দীর্ঘজীবী হওয়ার সাধ সবার মধ্যে থাকে। কে না চায় বার্ধক্য বিলম্বিত করতে, কে না চায় হৃদরোগ মুক্ত থাকতে অথবা অন্যান্য রোগ থেকে দুরে থাকতে। কিন্তু প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে বার্ধক্য আসে, হয় নানা রোগব্যাধি। এসব রোগব্যাধির সঙ্গে যুদ্ধ করতে সামনের সারিতে থাকে অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টস। অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টস সম্পর্কে জানতে হলে প্রথমেই জানা দরকার ফ্রি-র‌্যাডিক্যালস কী এবং কীভাবে উৎপন্ন হয়।

আমাদের শরীরের মধ্যে প্রতিনিয়ত চলছে মেটাবলিজম বা জারনক্রিয়া। জারন-প্রক্রিয়ায় প্রতি মুহুর্তে উৎপন্ন ফ্রি-র‌্যাডিক্যালস শরীরের কোষকলার ক্ষতিসাধিত হয়। এই ফ্রি-র‌্যাডিক্যালসের কারণে অকাল বার্ধক্য, হৃদরোগ, ক্যাসার এবং অন্যান্য রোগব্যাধি হয়। ফ্রি-র‌্যাডিক্যালসের হিংস্রতাকে নির্মুল করতে অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টস বা জারনবিরোধী ক্ষমতাসম্পন্ন ডায়েট অপরিহার্য।

ফ্রি-র‌্যাডিক্যালস বনাম অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টসঃ ফ্রি-র‌্যাডিক্যালস এক ধরনের মুক্ত পরমাণু। এদের ধর্মই হলো স্হায়ী হওয়ার চেষ্টা করা। আর এই স্হায়ী হওয়ার প্রক্রিয়ায় এরা কোষ প্রাচীর ডিএনএ এদের অনবরত আক্রমণ করতে থাকে এবং ফলস্বরুপ আরো ফ্রি-র‌্যাডিক্যালস তৈরি হতে থাকে। আর যতক্ষণ না পর্যন্ত কোনো অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টস এদের নিরস্ত্র না করে এরা এদের ধ্বংসাত্মক আক্রমণ চালিয়ে যেতে থাকে। আর অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টসই শরীরকে ফ্রি-র‌্যাডিক্যালস নামক সন্ত্রাসবাদী হানার হাত থেকে বাঁচায়। আমাদের শরীরের ভেতর সুপার অক্সাইড ডিসমিউটেজ, গ্লটাথিওন পার-অক্সাইড ইত্যাদি এনজাইম আছে, এরা এক ধরনের অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টস, তবে খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে রোজকার ষ্ট্রেস, ষ্ট্রেন, টেনশন, ধুমপান শরীরের এই নিজস্ব অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টসের ক্ষতি করে দেয়।
কোথায় পাবেন অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টসঃ নিশ্চয় ভাবছেন এই অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টস নামক বস্তুটির জন্য খুব মহার্ঘ খাবার-দাবার খেতে হবে। আসলে তা একদম ঠিক নয়। আমাদের দৈনন্দিন অনেক খাবারের মধ্যেই অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টস থাকে।

