চিরতরে চলে গেছেন চিত্রনায়ক মান্না। আর কখনোই তিনি প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হয়ে পর্দা কাঁপাবেন না। মান্নার আকস্মিক মৃত্যুর পর সর্বত্র একই আলোচনা। মান্নাকে কি বাঁচানো সম্ভব ছিল? মান্না তো বুকে ব্যথার সঙ্গে সঙ্গেই হাসপাতালে গিয়েছিলেন তবে কেন এই পরিণতি? মান্না কি আগে থেকেই হৃদরোগে ভুগছিলেন? বিদেশে পাঠালে কি মান্না বেঁচে যেতেন? এরকম অসংখ্য প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছি প্রতিনিয়ত। একজন কার্ডিওলজিষ্ট হিসেবে রোগীদের এসব প্রশ্নের মুখোমুখি হয় একটি বিষয় নিশ্চিত যে, মান্না তার অসংখ্য ভক্তকে কাঁদিয়ে যেমন চলে গেছেন, তেমনি হৃদরোগের আকস্মিক মৃত্যু নিয়ে ভাবিয়ে তুলেছেন তার ভক্তদের। কেউ কেউ ইউনাইটেড হাসপাতালে মান্নার ভুল চিকিৎসা হয়েছে-একথা বলতেও দ্বিধা করছেন না। পত্রিকায় দেখলাম, মান্নার পরিবার এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক অভিযোগের প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু আসলেই কি ভুল চিকিৎসা হয়েছিল? নাকি মারাত্মক এ হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী ছিল? হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর মৃত্যুর আগপর্যন্ত চিত্রনায়ক মান্নার চারবার হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়েছিল। মান্না বুকে ব্যথা নিয়ে গাড়ি চালিয়ে ভোর ৫টা ৫৫ মিনিটে হাসপাতালে পৌঁছলে ইসিজি ও আনুষঙ্গিক পরীক্ষার পর হার্ট অ্যাটাক শনাক্ত করা হয়। জরুরি বিভাগ থেকে তখন তাকে সিসিইউতে স্হানান্তর করা হয়। প্রাইমারি পিসিআই (একই সঙ্গে করোনারি অ্যাঞ্জিওগ্রাম ও অ্যাঞ্জিওপ্লাষ্টি) করার জন্য প্রথমে মান্নার কাছে এবং পরে মান্নার ভাইয়ের কাছে সম্মতি চাওয়া হয়। সম্মতি না পেয়ে হার্টের জমাটবাঁধা রক্ত তরল করার জন্য ইনজেকশনের (ষ্ট্রেপটোকাইনেজ) মাধ্যমে থ্রোম্বোলাইজ করা হলেও তাতে কাজ হয়নি। আবারো পিসিআই করার সম্মতি চাওয়া হয় স্বজনদের কাছে। সম্মতি দেয়া হয়নি তখনো। এ অবস্হায় ১০টা ৩০ মিনিটে হঠাৎ হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। সিপিআর ও ডিসি শকের মাধ্যমে মান্নার নিঃশ্বাস স্বাভাবিক করা হয়। কিন্তু কয়েক মিনিট পর দ্বিতীয়বার হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। মেকানিক্যাল ভেন্টিলেটর লাগানোর পর পিসিআই করার সম্মতি চান চিকিৎসকরা আবারো। এ অবস্হায় মান্নাকে বাঁচানোর তীব্র আকাঙ্ক্ষায় বেলা ১১টায় সম্মতি দেয়া হলে টেমপোরারি পেসমেকার লাগানোর পর করোনারি অ্যাঞ্জিওগ্রাম করা হয়। অ্যাঞ্জিওগ্রামে প্রধান ৩টি ধমনীতে ৩টি ব্লক শনাক্ত করে রিং (Stent) বসানো হয়। তৃতীয়বার হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়। ২০ মিনিট পর চতুর্থবার হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হলে ২টা ২৮ মিনিটে মান্নার মৃত্যু ঘটে। মান্নার যে ধরনের হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল, এই হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসায় প্রাইমারি পিসিআই আদর্শ এবং আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি। উন্নত বিশ্বে যা অত্যন্ত জনপ্রিয় চিকিৎসা পদ্ধতি। তবে বাংলাদেশসহ উপমহাদেশে এ চিকিৎসা পদ্ধতি এখনো ততটা সফলতা পায়নি। করোনারি ধমনীতে শতকরা একশ’ ভাগ ব্লক হলেই কেবল হার্ট অ্যাটাক হয়; তাই যত দ্রুত সম্ভব reperfusion করা উচিত। কেননা বলা হয় Time is muscle অর্থাৎ প্রাইমারি পিসিআই হার্টের মাসল ঘবপৎড়ংরং রক্ষা করা। তবে Medical Contact to balloon ev door-to-balloon time নব্বই মিনিটের মধ্যে হতে হবে। অর্থাৎ রোগী যদি দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছতে পারে, সেই হাসপাতালে যদি প্রাইমারি পিসিআই করার সেটআপ থাকে, যদি দক্ষ ইন্টারভেনশন কার্ডিওলজিষ্ট থাকে তবেই প্রাইমারি পিসিআই করা হয়।

