ইনগুইনাল হার্নিয়া হলো তলপেটের ডান কিংবা বাম দিকে ইনগুইনাল অর্থাৎ কুঁচকির কাছের অংশে হার্নিয়া। হার্নিয়া কথাটির প্রকৃত অর্থ উদর গহ্বরের দেয়ালের কোন দুর্বল অংশ দিয়ে অভ্যন্তরস্থ যে কোন অঙ্গ যেমন অন্ত্র কিংবা অন্ত্রের অংশবিশেষ বাইরে বেরিয়ে আসা কিংবা বেরিয়ে আসার প্রবণতা। অবস্থান অনুযায়ী হার্নিয়াকে বিভিন্ন নামে নামকরণ করা হয়। তলপেটের ইনগুইনাল বা কুঁচকির কাছের অংশে একাধিক মাংসপেশীর মধ্যে তির্যকভাবে একটি নালীপথ আছে যাকে ইনগুইনাল ক্যানেল বলা হয়। মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায় সুড়ঙ্গ পথ সদৃশ এই নালীপথ বেয়ে অন্ডুকোষদ্বয় উদর গহ্বরের ভিতর হতে অণ্ড থলিতে নেমে আসে। গুণগতভাবেই এটি একটি দুর্বল স্থান। এই ইনগুইনাল সুড়ঙ্গপথ অর্থাৎ কুঁচকির কাছ দিয়ে যে হার্নিয়া (উদরগহ্বরের অঙ্গ) বেরিয়ে আসে সেটিই প্রকৃত অর্থে ইনগুইনল হার্নিয়া। বিভিন্ন ধরনের হার্নিয়ার মধ্যে ইনগুইনাল হার্নিয়ায় ভুক্তভোগীর সংখ্যা বেশি।

ইনগুইনাল হার্নিয়া যে কোন বয়সেই হতে পারে। হার্নিয়ার উপস্থিতি একটি সার্বক্ষণিক ঝুঁকি। যে কোন সময়ে হার্নিয়ার কারণে অণ্ডথলিতে নেমে আসা অন্ত্রের অংশবিশেষ উদর গহ্বরে ফিরে যেতে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে খাদ্যবস্তুর চলাচলে ব্যাঘাত সৃষ্টি হতে পারে। এই অবস্থাকে বাধাগ্রস্ত হার্নিয়া বলা হয়। এ অবস্থায় জরুরী অস্ত্রোপচার করে আটকে পড়া অন্ত্রের অংশবিশেষকে অবমুক্ত করে উদরে ফেরত পাঠাতে হয়।

সময়মতো এ কাজটি সম্পন্ন করা না হলে আটকেপড়া অন্ত্রের অংশবিশেষের রক্ত চলাচল ব্যাহত হয়ে পচন ধরতে পারে। এ অবস্থাকে অবরম্নদ্ধ হার্নিয়া বলা হয়।

এই অবস্থা জীবনের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। এমনকি জরুরী অস্ত্রোপচার করেও অনেক সময় পচনোন্মুখ অন্ত্রকে বাঁচানো যায় না। অন্ত্রের অংশবিশেষকে তখন কেটে ফেরতে হয়। তার পরেও অস্ত্রোপচার পরবর্তী নানান জটিলতার সমূহ সম্ভাবনা থাকে।

ইনগুইনাল হার্নিয়া যে কোন বয়সের পুরুষ বা মহিলার হতে পারে। তবে শারীরিক গঠন ও ভিন্নতার কারণে পুরুষদের মধ্যেই এটা বেশি হয়। জন্মলগ্নেই পুরুষ শিশুর হার্নিয়া থাকতে পারে। এই অবস্থাকে জন্মগত হার্নিযা বলা হয়। সুস্থ সবল শরীরে পরবর্তীতে যে কোন বয়সেই হার্নিয়া সম্পূর্ণ নতুনভাবে দেখা দিতে পারে। এ ধরনের হার্নিয়াকে অর্জিত হার্নিয়া বলা হয়। জন্মগত হার্নিয়া মূলত জন্মগত গাঠনিক ত্রম্নটি। অর্জিত হার্নিয়া সমস্যা সৃষ্টির পিছনে কিছু কারণ কাজ করতে পারে। উদর গহ্বরের অভ্যন্তরস্থ চাপ বৃদ্ধিকারী কারণগুলোই এক্ষেত্রে প্রধান। সঙ্গে তলপেটের মাংসপেশীর দুর্বলতাও বিশেষভাবে অনুঘটক যা বয়স্কদের বেলায় বিশেষভাবে প্রযোজ্য। উদর গহ্বরের চাপ বৃদ্ধি সহায়ক পরিস্থিতিসমূহ হচ্ছে দীর্ঘ মেয়াদী কাশি, পেটে চাপ পড়ে এমন পেশার কাজ যেমন ভারোত্তোলন, প্রবল চাপ দিয়ে প্রস্রাব করতে হয় এমন কোন অসুখ যেমন বৃদ্ধ বয়সে প্রোস্টেট গ্রন্থি বড় হওয়া ইত্যাদি।