আলফা ক্যারোটিন, বিটা ক্যারোটিন লাইকোপিন, ক্রিপটোজ্যানথিন, ক্যানজ্যানথিন লিউটেন, বায়োফ্ল্যাভোনয়েডেস পলিফিনলিক অ্যাসিড, ট্যানিন, ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, ভিটামিন ই কপার, জিঙ্ক, সেলেনিয়াম, আয়রন ইত্যাদি অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টস হিসেবে কাজ করে। এসব খটমট নাম দেখে ঘাবড়ে যাওয়ার আসলে কিছুই নেই। আমাদের অনেক চেনা শাক-সবজিতে রয়েছে অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টস, যেমন ধরুন পালংশাক, লালশাক, কুমড়োশাক, ধনেপাতা, পুদিনা পাতা, সজনা ডাঁটা, পুঁইশাক ইত্যাদি সবরকম শাকে আছে বিটা ক্যারোটিন আর ঢেঁড়স আর মটরশুঁটিতেও আছে প্রচুর বিটা ও আলফা ক্যারোটিন। আলফা ক্যারোটিন পাবেন বাঁধাকপি, গাজর ও লাইকোপিন নামক এক ধরনের উচ্চমানের অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টস, যা ক্যাসার প্রতিরোধ করে। পাবেন টমেটো ও তরমুজে। পাকা আম, পাকা পেঁপে, কমলালেবু ইত্যাদিতে অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টস পাবেন। জেনে রাখুন, পাকা কুমড়াতে আছে ক্রিপটোজ্যানথিন নামক আর এক ধরনের অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টস। ক্যারাটিনয়েড ফ্যামিলির অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টস পাওয়া যাবে বিভিন্ন রঙিন শাক-সবজি ও ফলমুলে। তাই যারা ফলমুল খেতে পছন্দ করেন, বেশি করে ফল খান, মিটিয়ে নিন প্রয়োজনীয় অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টসের চাহিদা, আর যারা শাক-সবজি খেতে ভালবাসেন তাদের জন্য রইল অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টসের চাহিদা মেটানোর সুবর্ণ সুযোগ
টাটকা সবুজ শাক-সবজিতে রয়েছে ভিটামিন এ, ও সি যা আমাদের মোটামুটি সবারই জানা আছে। আনারস, টমেটো, সব ধরনের লেবু, আপেল, কলা, পেয়ারা-বেদানা ইত্যাদিতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি। কালো জামে রয়েছে লিউটেন নামক অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট। নানারকম শস্য মানে-চাল, গম, সয়াবিন, ডাল, শুকনো ফল অর্থাৎ কিসমিস, খেজুর, বাদাম ইত্যাদিতে আছে কপার। দুধ, সামদ্রিক মাছ আর মাংসে আছে সেলেনিয়াম।

মাছ-মাংস বনাম শাক-সবজি
অতিরিক্ত পরিমাণে মাছ-মাংস খাওয়া স্বাস্হ্যের জন্য ক্ষতিকর। বিশেষ করে রেডমিট বেশি খেলে রক্তে আয়রনের পরিমাণ বেড়ে যায়। আর এই বাড়তি আয়রন শরীরের জন্য ক্ষতিকর। তাই বেশি মাছ-মাংস খেলে অক্সিডেশন ড্যামেজ বন্ধ করার জন্য অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টস খাওয়া অবশ্য প্রয়োজন। ভেজিটেবল স্যুপ বা নানারকম সবজি সিদ্ধ সালাদ, পিঁয়াজ ও রসুন খেতে পারলে ভালো হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাছ-মাংস খাওয়ার পরিমাণ কমিয়ে দিতে হবে। আদাবাটা, গরম মসলা বা স্বাদ আনতে তরকারির ওপর এক চামচ ঘি ছড়িয়ে দেয়া যেতে পারে। কাজেই দেখা যাচ্ছে রোজকার ডায়েটে অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টস যুক্ত খাবার রাখতে চাইলে প্রচুর পরিমাণে টাটকা শাক-সবজি ও কাঁচা ফলমুল খাবেন।

শাক-সবজি রান্নার পদ্ধতিঃ বাঁধাকপি, কুমড়া, পটল বা ঢেঁড়সের তরকারি খেতে পারেন, তবে তেলের ব্যবহার মাত্রার মধ্যে রাখতে হবে। তরকারি রান্নার সময় পরিমাণ মতো তেল ব্যবহার করবেন, সবজি বেশি ভাজবেন না। বেশি তেলে ভাজাভুজি করলে সেটা সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহার করে ফেলুন। অনেকে ভাজাভুজির পরে বাড়তি তেলটা পরের রান্নার জন্য রেখে দেন, এটা কিন্তু শরীরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এটা শরীরে অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টস তৈরিতে সহায়ক এনজাইমগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

