কেস স্টাডি
অস্বাভাবিক মোটা শরীর নিয়ে তিনি ৪০-এ পা রেখেছেন। ২১ বছরেই বসেছিলেন বিয়ের পিঁড়িতে। তারপর দুই সন্তানের মা। একটানা খেয়ে যান জ্ননিয়ন্ত্রণের বড়ি। তারপর হঠাৎ মোটা হতে শুরু করেন।

দুই বছর ধরে বুকে চাপ চাপ অনুভব করছেন। গোপন করেন বুকের ব্যথা। মাঝেমধ্যে ব্যথার তীব্রতায় ঘেমে যান। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। তার পরও স্বামীর কাছে গোপন রাখেন।

কদিন আগে হৃদরোগে হয়েছেন শয্যাশায়ী। এখন নীরবে কাঁদেন তিনি।

চিকিৎসকদের মতে, তাঁর হৃদরোগ বা হার্ট অ্যাটাকের বড় কারণ হচ্ছে একটানা দেড় যুগ জ্ননিয়ন্ত্রণের বড়ি সেবন করা, যা তাঁর হার্ট অ্যাটাকের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে এসব বড়ি ক্ষেত্রবিশেষে বাদ দিয়ে অন্য পদ্ধতি ব্যবহার করলে হার্ট অ্যাটাকের মাত্রা কমানো যেতে পারত।

হৃদরোগ হওয়ার অনেক ঝুঁকি আছে। বয়সের কথাই ধরা যাক। ৪০ বছর পার হলে পুরুষের আর ৫০ পার হলে মেয়েদের হৃদরোগের ঝুঁকি এমনিতেই বেড়ে যায়। ৫০-এর আগে পুরুষের হৃদরোগের ঝুঁকি মেয়েদের প্রায় দ্বিগুণ থাকে।

বিজ্ঞানীদের মতে, মেয়েদের সে সময় হরমোন নিঃসরণের কারণেই হৃদরোগ তুলনামূলকভাবে কম হয়। আজকাল বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, যারা ছোটবেলা থেকেই অপুষ্টিতে ভোগে; কিংবা যারা দরিদ্র তাদের মধ্যেও হৃদরোগের আশঙ্কা বেশি।

এ রকম অনেক পরিবারের সদস্যের হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণের হার বাড়ছে। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, এ জন্য দায়ী ক্রোমোজমের ভেতরকার এক ধরনের জিন।

উচ্চ রক্তচাপের কথা আমরা সবাই কম-বেশি জানি। যার কারণে হৃদরোগে বা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে মৃত্যু হতে পারে। তাই উচ্চ রক্তচাপ থাকলে তা নিয়ন্ত্রণে রাখতেই হবে। নিশ্চয়ই শুনেছেন রক্তের ক্ষতিকারক কোলেস্টেরলের কথা। এটি রক্তে বেশি হলে তাকে হাইপারলিপিডেমিয়া বলা হয়। রক্তে বেশি চর্বি হলে রক্তনালি ক্রমশ বন্ধ হয়ে যায়।

ফলে রক্ত চলাচল না হলে হার্টের সে স্থানের কোষগুলো মরে যায়। এতে হার্ট অ্যাটাক ঘটে। তাই চিকিৎসকেরা বারবার বলে থাকেন, চর্বিজাতীয় খাবার কম খান, ওজন কমান, নিয়মিত ব্যায়াম করুন।

প্রয়োজনে চর্বি কমানোর ওষুধ খান চিকিৎসকের পরামর্শে। কমে যাবে খারাপ কোলেস্টেরল বা এলডিএল। কমবে হার্ট অ্যাটাক ও মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি।

ধূমপান হৃদরোগের বড় কারণ। ধূমপান করলে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়বেই।

মেয়েরা, যাঁরা জ্ননিয়ন্ত্রণ বড়ি খান আর ধূমপানও করেন, তাঁদের হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি আরও অনেক বেশি।

আর ডায়াবেটিস থাকা মানেই তো অনেক রোগের ঝুঁকি একসঙ্গে বহন করা। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না থাকলে ব্যথাহীন হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার হার বাড়ে। বয়স ৪০ পেরোলেই রক্তের সুগার পরীক্ষা করে জেনে নিন ডায়াবেটিস আছে কি না।

আবার ডায়াবেটিসের সঙ্গে মেদস্থূল হলে, অলস জীবন যাপন করলে, ইনসুলিন নিতে নিতে ইনসুলিনের মাত্রা কেবল বাড়তে থাকলে অর্থাৎ ইনসুলিন রেজিসট্যান্স হলে কিংবা ডায়াবেটিক মেয়েরা ধূপমান করলে হৃদরোগের ঝুঁকি যেমন বাড়ে, তেমনি দেহের রক্তনালিগুলো বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়। তাই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখুন। মিষ্টিজাতীয় খাবার যতটুকু সম্ভব বাদ দিন।

