আমাদের অনেকেরই ধারণা অ্যালার্জির কোনো সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। ওষুধ দিয়ে উপসর্গ কিছু দিন দমিয়ে রাখা যায় এবং ওষুধ বন্ধ করলেই আবার শুরু হয় উপসর্গগুলো। এ কথা কিন্তু অমূলক কিছু নয়। প্রায় ক্ষেত্রেই তাই দেখা দেয়। এ জন্যই জনগণ তখন অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসা বাদ দিয়ে অন্য চিকিৎসা যথা হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা করে থাকেন, আবার অনেক ক্ষেত্রে তাবিজ-কবজ, ঝাঁড়ফুক নিয়ে থাকেন, কিন্তু তার পরও যখন কোনো সমাধান পান না তখনই হতাশ হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।

তাই জানা দরকার আপনার রোগটা আদতে অ্যালার্জিজনিত কি না এবং অ্যালার্জি বিশেষজ্ঞের কাছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সঠিকভাবে নির্ণয় করে তার চিকিৎসা করা।
অ্যালার্জিজনিত রোগের তিনটি চিকিৎসাপদ্ধতি প্রথমত, অ্যালার্জি দ্রব্যাদি এড়িয়ে চলা; দ্বিতীয়ত, ওষুধ চিকিৎসা; তৃতীয়ত, অ্যালার্জি ভ্যাকসিন বা ইমুনোথেরাপি।
বাংলাদেশের অধিকাংশ রোগীর অ্যালার্জি ভ্যাকসিন বা ইমুনোথেরাপি সম্বন্ধে সম্যক কোনো ধারণা নেই। তারা শুধু ওষুধ বিশেষত সালবিউটামল বা অ্যামাইনোফাইলিন জাতীয় ওষুধকেই বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকেন, যদিও স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ ইনহেলার, নেসাল স্প্রে, ইনজেকশন বা ট্যাবলেট আকারে অ্যালার্জি রোগের উপসর্গগুলো দ্রুত উপসম করে কিন্তু এর বহুল পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হেতু অনেক রোগীই এই ওষুধ বেশিদিন ব্যবহার করেন না। আবার সালবুটামল বা অ্যামাইনোফাইলিন জাতীয় ওষুধ সেবনে শরীর কাঁপানো, বমি বমি ভাব ও ঘুমের ব্যাঘাত হওয়াতে এটাও দীর্ঘ দিন ব্যবহার করেন না, এবং এন্টিহিস্টামিন জাতীয় ওষুধ নেয়ার পর ঘুমঘুম ভাব, এমনকি দৈনিক কাজকর্মে ব্যাঘাত ঘটায়, তাই এন্টিহিস্টামিন জাতীয় ওষুধ একনাগাড়ে খান না, মাঝে মাঝে খান। তাই রোগের উপসর্গগুলো থেকেই যায়। অ্যালার্জি ভ্যাকসিন চিকিৎসাতে তেমন কোনো মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই এবং যে অ্যালারজেন দ্বারা রোগী আক্রান্ত হয় সে অ্যালারজেন দ্বারাই ভ্যাকসিন দেয়া হয়।

