মুখে ও ঠোঁটে বিভিন্ন ধরনের ভাইরাসের সংক্রমণ হতে পারে। আলোচ্য বিষয়ে হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস এবং হারপিস জসটার ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে আলোকপাত করা হলো। হারপিস এক ধরনের ডিএনএ ভাইরাস, যা প্রধানত লাল এবং শরীরের অন্যান্য নিঃসৃত রসের মাধ্যমে সঞ্চালিত হয়ে থাকে। হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস সাধারণত দুই ধরনের হয়ে থাকে। (ক) হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস টাইপ-১ (খ) হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস টাইপ-২।

হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস দ্বারা প্রাথমিক সংক্রমণের ক্ষেত্রে মাড়ি ও ঠোঁটে প্রদাহ দেখা দিতে পারে, যা জিনজাইভো ষ্টোমাটাইটিস নামে পরিচিত। অনেক সময় শিশুদের ক্ষেত্রে মাড়িতে এ অবস্হার কারণে মনে হতে পারে দাঁত উঠছে। হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস প্রধানত লালার মাধ্যমে সংক্রমিত হয়ে থাকে। ডেন্টাল সার্জনদের মধ্যে যারা হ্যান্ডগ্লোভস ছাড়া রোগী দেখে থাকেন তাদের ক্ষেত্রে হাতের আঙুলে হুইটলো হতে পারে, যা হারপেটিক হুইটলো নামে পরিচিত। হুইটলো হলে আঙুলে ব্যথা হতে পারে।


সেকেন্ডারি হারপিস (কোল্ড সোর)ঃ সেকেন্ডারি হারপিস সংক্রমণের কারণগুলোঃ

(ক) আঘাতের কারণে হতে পারে।
(খ) সুর্যের আলোতে বারবার এবং বেশিক্ষণ গেলে হতে পারে।
(গ) মানসিক চাপযুক্ত অবস্হায় থাকলে হতে পারে।

হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাসের প্রাথমিক সংক্রমণ চলে যাওয়ার পর অনেক রোগীই আর কোনো কষ্ট অনুভব করেন না। ৩০ ভাগ রোগী পরবর্তী সময়ে বারবার সংক্রমণের শিকার হন। এসব রোগীকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ঠোঁট আক্রান্ত হতে দেখা যায়, যা হারপিস ল্যাবিয়ালিস নামে পরিচিত। বারবার হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাসের সংক্রমণের কারণে ঠোঁটে ফুসকুড়ি হতে পারে এবং প্রদাহ দেখা দিতে পারে যা চিলাইটিস নামে পরিচিত। আপামর জনসাধারণের মাঝে এ অবস্হাটি জ্বরঠোসা নামে পরিচিত। তবে সিফিলিসের কারণেও ঠোঁটে ঘা দেখা দিতে পারে। প্রজনন অঙ্গের বাইরে সবচেয়ে বেশি সিফিলিসের লক্ষণ দেখা যায় পুরুষদের উপরের ঠোঁটে এবং মহিলাদের নিচের ঠোঁটে। এ সময় ঠোঁটে ক্ষত দেখা যেতে পারে।

রোগ নির্ণয়ঃ রোগের লক্ষণগুলো ছাড়া রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস টাইপ-১ এবং টাইপ-২ সহজেই নির্ণয় করা যায়। তবে রক্ত পরীক্ষাটি অবশ্যই একজন অভিজ্ঞ ভাইরোলজিষ্ট দ্বারা করাতে হবে যে কোনো নাম-করা প্যাথলজি সেন্টার থেকে।

চিকিৎসাঃ অ্যাসাইক্লোভির গোত্রভুক্ত ট্যাবলেট ভাইরাক্স ৪০০ মি. গ্রা. প্রতিদিন ১টি করে ৭ থেকে ১৪ দিন সংক্রমণের মাত্রা এবং ধরন অনুযায়ী খেতে পারেন। তবে যারা দীর্ঘমেয়াদি হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাসে আক্রান্ত তাদের ক্ষেত্রে অনেক সময় উপকার নাও পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু সংক্রমণ দমনে অবশ্যই আপনাকে ওষুধ খেতে হবে। তাছাড়া রোগীকে প্রচুর পরিমাণে পানি খেতে হবে। জ্বর বা ব্যথা থাকলে ট্যাবলেট ক্যাফেনল একটি করে দিনে ৩ বার ভরা পেটে খেতে পারেন। সর্বোপরি মুখের অভ্যন্তর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। এজন্য ক্লোরোহেক্সিডিন মাউথওয়াশ ০.২% ব্যবহার করতে হবে দুই সপ্তাহের জন্য। গর্ভাবস্হায় ভাইরাক্স ট্যাবলেট সেবন করা যাবে না। তাছাড়া দুগ্ধদানকারী মায়েদের ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। যাদের কিডনির সমস্যা আছে অথবা রক্তে সিরাম ক্রিয়েটিটিনের মাত্রা বেশি থাকে তাদের কোনো অবস্হাতেই ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া একটি ট্যাবলেটও সেবন করা ঠিক নয়। তবে কিডনির সামান্য সমস্যা থাকলে অ্যাসাইক্লোভির গোত্রভুক্ত ওষুধের বদলে ভ্যালাসাইক্লোভির গোত্রভুক্ত ওষুধ ৫০০ মি.গ্রা. দিনে ১ থেকে ২ বার ২ সপ্তাহ অথবা আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সেবন করতে পারেন। ট্যাবলেট ভাইরাক্স সেবনকালে প্রয়োজনে আপনার রক্তের সিরাম ক্রিয়েটিনিনের পরিমাণ স্বাভাবিক আছে কিনা তা দেখে নেয়া ভালো।

ঠোঁটে ঘা বা ক্ষত থাকলে স্হানীয়ভাবে লাগানোর জন্য অ্যাসাইক্লোভির ক্রিম ব্যবহার করলে ভালো ফল পাওয়া যায়। মুখের অভ্যন্তরে বারবার সংক্রমণ আলসার রুপে দেখা যায়।

অতএব জ্বরঠোসাই হোক আর ঠোঁটে ঘা-ই হোক সব ধরনের রোগের সংক্রমণের চিকিৎসায় আপনাকে সচেতন হতে হবে। রোগের কারণ না জেনে ওষুধ সেবন করে অহেতুক সময় নষ্ট না করে যথাযথ চিকিৎসা নিয়ে সুস্হ থাকুন।


**************************
ডা. মোঃ ফারুক হোসেন
ওরাল অ্যান্ড ডেন্টাল সার্জন
হজরত শাহ আলী বাগদাদী (র.) মিরপুর মাজার শরিফ জেনারেল হাসপাতাল
মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬।
দৈনিক আমারদেশ, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০০৮