ফল খাবেন বেশি
প্রতিদিন কমপক্ষে দু’রকমের গোটা ফল খেতে পারলে ভালো হয়। পাকা কলা, পেয়ারা, শসা, লেবু, তরমুজ, আম, আপেল, নাসপাতি, আতা, কমলালেবু, আঙ্গুর, জাম ইত্যাদি সবরকম ফলে রয়েছে প্রচুর অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টস।

হৃদরোগ প্রতিরোধে অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টসঃ যেসব খাবারে অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টসের পরিমাণ বেশি সেসব খাবার হৃদরোগীদের জন্য খুবই স্বাস্হ্যকর। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত শাক-সবজি, কাঁচা ফলমুল বেশি পরিমাণে খান তাদের হৃদরোগের ঝুঁকি অনেক কম থাকে। গবেষণায় এক কথায় বলা হয়েছে, শাক-সবজি হৃৎপিন্ডের সবচেয়ে নিকটতম বন্ধু।

অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টস অ্যাজমা রোগীদের বন্ধু
যেসব অ্যাজমা রোগী তাদের খাদ্যতালিকায় প্রতিদিন অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট ভিটামিন ‘সি’ এবং ‘ই’ গ্রহণ করেন তাদের শ্বাস-প্রশ্বাস সত্যিকার অর্থেই সহজ হয়ে যায়।

অ্যাজমা রোগী যারা প্রতিদিন ৫০০ মি.গ্রা. ভিটামিন ‘সি’ এবং ৪০০ আইইউ ভিটামিন ‘ই’ গ্রহণ করেন তাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের ক্ষমতা ১৮% বৃদ্ধি পায়।

ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের এক উচ্চ পর্যায়ের গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টস শরীরের ফ্রি-র‌্যাডিক্যালসকে প্রতিহত করে। তাছাড়া অ্যাজমা রোগীদের দেহে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মাত্রায় এ ক্ষতিকর অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট থাকে। অর্থাৎ অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টস অ্যাজমা রোগীদের বন্ধু হিসেবে কাজ করে।

ক্যান্সার রুখতে টমেটোঃ অনেকে মনে করেন কাঁচা টমেটোতে বুঝি বেশি কাজ হয়। কিন্তু এ ধারণা পুরোপুরি ভুল। কেননা টমেটোর অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টস রান্না করলেই বেশি পরিমাণে শোষিত হয়। রান্না করা সবজি অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টসের বায়ো-অ্যাভেলিবিলিটি অনেক বেশি। কাঁচা টমেটোতে যে পরিমাণ লাইকোপিন পাওয়া যায়, তার চেয়ে ৫ গুণ বেশি পাওয়া যায় চাটনি অথবা কেচাপ খেলে।

অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টস ক্যাপসুল
অনেকে অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টস ক্যাপসুল খান। গবেষণায় দেখা গেছে, খাবার-দাবারে যেখানে ১০০ শতাংশ ফল পাওয়া যায়, সেখানে ট্যাবলেট ক্যাপসুলে কাজ হয় মাত্র ২৫ শতাংশ। ফলমুল, শাক-সবজি যত ইচ্ছা খাওয়া যেতে পারে। দাঁড়িপাল্লায় ওজন করে খাওয়ার খুব একটা প্রয়োজন নেই। তবু দেখা গেছে, প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় ১০-৫০ মি.গ্রা. ভিটামিন এ ও ক্যারোটিনয়েড ১০০-৩০০ মি.গ্রা. সেলেনিয়াম, ৪০০-৬০০ আইইউ ভিটামিন ই, ৫০০-১০০০ আইইউ ভিটামিন সি এবং ফল, সবজি ও বাদাম ৬০০ গ্রাম প্রতিদিন খেতে পারলে ভালো হয়। তবে ক্যাপসুল খেতে গেলে ডাক্তারের পরামর্শ নেবেন।


**************************
লেখকঃ ডাঃ এস এম মোস্তফা জামান
সহকারী অধ্যাপক, হৃদরোগ বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
চেম্বারঃ ল্যাবএইড লিমিটেড
বাড়ি-১, রোড-৪, ধানমন্ডি, ঢাকা।
দৈনিক আমারদেশ, ০১ মার্চ ২০০৮