যদিও আজ প্রায় ৮০ বছর ধরে অ্যালার্জি ভ্যাকসিন বিভিন্ন দেশে প্রচলিত এবং একেক দেশে একেকভাবে প্রয়োগ করা হয় ও কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা ছিল না, তাই অ্যালারজেন ভ্যাকসিন বা অ্যালারজেন ইমুনোথেরাপি ব্যবহারের দিকনির্দেশনা তৈরির জন্য ১৯৯৭ সালের ২৭ থেকে ২৯ জানুয়ারি সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার(WHO) প্রধান কার্যালয়ে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশ্বব্যাপি অ্যালার্জি, হাঁপানি ও ইমুনোথেরাপি সংক্রান্ত বিভিন্ন সংস্থা যথা আমেরিকান একাডেমি অব অ্যালার্জি এ্যাজমা অ্যান্ড ইমুনোলোজি (AAAAI), ইউরোপিয়ান একাডেমি অব অ্যালারগোলজি অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল ইমুনোলোজি (EAACI), ইউরোপিয়ান সোসাইটি অব পেডিয়াট্রিক্স অ্যালার্জি অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল ইমুনোলোজি, ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব অ্যালারগোলোজি অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল ইমুনোলোজি, জাপানিজ সোসাইটি অব অ্যালারগোলোজি, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকসিয়াস ডিজিস একত্র হয়ে অ্যালার্জি সৃষ্টিকারী দ্রব্যাদি বা অ্যালারজেনের বিরুদ্ধে প্রতিষেধকমূলক অ্যালার্জেন ইমুনোথেরাপি বা ভ্যাকসিনের ব্যবহারের দিকনির্দেশনা তৈরি করে। অ্যালার্জিজনিত হাঁপানি, অ্যালার্জিক রাইনাইটিস ও অ্যালার্জিক কনজাংটাইভাইটিসের ক্ষেত্রে এই ভ্যাকসিন অত্যন্ত কার্যকর বলে অভিমত প্রকাশ করেন।

অ্যালার্জি ভ্যাকসিন কী, কিভাবে কাজ করে, কোন কোন রোগীর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায়, এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কী, তা নিয়ে কিছু আলোচনা করা যাক।

অ্যালার্জি ভ্যাকসিন কী?
অ্যালারজেন ভাকসিন বা ইমুনোথেরাপি এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে স্বল্পমাত্রা থেকে পর্যায়ক্রমে উচ্চতর মাত্রায় অ্যালারজেন এক্সট্রাক্ট (যে অ্যালারজেন দ্বারা রোগীর শরীরে উপসর্গ দেখা দেয়) অ্যালারজিক ব্যক্তির শরীরে প্রবেশ করানো হয়। যাতে পরবর্তীতে অ্যালারজেনের সংবেদনশীলতা কমে যায়।

কিভাবে কাজ করে?
১. রক্তের আইজিই (IgE) (যা অ্যালার্জির জন্য মূলত দায়ী) তাকে ধীরে ধীরে কমিয়ে দেয়।
২. রক্তে আইজিজির (IgE) মাত্রা বাড়িয়ে দেয় যা অ্যালার্জি প্রতিরোধ করে।
৩. মাস্ট সেল যা হিস্টামিন নিঃসরণ করে তা কমিয়ে দেয়।

কাদের ক্ষেত্রে অ্যালার্জি ভ্যাকসিন কার্যকর?
১. অ্যালার্জিক রাইনাইটিস।
২. ব্রঙ্কিয়াল অ্যাজমা।
৩. হাইমেনোপটেরা ভেনম যাতে এনাফাইলোক্সিস বা অ্যালার্জিক বিক্রিয়া দেখা দেয়।
৪. কিছু কিছু ছত্রাক যেমন ক্লডাস্পেরিয়াম ও অলটরেনেরিয়ার দ্বারা অ্যালার্জিজনিত রোগ হলে।

কোন বয়সে ইমুনোথেরাপি শুরু করবেন?
অ্যালার্জি রোগের উপসর্গের প্রথম দিন থেকেই ইমুনোথেরাপি শুরু করা সম্ভব। কোনো কোনো ইমুনোথেরাপিস্ট মনে করেন দু-এক বছর বয়স থেকেই এ পদ্ধতিতে চিকিৎসা শুরু করা যেতে পারে। তবে মাইটি অ্যালার্জির ক্ষেত্রে পাঁচ বছরের নিচের বয়সের শিশুদের ইমুনোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে। বয়স্ক রোগীদের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ইমুনোথেরাপির সফলতা প্রমাণিত, তবে অল্প বয়সে ইমুনোথেরাপি রোগমুক্তির ক্ষেত্রে একটি অন্যতম প্রধান নিয়ামক।