আমাদের দেশে এ চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনো সচেতনা সৃষ্টি হয়নি। আমাদের দেশে এ চিকিৎসা পদ্ধতি হাতে গোনা কয়েকটি হাসপাতালে সম্ভব হচ্ছে; কারণ এ বিষয়ে দক্ষ ইন্টারভেনশন কার্ডিওলজিষ্টের সংখ্যা খুবই কম। আবার যেখানে কার্ডিওলজিষ্ট আছে, সেখানে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বা Technical Support নেই।
এ চিকিৎসা পদ্ধতিকে জনপ্রিয় করে তুলতে হলে প্রয়োজন সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং রোগীদের মাঝে আস্হা অর্জন।

এ আস্হা অর্জন শতকরা একশ’ ভাগ এখনো আমরা করতে পারিনি। তাই মান্নার কাছে সম্মতি চাওয়া হলে তিনি দেননি।

আমাদের দেশে হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসায় বেশিরভাগ হাসপাতালে ষ্ট্রেপটোকাইনেজ দিয়ে থ্রোম্বোলাইজ করা হয়। এ ইনজেকশনের মাধ্যমেই বেশিরভাগ রোগী সুস্হ হয়ে ওঠেন। প্রাইমারি পিসিআই’র মতো উপকার পাওয়া না গেলেও রোগীর মৃত্যুঝুঁকি কমে যায়। তবে এ ইনজেকশনও গোল্ডেন টাইমের মধ্যে দিতে হবে। দেরি করলে এ ইনজেকশনের সুফল থেকে বঞ্চিত হবেন রোগী। তাই বুকে ব্যথার পর বা হার্ট অ্যাটাকের পর দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে এবং চিকিৎসকদেরও দ্রুত চিকিৎসা শুরু করতে হবে।

পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও ভালো ট্রাসপোট ফ্যাসিলিটি না থাকলে বা door-to-balloon  নব্বই মিনিটের বেশি হলে থ্রোম্বোলাইজ করা হয়। তবে ষ্ট্রেপটোকাইনেজের পরিবর্তে এখন আরো ভালো ইনজেকশন/ওষুধ অন্যান্য দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে।

থ্রোম্বোলাইজ করার জন্য ষ্ট্রেপটোকাইনেজ দিলে অনেক সময়ই কার্যকর হয় না অর্থাৎ ধমনীর জমাট রক্ত তরল হয় না। মান্নার ক্ষেত্রেও থ্রোম্বোলাইজ ব্যর্থ হয়েছিল।

ষ্ট্রেপটোকাইনেজ দেয়ার পর ক্লিনিক্যালি রোগীর উন্নতি না হলে কখনো কখনো Rescue PCI করা হয়। এ বিষয়ে বিশ্বব্যাপী এখনো বিভিন্ন ট্রায়াল চলছে। কোনো কোনো ট্রায়ালে বলা হয়েছে, রেসকিউ পিসিআই হার্ট অ্যাটাক-পরবর্তী মৃত্যু রোধ করে এবং হার্ট ফেইল্যুর প্রতিরোধ করে। আবার কোনো কোনো ট্রায়ালে বলা হয়েছে, রেসকিউ পিসিআই করলে ষ্ট্রোকের ঝুঁকি বেশি।

বাংলাদেশ গত কয়েক বছরে কার্ডিয়াক চিকিৎসায় উন্নতির ধারাবাহিকতায় কয়েক যুগ পার করেছে। বেশিদিনের কথা নয়, যখন করোনারি এনজিওগ্রামের জন্য রোগীরা দেশের বাইরে চলে যেতেন। অথচ এখন সরকারি হাসপাতাল ছাড়াও প্রাইভেট সেক্টরগুলো হৃদরোগ চিকিৎসায় যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। দেশের চিকিৎসা ব্যবস্হার প্রতি আস্হা শতভাগ উন্নীত করতে হবে। সিঙ্গাপুর অত্যন্ত ছোট একটি দেশ। সিঙ্গাপুরের মানুষ সে দেশে সরকারি হাসপাতালেই চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাই চিকিৎসক, রোগী এবং চিকিৎসা ব্যবস্হায় সরকারের ভুমিকা জোরদার হওয়া উচিত।

হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসা বিষয়ে, বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও সরকারি তত্ত্বাবধানে, একটি জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্হা গাইড লাইন থাকা দরকার। যেমন জাপানে হার্ট-অ্যাটাকের চিকিৎসায় কি ধরনের ওষুধ ব্যবহার হবে কিংবা Primary PCI তে কী ধরনের Stent বা রিং ব্যবহার হবে তার একটি গাইড লাইন আছে।

বেসরকারি হাসপাতালগুলো বেশির ভাগই ঢাকা কেন্দ্রিক তাই বিকেন্দ্রীকরণ প্রয়োজন। আরেকটি বিষয় চিকিৎসা সেবা বা খরচের ব্যাপারে সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত। প্রয়োজনে এমন টেকনোলজি উদ্ভাবন প্রয়োজন যার উপকরণ ও তৈরি আমাদের দেশেই সম্ভব।
হৃদরোগ চিকিৎসার (Stenting) ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে রাখতে বা সাধারণ রোগীদের দিতে না পারলে রোগী এবং চিকিৎসকের মধ্যে কখনোই আস্হার বন্ধুত্ব হবে না। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বা সরকারের বিস্তৃত ভাবনা প্রয়োজন। শুধু চিকিৎসা বিষয়ক যন্ত্রপাতি আমদানিতে সরকারের উদার হওয়া উচিত বলেই ক্ষান্ত হওয়া উচিত নয়।

বুকে ব্যথা হার্ট অ্যাটাকের একটি বিপজ্জনক সংকেত বা উপসর্গ। তবে ডায়াবেটিক রোগীরা সবসময় বুকে ব্যথা অনুভব নাও করতে পারেন। এটি আরো মারাত্মক। অনেকে হৃদরোগের ব্যথাকে গ্যাষ্ট্রিকের ব্যথা ভেবে চিকিৎসকের শরণাপণ্ন না হয়ে নিজে নিজেই এন্টাসিড জাতীয় ওধুষ খেতে থাকেন। চিকিৎসকের স্পর্শ পেতে এই বিলম্ব কখনো কখনো হার্ট অ্যাটাকের মৃত্যুঝুঁকি বাড়ায়। মনে রাখবেন বুকে ব্যথা হলে, শরীরে ঘাম হলে, বমি বমি লাগলে বা বমি হলে, কালক্ষেপণ করবেন না। হাসপাতালের ইমার্জেসিতে বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপণ্ন হবেন। বিলম্বে মৃত্যুর ঝুকি বেশি। কারণ গবেষণার দেখা গেছে, হার্টঅ্যাটাকে শতকরা ২৫ জন এক ঘণ্টার মধ্যে মারা যায়। বাকি রোগীদের শতকরা ১৫ জন হাসপাতালে নেয়ার পর মারা যায়। হার্টঅ্যাটাকের উপসর্গ হলে অ্যাসপিরিন ৩০০ মি. গ্রাম এবং ক্লোপিডোগ্রেল ৩০০ মিগ্রা (৭৫ গ্রামের ৪টি বড়ি) এক সঙ্গে খেতে হবে। এছাড়া বুকে চাপ বা ভার ভার অনুভুত হলে, রক্তচাপ থাকলে নাইট্রোমিন্ট স্প্রে (২ চাপ) জিহ্বার নিচে দেবেন। হার্টঅ্যাটাকে আক্রান্ত রোগী সময়মত হাসপাতালে পৌঁছলে ওষুধের চিকিৎসার পাশাপাশি প্রাইমারি পিসিআই করা হয়। হার্টঅ্যাটাকের ঝুঁকিকে এখন আর বয়সের ফ্রেমে বাঁধা যায় না। তবু চল্লিশের উপরে প্রত্যেক পুরুষ এবং মহিলার জানা প্রয়োজন কোনো ঝুঁকিতে আপনি আছেন কিনা। যেমন- ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তের চর্বির পরিমাণ বা লিপিড প্রোফাইল ইত্যাদি। এছাড়া ধুমপান, তামাক, শারীরিক স্হুলতা, পারিবারিক হৃদরোগের ইতিহাস ইত্যাদি জেনে সতর্ক হওয়া উচিত। কেননা হার্টঅ্যাটাকের চিকিৎসার চেয়ে হার্টঅ্যাটাক প্রতিরোধই উত্তম।

*************************
ডা. এস এম মোস্তফা জামান
লেখকঃ সহকারী অধ্যাপক, হৃদরোগ বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ফেলো -ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজি ম্যাক্স হার্ট এন্ড ভাসকুলার ইনষ্টিটিউড, নিউ দিল্লী, ইন্ডিয়া। চেম্বারঃ ল্যাবএইড লিমিটেড
বাড়ি-১, রোড-৪, ধানমন্ডি, ঢাকা।
আমার দেশ, ১৫ মার্চ ২০০৮