোগের লক্ষণঃ আসলে অস্টিওপোরোসিস একটি নীরব রোগ। এ কারণে প্রাথমিক পর্যায়ে আপনি এর কোনও উপসর্গ টের পাবেন না। রোগটি যত পুরোনো হবে, আপনি তত বেশি করে লক্ষণগুলো বুঝতে পারবেন। অস্টিওপোরোসিস রোগের প্রধান লক্ষণ হল-পিঠে ব্যথা। এ ছাড়া অন্যান্য লক্ষণগুলো হল-উচ্চতা কমে যাওয়া, মেরুদণ্ড বেঁকে যাওয়া, অল্প আঘাতেই হিপ, মেরুদণ্ডের স্পাইন ভেঙ্গে যাওয়া।

ডায়াগনোসিসের কৌশলঃ চিকিৎসকগণ রোগীর মেডিকেল ইতিহাস, ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা ও বোন মিনারেল ডেনসিটি টেস্ট নামক একটি টেস্টের মাধ্যমে অস্টিওপোরোসিস রোগ নির্ণয় করে থাকেন। এছাড়াও মেরুদণ্ডের এক্স-রে করতে হয়। বোন মিনারেল ডেনসিটি টেস্টে হাড়ের পুরুত্ব পরিমাপ করা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগটি ধরা পড়লে এবং ঠিকমতো চিকিৎসা নিলে হঠাৎ করে হাড় ভাঙ্গার হাত থেকে আপনি রক্ষা পেতে পারেন। কাজেই উপরের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শে বোন মিনারেল ডেনসিটি টেস্ট করিয়ে নিশ্চিত হোন।

এ রোগের চিকিৎসাঃ বয়স বাড়ার সাথে সাথে হাড় পাতলা হয়ে যাওয়া একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এটিকে পুরোপুরি বন্ধ করা না গেলেও হাড়ক্ষয়ের মাত্রা ধীর করে দেয়া সম্ভব। আর এ জন্যে আপনার জীবন-যাপন পদ্ধতিতে আনতে হবে ব্যাপক পরিবর্তন। ধূমপানের অভ্যাস থাকলে ছেড়ে দিন। প্রতিদিন পরিমিত পরিমাণে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন-ডি সমৃদ্ধ খাবার খাবেন। নিয়মিত ব্যায়ামের অভ্যাস গড়ে তুলুন, তাহলেই আপনি ও আপনার হাড়ের স্বাস্থ্য ভালো থাকবে। হাড়ক্ষয় কমানোর জন্য এবং হাড়ের পুরুত্ব বাড়ানোর জন্য আপনার চিকিৎসক আপনাকে কতগুলো ওষুধ দেবেন। এ ওষুধগুলো নিয়মিত খাবেন। তবে ওষুধ খাওয়ার পাশাপাশি ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন-ডি সমৃদ্ধ খাবার খেতে ভুলবেন না।

**************************
ডাঃ জামশেদ রানা মামুন।
দৈনিক ইত্তেফাক,  ২৪ এপ্রিল ২০১০।