ইমুনোথেরাপির জন্য আপনি কি উপযুক্ত?
যেসব অ্যালারজেন অ্যালার্জি রোগের কারণ তা নিরূপণ পরবর্তী সময়ে ইমুনোথেরাপির জন্য নির্ধারণ করা হয়। তবে ভিন্ন ধরনের তিনটির অধিক অ্যালারজেনের বিরুদ্ধে ইমুনোথেরাপি সাধারণত কার্যকর হয় না। ইমুনোথেরাপি শুরুর আগে মারাত্মকভাবে রোগাক্রান্ত রোগীদের পর্যাপ্ত ওষুধ ব্যবহারের মাধ্যমে স্বাভাবিক অবস্থায় আনার পরই ইমুনোথেরাপি শুরু করা সম্ভব। দীর্ঘমেয়াদি জটিল রোগগুলো যেমন­ নন-অ্যালারজিক, সাইনোসাইটিস ও নেসাল পলিপ রোগীদের ক্ষেত্রে ইমুনথেরাপির কোনো ভূমিকা নেই।

কাদের ভ্যাকসিন দেয়া যাবে না?
১. গুরুতর ইমুনোলোজিক্যাল ও ইমুনোডেফিসিয়েন্সি রোগে যারা ভুগছেন।
২. ক্যান্সার
২. ভীষণ মানসিক ভারসাম্যহীনতা রোগে ভুগছেন এমন রোগী
৪. বিটার ব্লকার দিয়ে চিকিৎসা করা হলে
৫. রোগী সহযোগিতা না করলে
৬. বড় ধরনের হৃদরোগ থাকলে
৭. দুই বছরের নিচের শিশু
৮. গর্ভবতী অবস্থায় ভ্যাকসিন শুরু করা ঠিক না, তবে আগে থেকে চলতে থাকলে তা চালিয়ে যাওয়া যায়
৯. গুরুতর অ্যাজমা যখন কোনো মতেই ওষুধ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত করা যায় না।

রোগের প্রারম্ভিক অবস্থায় অ্যালার্জি ভ্যাকসিন চিকিৎসা শুরু সুবিধা
১. ইমুনোথেরাপি ব্যবহারে দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহকে কমানোর চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ হওয়ার পথকে বাধার সৃষ্টি করে।
২. অ্যালার্জিজনিত সহজ রোগ থেকে জটিল রোগ হওয়ার পথকে বাধা দেয় অর্থাৎ যেসব রোগী অ্যালার্জিজনিত সর্দিতে ভোগে তাদের যাতে অ্যাজমা না হয় সেই পথ বন্ধ করে।
৩. প্রাথমিক অবস্থায় রোগের অতিসংবেদনশীলতা কম থাকায় ইমুনোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও কম থাকে।

কত দিন দিতে হয়?
যদিও ইমুনোথেরাপি কত দিন দিতে হবে তার কোনো সুনির্দিষ্ট কথা নেই, তবে যারা ইমুনোথেরাপির সুফল পান তাদের তিন থেকে পাঁচ বছর চালিয়ে যেতে হবে।

এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কী
যদিও এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয় না বললেই চলে, তুবও এর যে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয় তা হলো­

স্থানীয় প্রতিক্রিয়াঃ যে জায়গায় ভ্যাকসিন দেয়া হয় সেখানে লাল হয়ে ফুলে যেতে পারে।