শরীরের অতিরিক্ত ওজন মানেই এক সময় হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়া। দেহের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে-বিএমআই ১৮·৫ থেকে ২৪·৯-এর মধ্যে রেখে। কোমরের ব্যাস পুরুষের ক্ষেত্রে ৪০ ইঞ্চির নিচে আর মহিলার ক্ষেত্রে ৩৫ ইঞ্চির নিচে রাখতে হবে।

এতেই হৃদরোগের ঝুঁকি কমবে। বাদ দিতে হবে মিষ্টি ও চর্বিযুক্ত খাবার। না হলে মোটাসোটা দেহ থেকে হবে উচ্চ রক্তচাপ, তারপর ডায়াবেটিস। পরে হার্ট অ্যাটাক।

মদ্যপানে রক্তচাপ বাড়বেই। তাই এটির অভ্যাস থাকলে ছেড়ে দিন। যাঁরা অলস; সারা দিন বসে-শুয়ে সময় কাটান, তাঁদের হৃদরোগের ঝুঁকি কয়েক গুণ। বেশি হাঁটুন, জগিং করুন, সাইকেল চালান। মুক্ত বাতাসে ইচ্ছামতো ব্যায়াম করুন। দৈনিক কমপক্ষে ৩০ মিনিট করে সপ্তাহে তিন-চার দিন কায়িক পরিশ্রম করুন।

দেখবেন রক্তে ভালো কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়বে। রক্তচাপ বাড়বে না। রক্ত সহজ গতিতেই চলবে পুরো শরীরে। ফলে হৃদরোগ কমবে। কারণ, রক্তের কোষ অনুচক্রিকার কাজ বেড়ে গেলে, রক্তের ফাইব্রিনোজেন ও ফ্যাক্টর আট বেড়ে গেলে কিংবা রক্তের প্রোটিন-সি, প্রোটিন-এস ও ফ্যাক্টর-৫ কমে গেলে হার্ট অ্যাটাক বেড়ে যায়।

তাই শারীরিক পরিশ্রম খুবই প্রয়োজন।

হোমোসিস্টিনের কথা হয়তো অনেকেই জানেন না। রক্তের এ উপাদান বাড়লে রক্তনালিতে চর্বি দ্রুত জমে। ফলাফল হার্ট অ্যাটাক। যদি রক্তে ভিটামিন বি৬, বি১২ ও ফলিক এসিড কমে যায়, তাহলে মন্দ উপাদান হোমোসিস্টিন বেড়ে যায়। এ ছাড়া পুরুষের বয়স বেশি হলে এবং যাঁরা বেশি বেশি কফি, ধূমপান ও মদ্যপান করেন; মেয়েরা যাঁরা জ্ননিয়ন্ত্রণ বড়ি খান বা নিয়াসিন ও সাইক্লোসপোরিন এবং মেটফরমিন-জাতীয় ওষুধ বেশি সেবন করেন, তাঁদের রক্তে হোমোসিস্টিন বেড়ে যায়।

এগুলো রক্তনালির আবরণ ও দেয়ালকে শক্ত করে। রক্ত জমাট বাঁধায়। ফলাফল হৃদরোগ। তাই আজকাল হৃদযন্ত্রের এনজিওপ্লাস্টি করা বা রিং পরা রোগীদেরও ভিটামিন-বি দেওয়া হচ্ছে, যাতে হোমোসিস্টিন রক্তে না বাড়ে। খাবার তালিকায় টাটকা ফল ও সবজি রাখুন। অসম্পৃক্ত চর্বি খেলে, ভিটামিন সি, ই ও অ্যান্টি অক্সিডেন্ট খেলে হৃদরোগের ঝুঁকি কমে।

উত্তেজনা, দুশ্চিন্তা, চাওয়া-পাওয়ায় অসামঞ্জস্য ও উচ্চাভিলাষী চিন্তাচেতনা হৃদরোগের ঝুঁকি অনেক বাড়ায়।

এমনকি বিরূপ পরিবেশ, কর্মক্ষেত্রের অসুস্থ পরিবেশ, সমাজে সহযোগিতার অভাব ও মানসিক অবসন্নতায় হৃদরোগের আশঙ্কা বাড়ে। তাই আসুন, হৃদরোগ হওয়ার এসব উপাদান সবার মিলিত প্রচেষ্টায় দূর করতে সচেষ্ট হই।


**************************
ডা· এস কে অপু
হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ
ময়মনসিংহ চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়
দৈনিক প্রথম আলো, ০৫ মার্চ ২০০৮