হার্নিয়া রোগের উপস্থিতি সহজেই রোগীদের কাছে অনুমিত হয় এবং কেবলমাত্র রোগের বর্ণনা ও শারীরিক পরীক্ষার মাধ্যমে এই রোগ শনাক্তকরণ শতকরা একশ ভাগ সম্ভব। বিশেষ কোন পরীক্ষা-নিরীক্ষার আদৌ প্রয়োজন পড়ে না। মূল উপসর্গ হলো ইনগুইনাল অংশে অর্থাৎ কুঁচকির ঠিক ওপরে ফুলে ওঠা, যা দাঁড়ানো ও শোয়া অবস্থায় পরিবর্তিত হয়। অর্থাৎ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দাঁড়ালেই ফোলা স্পষ্ট কিংবা বৃদ্ধি পায় আর শুয়ে পড়লে আপনা আপনিই কিংবা সামান্য চাপ প্রয়োগে মিলিয়ে যায়। হার্নিয়া বড় হলে কুঁচকির ওপরের ফোলা অন্ডঃথলি পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। এই পর্যায়ে চাপ প্রয়োগ করলে ফোলা মিলিয়ে যাওয়ার সময় ঘড় ঘড় শব্দ হতে পারে এবং স্পষ্টতই বোঝা যায় বেরিয়ে আসা কিছু একটা পুনরায় ভিতরে ঢুকে গেল।
জটিলতা সৃষ্টি না হলে সাধারণত হার্নিয়ার কোন ব্যথা হয় না। যদিও কিছু কিছু ব্যক্তি হার্নিয়া সৃষ্টি হওয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে হালকা ব্যথা বা চাপ অনুভব করেন। হার্নিয়ার ফোলা সহসা বড় হয়ে অসহ্য ব্যথা শুরু হলে বুঝতে হবে হার্নিয়া জটিল আকার ধারণ করেছে। দৈনন্দিন জীবনের নানান কাজ কর্মের সময় কিংবা হঠাৎ করে জোরে হাসি বা কাশির সময় একযোগে অধিক পরিমাণ অন্ত্রের অংশবিশেষ হার্নিয়ার থলিতে নেমে এসে এ অবস্থার সৃষ্টি করতে পারে। এই অবস্থায় জরুরীভিত্তিতে বিশেষজ্ঞ সার্জনের শরণাপন্ন হয়ে যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণ অত্যাবশ্যক, অন্যথায় জীবনহানির শঙ্কা দেখা দিতে পারে।

নবজাত শিশুর হার্নিয়া থাকলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্ম গ্রহণ করা উচিত। আপাত প্রতীয়মান হার্নিয়া জন্মগত হাইড্রোসিল হতে পারে যা কেবলমাত্র বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকই নির্ণয় করতে পারেন। আর জন্মগত হাইড্রোসিল হলে সাধারণত দ্রুত অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয় না। অনেক ক্ষেত্রেই প্রাকৃতিকভাবেই মিলিয়ে যেতে পারে। তাই অপেক্ষা করা যেতে পারে। অন্য দিকে জন্মগত হার্নিয়া হলে দুবছর বয়সের মধ্যে জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি খুবই বেশি। কেননা নানান কারণেই বাচ্চারা প্রায়ই কাঁদে, যার প্রেক্ষিতে হার্নিয়া আটকে যাওয়ার ঝুঁকি বারবার ঘটে। তাই বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে অস্ত্রোপাচার করে নেয়াই সবচেয়ে নিরাপদ। হার্নিয়ার উপস্থিতি কোন লজ্জাকর ব্যাপার নয়, বরং হার্নিয়া নিয়ে ঘুরে বেড়ানোই একটা সর্বক্ষণিক ঝুঁকি। হার্নিয়া বড় হলে সামাজিক ও যৌন জীবনে কিছু সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। অনেকের মধ্যে কিচু ভ্রান্তিমূলক ধারণা আছে যে, হার্নিয়া চিকিৎসার পর যৌনক্ষমতা কমে যেতে পারে। এ ধারণা আদৌ সটিক নয়, বরং অস্ত্রোপচারের পর বিঘ্নিত যৌনজীবন স্বাভাবিক ও স্বস্তিôকর হয়ে উঠবে।

হার্নিয়া চিকিৎসার শতকরা একশ’ ভাগ হচ্ছে অপারেশন অর্থাৎ শুধু ওষুধে এ রোগের চিকিৎসা সম্ভব নয়, শিশু থেকে বৃদ্ধ সব বয়সেই একমাত্র চিকিৎসা অস্ত্রোপচার করে হার্নিযা নেমে আসার পতকে বন্ধ করে দেয়া এবং দুর্বল স্থানকে সবল করা।

হার্নিয়ার কোন প্রাথমিক প্রতিকার বা প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেই। সত্যিকার প্রতিরোধ হলো মাধ্যমিক প্রতিরোধ অর্থাৎ হার্নিযা উদ্ভুত জটিলতা প্রতিরোধ করে। আর যথাসময়ে জটিলতাবিহীন হার্নিয়ার অস্ত্রোপচার করে নেয়াই জটিলতা রোধের প্রকৃত প্রতিরোধ। অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ শল্য চিকিৎসকের মাধ্যমে অস্ত্রোপচার করে নেয়া আদৌ কোন ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাপার নয়।

**************************
ডা. মিজানুর রহমান কল্লোল
চেম্বারঃ কমপ্যাথ লিমিটেড, ১৩৬ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা (সোম, মঙ্গল, বুধবার)।
যুবক মেডিকেল সার্ভিসেস , বাড়িঃ ১৬, রোডঃ পুরাতন ২৮, ধানমন্ডি আবাসিক এলাকা,
ঢাকা (শনি, রবি, বৃহস্পতি)।
দৈনিক নয়াদিগন্ত, ০২, মার্চ ২০০৮