গর্ভধারণ হচ্ছে শরীরের একটি বিশেষ পরিবর্তন। গর্ভকাল মহিলাদের জন্য একটি ঝুঁকিপুর্ণ সময়। অধিক সংখ্যায় গর্ভধারণ এবং সন্তান জন্মদানের ফলে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশসমুহের মহিলাগণ গর্ভকালীন এবং গর্ভ-পরবর্তী নানা জটিলতায় ভোগে থাকেন। আমাদের দেশে প্রতি বছর মাতৃজনিত কারণে ১১ হাজার থেকে ১২ হাজার মহিলা এবং বিভিন্ন ধরনের জটিলতায় ১ লাখ ৫০ হাজার নবজাতক মৃত্যুবরণ করে। একজন সুস্হ মা-ই কেবল পারে একটি সুস্হ-সবল শিশুর জন্ম দিতে। তাই গর্ভকালীন সময়ে গর্ভবতী মায়ের নিজের এবং গর্ভের সন্তানের বিশেষ যত্ম নেয়া উচিত। এ সময় নিয়মিত গর্ভকালীন শারীরিক পরীক্ষা করানো প্রয়োজন। গর্ভবতী মায়ের শারীরিক পরীক্ষা এবং নিরাপদ প্রসব নিশ্চিত করা স্বামীসহ পরিবারের সকলের দায়িত্ব। গর্ভবতী মা ও নবজাতকের বিশেষ যত্মের ব্যাপারে পরিবারের দায়িত্বশীল সকলের সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

গর্ভকালীন সময়ে মহিলাদের ওজন ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে থাকে। একজন মহিলা গর্ভকালীন সময়ে গড়ে ১২ কেজি অতিরিক্ত ওজন লাভ করেন। এজন্য তার প্রয়োজন হয় বাড়তি ক্যালরি। এ বাড়তি ক্যালরি পেতে হলে গর্ভবতী মাকে স্বাভাবিক অবস্হার চেয়ে অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ করতে হবে। স্বাভাবিক অবস্হায় একজন মহিলা প্রতিদিন যতবার খাবার গ্রহণ করেন, গর্ভকালে প্রতিদিন তার থেকে অন্তত একবার বেশি খাবার গ্রহণ করবেন অথবা প্রতিবার খাওয়ার সময় একমুঠো অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ করবেন। গর্ভকালীন সময়ে সুষম খাবার গর্ভস্হ শিশুর গঠন ও সঠিক বৃদ্ধি নিশ্চিত করে। নবজাতক বাচ্চার সঠিক ওজনও নির্ভর করে গর্ভকালে মায়ের সঠিক মাত্রায় খাদ্য গ্রহণের ওপর। গর্ভকালে শাকসবজি এবং ফলমুল বেশি মাত্রায় খেতে হবে। গর্ভস্হ শিশুর হিমোগ্লোবিনের মাত্রা সঠিক রাখতে গর্ভকালে আয়রন বা লৌহসমৃদ্ধ খাবার যেমন-ডাল, মাছ, মাংস, কলিজা, ডিম, গাঢ় সবুজ শাকসবজি, কলা, পেঁপে প্রভৃতি খেতে হবে। গর্ভকালে একবারে বেশি খাবার না খেয়ে অল্প করে বার বার খাওয়া উচিত। এ সময়ে প্রচুর বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে।

গর্ভবতী মহিলা নিজেকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখবেন। প্রতিদিন গোসল করবেন। রাতে ঘুমানোর আগে দাঁত ব্রাশ করবেন। গর্ভকালে একটানা ৪/৫ ঘণ্টা বসে বা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়-এমন কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। সংসারের স্বাভাবিক কাজকর্ম করা যাবে তবে ভারি কাজ পরিহার করতে হবে। টাইট ফিটিং জামা-কাপড় পরা পরিহার করতে হবে। ঢিলেঢালা পোশাক পরিধান করতে হবে। গর্ভকালে দীর্ঘ এবং ক্লান্তিকর ভ্রমণ পরিহার করতে হবে। দুপুরে খাওয়ার পর ২ ঘণ্টা বিশ্রাম নিতে হবে এবং রাতে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুমাতে হবে। পরিবারের সকলের উচিত হবে গর্ভবতী মাকে পুষ্টিকর খাবার খেতে এবং প্রয়োজনীয় বিশ্রাম নিতে সহযোগিতা করা।

পরিবারের দায়িত্বশীল সকল সদস্যকে গর্ভবতী ও নবজাতকের যত্মে বিশেষ ভুমিকা নিশ্চিত করতে হবে। এতে মা ও সন্তান উভয়ে সুস্হ থাকবে। অনেক ধরনের জটিলতা এড়ানো সম্ভব হবে। ঝামেলা এড়ানোর পাশাপাশি সংসারের খরচও বাঁচবে। গড়ে তোলা হবে সুস্হ ও সুখী পরিবার।


**************************
ডা. মুহাম্মদ কামরুজ্জামান খান
লেখকঃ জনস্বাস্হ্য ও প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ
প্রভাষক, কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগ
সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ
দৈনিক আমারদেশ, ০১ মার্চ ২০০৮