অনাদিকাল থেকে মানুষ চুলের পরিচর্যা করে আসছে। সুন্দর চুলের জন্য মানুষের প্রচেষ্টার বিরাম নেই। কিন্তু অনেক সময় তাকে হতাশ করে দিয়ে সুন্দর চুলগুলো পাকতে শুরু করে। প্রকৃতির নিয়মে একটি নির্দিষ্ট বয়সে মানুষের চুল পাকে, কিন্তু কখনো কখনো অল্প বয়সেও কারো কারো চুল পাকতে দেখা যায়। তখন দুঃশ্চিন্তার অন্ত থাকে না। সমীক্ষায় দেখা গেছে ২৪ থেকে ৩৫ বছর বয়সের মধ্যে ১০০ জনের মধ্যে প্রায় ২৫ জনের চুলে পাক ধরে। পরে বয়স বাড়ার সাথে সাথে চুল পাকার সংখ্যা আরো বেড়ে পঞ্চাশে দাঁড়ায়। এই অনাকাঙ্ক্ষিত সমস্যাটি দেখা দেয়ার কারণ কী? 

আমাদের ত্বকে মেলানোসাইট নামক একধরনের কোষ থাকে যা মেলানিন উৎপাদন করে। যাদের কম মেলানিন উৎপাদন হয় তাদের রঙ সাদা হয় এবং বেশি উৎপাদন হলে রঙ কালো হয়। চুলের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। যদি কোনো কারণে চুলের গোড়ার মেলানোসাইট কোষ নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় তাহলে বন্ধ হয়ে যায় মেলানিনের উৎপাদন। ফলে চুলের রঙ সাদা হয়ে যায় এবং আমরা সেটাকে চুল পাকা বলি। যেকোনো বয়সেই এটা ঘটতে পারে। মেলানোসাইট কোষ কেন নিষ্ক্রিয় হচ্ছে এ ব্যাপারে অনেক গবেষণা হয়েছে। দেখা গেছে বংশগত কারণে অনেকের মধ্যে এ সমস্যাটি ঘটছে। অল্প বয়সে যাদের চুল পাকে তাদের কারো কারো মধ্যে অটোইমিউন ডিজিজে’র কারণে মেলানোসাইট কোষ নিষ্ক্রিয় হয়ে যাচ্ছে। ফলে চুলে মেলানিন না পৌঁছানোর কারণে চুল পেকে যাচ্ছে। এই অটোইমিউন ডিজিজে ত্বকের মেলানোসাইটের বিরুদ্ধে তৈরি হয় এন্টি মেলানোসাইট এন্টিবডি যা মেলানোসাইট কোষকে ধ্বংস করে দেয়। এ ছাড়া গবেষকরা খুব বেশি জ্বর, দীর্ঘমেয়াদি কোনো অসুখ এবং মানসিক দুঃশ্চিন্তাকে অল্পবয়সে চুল পাকার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

অল্প বয়সে কিংবা বেশি বয়সে চুল পাকার ব্যাপারটি হঠাৎ করে ঘটে না। প্রথমে কয়েকটি চুল পাকতে শুরু করে­ পরে ধীরে ধীরে অন্যান্য চুল পাকে।

বংশজাত কারণ ছাড়া আর সেসব কারণে চুল পাকে­ চুলের প্রধান পুষ্টি প্রোটিন ও ভিটামিন। এই পুষ্টির অভাবে চুল পাকতে পারে। শরীরে যখনই প্রোটিন কিংবা ভিটামিনের তীব্র অভাব ঘটে তখনই চুলের পরিবর্তন চোখে পড়ে। প্রোটিনের অভাবে চুল শুষ্ক, পাতলা, ভঙ্গুর ও বিবর্ণ হয়।

শিশুদের ক্ষেত্রে ম্যারাসমাস ও কোয়াশিওরকর নামক দু’টি রোগে চুল পাকা দেখা দেয়। হৃদরোগীদের চুল খুব দ্রুত পেকে যায়, বিশেষ করে যারা উচ্চরক্তচাপ কিংবা করোনারি হার্টডিজিজে ভুগছেন তাদের চুল পেকে যাওয়ার ঘটনা বেশি। এ ছাড়া থাইরয়েড গ্রন্থিতে সমস্যা দেখা দিলে চুল পাকে। প্রোজেরিয়া নামক রোগে ১২ বছরের আগেই শিশুর চুল পাকতে শুরু করে।
রথম্যান থমসন সিনড্রোম এবং ডিসট্রফিক মায়েরাটোনিয়া রোগেও চুল খুব তাড়াতাড়ি পেকে যায়। শরীরে ভিটামিন ‘বি’ ১২-এর অভাবেও চুল পাকে।

এ ছাড়া বিভিন্ন চর্মরোগে বিশেষ করে সোরিয়াসিস ও শ্বেতীরোগে চুল পাকতে পারে।

চুল পাকলে কী করণীয়?
অনেকের ধারণা চুলে নিয়মিত তেল না মাখলে চুল পেকে যায়। কিন্তু ধারণাটি ভ্রান্ত। চুল পাকার সাথে চুলে তেল দেয়া না দেয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। সত্যিকার অর্থে পাকা চুল কালো করার স্থায়ী কোনো উপায় নেই। একমাত্র কলপ ব্যবহার করে বাস্তবতাকে মেনে নিতে হবে। তবে যেসব রোগের জন্য চুল পেকে যায়­ যদি রোগটি নির্ণয় করা সম্ভব হয় এবং রোগের চিকিৎসা করা যায় তাহলে কিছু কিছু ক্ষেত্রে পাকা চুল কালো হয়ে ওঠে। এ ছাড়া পাকা চুল কালো করার কোনো ওষুধ আজ পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি। কলপ মাখার ক্ষেত্রে কিছুটা সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কারো কারো ক্ষেত্রে কলপে এলার্জি হতে পারে। সেজন্য কলপ মাখার আগে ত্বকে একটু ঘষে নিয়ে, কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে যদি এলার্জি না দেখা দেয়, তবে চুলে মাখা যেতে পারে। কিছু কিছু কোম্পানি চুল কালো করার তেল বা ওষুধের বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। ওই সব তেল বা ওষুধ চুলে মাখলে চুলে কালো একটি ক্ষণস্থায়ী প্রলেপ পড়ে, কিন্তু তা স্থায়ী কোনো সমাধান দিতে পারে না। বরং ওই সব তেল বা ওষুধ চুলে মাখার কারণে মাথার ত্বকে অনেক সময় এলার্জিজনিত সমস্যা দেখা দেয়। তাই চুলে পাক ধরলে প্রথমে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেখিয়ে চুল পাকার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করা উচিত।


ডা. ওয়ানাইজা
চেম্বারঃ যুবক মেডিক্যাল সার্ভিসেস , বাড়িঃ ১৬, রোডঃ ২৮ (পুরাতন), ১৫ (নতুন), ধানমন্ডি আবাসিক এলাকা, ঢাকা।
দৈনিক নয়া দিগন্ত, ৯ মার্চ ২০০৮