এমন কিছু লোক আছেন যাদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রায় সময় নেতিবাচক। ছোট কাজ করতে গিয়ে, ঘেমে নেয়ে একশত, গ্লাসের অর্ধেক পানি থাকলে সবসময় একে অর্ধেক খালি গ্লাস দেখতে অভ্যস্ত, বন্ধু বান্ধব নেই, বন্ধুর করতেও পরেননা লোকের সঙ্গে, মনের অনুভূতি সবসময় ভেতরেই পুষে রাখেন। চরিত্রে এমন সব নেতিবাচক জিনিষের মিশেল থাকলে হ্নদপিন্ডের জন্য এটি বড়ই খারাপ। গবেষকরা ইদানীং বলছেন ‘হ্নদরোগ ব্যক্তিত্ব’ বলে একটি কথা থাকতে পাবে। আশির দশকে নব্বই এর দশকে যথাক্রমে টাইপ এ ও টাইপ বি ব্যক্তিত্ব নিয়ে বেশ তেলপাড় হয়েছিল। পরে এ ধরনের ব্যক্তিত্ব তেমন গুরুত্ব পায়নি। ‘টাইপ ডি’ ব্যক্তিত্ব ওগুলোর মত এত সরল সহজ ব্যাখা দেয়না।


এক দশক ধরে নেদারল্যান্ডসের বিজ্ঞানীরা ডি টাইপ ব্যক্তিত্ব নামে এক ধরণের লোক চিহ্নিত করেছেন এবং এদের সঙ্গে হৃদরোগের বিভিন্ন ধরনের সম্পর্ক সন্ধান করছেন।


নেদারল্যান্ডের টিলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিজ্ঞানী জোহান ডেনোল্লেট বলেন, ’D মানে ’distressed’।” D টাইপ মানে তাহলেত বিপর্যস্ত মানুষ, বলা যায়। জোহান ডেনোল্লেট এনিয়ে গবেষণাকরছেন। টাইপ ডি লোক থাকেন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, বদমেজাজি এবং এরা নিরাপত্তার অভাবে ভুগেন। এরা সবকিছুতে সমস্যা খুঁজে পান, আনন্দ খুঁজে পাননা। তাঁরা চান সবাই তাদের ভালোবলুক, পছন্দ করুক। তাই অন্যে পছন্দ করবে না এজন্য সত্য কথাও মুখ ফুটে অনেক সময় বলেন না বা সঠিক কাজটি করেন না। এজন্য সব সময় যেন তারা ঝিইয়ে থাকেন, টেনসনেও ভোগেন।


টাইপ ডি ও হৃৎপিন্ড

ডাঃ ডেনোল্লেট এবং সহকর্মীরা হ্নদপিন্ডের উপর ডিপাইপ ব্যক্তিত্বের প্রভাব নানা দৃষ্টিকোন থেকে লক্ষ্য করেছেন। বছর দশেক আগে তাদের প্রথম রিপোর্ট প্রকাশিত হয়, এদের রিপোর্টে অন্তর্ভূক্ত ছিলেন ২৮৬ জন নারীও পুরুষ। তিনমাসের একটি কার্ডিয়াক পনুর্বাসন প্রোগ্রামে এদের চুকিয়ে একটি ব্যক্তিত্ব প্রশ্নাবলির মাধ্যমে যাচাই করা হলো। এদের একতৃতীয়াংশ ছিলেন ডিটাইপ ব্যক্তিত্ব।


আটবছর পর, গবেষকরা এদের মধ্যে কাঁরা বেচে আছেন এবং কারা মারা গেলেন সে খতিয়ান বের করলের। টাইপ ডি যারা এদের মধ্যে মৃত্যুহার ছিলো ২৭%, যারা ডি নন এদের মধ্যে মৃত্যুহার ছিলো ৭%। বেশিরভাগ মৃত্যু হয়েছিলো হার্ট এটাক অথবা স্ট্রোকে। তখন থেকে টাইপ ডি ব্যক্তিত্বের লোকদেরকে সম্পর্কযুক্ত করা হলো আগাম মৃত্যু হার্টএটাকের পর হ্নদপিন্ড রক্তবাহ সমস্যা হওয়ার ঝুকি বেড়ে যাওয়া হ্নদরোগের প্রচলিত ও প্রমাণিত চিকিৎসায় বালো সাড়া না দেওয়া হঠৎ হ্নদরোগ জনিত মৃত্যু। এসব বিষয়ের সঙ্গে সর্বশেষ রিপোর্টে ভিন্ন একটি ডাচ বিজ্ঞানীর দল ৯০০ নারী-পুরুষের তথ্য অনুসরণ করলেন যাদের ক্ষেত্রে অবরুদ্ধ একটি করোনারি ধমনী খোলার জন্য একটি নবউদ্ভাবিত ড্রাগ রিলিজিং স্টেন্টস ব্যবহার করা হয়েছিল। মাত্র নয়মাস পরে টাইপ ডি ব্যক্তিত্বসম্পন্ন বেশ কিছু লোক হার্টএটাকে মারা গেলেন অথবা হৃদরোগে আক্রান্ত হলেন।


সম্পর্কটি কি? কেউ স্পষ্ট করে জানে না। গবেষকরা বলছেন, টাইপ ডি ব্যক্তিত্বের লোকদের ইম্যুন ব্যবস্থা খুব বেশি সক্রিয়। এদের প্রদাহ হয় খুব বেশি। ফলে হ্নদপিণ্ডে রক্তনালীতে এমনকি সারা শরীরে আরো বেশি ক্ষতির সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এদের রক্তচাপও হঠাৎ বেড়ে যায় এর মানসিক চাপে বেশ বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়।


আরো গবেষণা প্রয়োজনঃ টাইপ ডি ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে শেষ কথা বলার সময় এখনো আসেনি। ডাঃ ডেনোল্লেট একে নিয়ে কাজ করছেন। ব্যক্তিত্বের ভিন্ন ভিন্ন উপকরণ যেমন বিষণ্নতা, উদ্বেগ, বিরূপ মনোভাব, সামাজিকভাবে নিঃসঙ্গতা আলাদা আলাদা বিবেচনা না করে গোটা ব্যক্তিত্বের ধাতকে বিবেচনা করা হ্নদরোগের ঝুঁকিপূর্ণ লোক সনাক্ত করা দ্রুততর ও কার্যকর হবে।


তবে এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির সমস্যা হলো, ব্যক্তিত্বের বিশেষ ধাত যেমন বিরক্তভাব, মেজাজ- যেমন বিষন্নতা বদলে ফেলা সহজ। ব্যক্তিত্বের ধরন পাল্টানো সহজ না হলেও।


তবে ডাঃ ডেনোল্লেট গবেষণার সীমাবদ্ধতা সম্বন্ধে সজাগ ও সচেতন, ভবিষ্যৎ ফলাফল দেবে এর উত্তর।



**************************
লেখকঃ অধ্যাপক ডাঃ শুভাগত চৌধুরী
ডাইরেকটর, ল্যাবরেটরী সার্ভিসেস,
বারডেম, ঢাকা।
দৈনিক ইত্তেফাক, ০৬ জানুয়ারী ২০০৮