সিস্টেমিক রিয়েকশন
এনাফাইলেক্সিস
অ্যাজমা ও রইনাইটিসের উপসর্গগুলো বেড় যেতে পারে।

ইমুনোথেরাপি চিকিৎসা সুফল না পাওয়ার কারণ

১। যদি ঠিকমতো রোগ নির্ণয় না করা হয়।
২। যদি অ্যালারজেন ও তার মাত্রা ঠিকমতো না দেয়া হয়।
৩। ভ্যাকসিন যদি মানসম্মত না দেয়া হয়।
৪। নির্ধারিত সময় পর্যন্ত না হয়।
৫। রোগীকে যদি ইমুনোথেরাপি সম্পর্কে সঠিক ধারণা না দেয়া হয় ও রোগী যদি ঠিকমতো সহযোগিতা না করে।
৬। অ্যালার্জি দ্রব্যাদি থেকে এড়িয়ে চলার ঠিকমতো উপদেশ না দেয়া হয়।
৭। ভ্যাকসিন দেয়ার প্রথম অবস্থায় কোনো অসুবিধা না হলেও পরে যদি অতিসংবেদনশীলতা দেখা দেয়।
৮। পরিবেশে যদি নতুন কোনো অ্যালারজেনের আবির্ভাব হয় যা রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সময় ধরা পড়েনি।

ইমুনোথেরাপির দীর্ঘমেয়াদি সুফল
ইমুনোথেরাপির মাধ্যমে দীর্ঘ দিন রোগমুক্ত স্বাভাবিক জীবনযাপন করা সম্ভব।
শুধু ওষুধ চিকিৎসায় আপনার জীবনযাত্রার প্রভাব
ওষুধ চিকিৎসায় সার্বক্ষণিকভাবে ওষুধ গ্রহণ, প্রতিদিন বারবার এর প্রয়োগ, রোগী মানসিকভাবে বিষণ্নতায় ভোগে। কর্মজীবনে সে নিজেকে অসহায় ভাবে। সাধারণ-স্বাভাবিক জীবনযাপন থেকে সে নিজেকে আলাদা ভাবতেই বেশি পছন্দ করে। তাই শুধু ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসায় অনেক রোগীকে মানসিক ভারসাম্য হারাতে দেখা গেছে।

কখন ইমুনোথেরাপি বন্ধ করতে হবে?
১. যখনই রোগীর রোগমুক্ত জীবন শুরু হবে তারপর দু-এক বছরের মধ্যে ধীরে ধীরে ইমুনোথেরাপি বন্ধ করলে পরবর্তী জীবনে উপসর্গহীন জীবনযাপন করা সম্ভব।
২. এ ছাড়া যেসব রোগী এক বছর ইমুনোথেরাপি ব্যবহার করার পরও উপসর্গ উন্নতির লাঘব হয়নি তাদের ক্ষেত্রে ইমুনোথেরাপি বন্ধ করা উচিত।
৩. ইমুনোথেরাপি চলাকালীন বারবার এনাফাইলাইটিক রিঅ্যাকশনে আক্রান্ত রোগীদের ইমুনোথেরাপি ব্যবহার থেকে বিরত থাকার জন্য বলা যেতে পারে।
৪. এ ছাড়াও যেসব রোগী ইমুনোথেরাপি গ্রহণে অসহযোগিতামূলক আচরণ করেন তাদের ক্ষেত্রে ইমুনোথেরাপি ব্যবহার থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়।
সঠিক পর্যালোচনায় দেখা যায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ইমুনোথেরাপি গবেষণায় প্রমাণিত সত্য যে, ইমুনোথেরাপি ওষুধ চিকিৎসার পাশাপাশি অ্যাজমা ও অ্যালার্জির তীব্রতা কমায়, বারবার আক্রান্তের হারকে কমায় ও রোগীকে রোগমুক্ত স্বাভাবিক জীবনযাপনে সহযোগিতা করে। তাই ইমুনোথেরাপির মাধ্যমে অ্যালারজেনগুলো শরীরের প্রতিক্রিয়ার ধরনকে বদলিয়ে দিয়ে প্রতিক্রিয়াহীন করার মাধ্যমে রোগীর অ্যালারজেনগুলোর ওপর সহনীয়তা বৃদ্ধি করে। ফলে ইমুনোথেরাপিপ্রাপ্ত রোগী পরবর্তী সময়ে ওই অ্যালারজেন দ্বারা রোগ উপসর্গ প্রকাশ থেকে মুক্ত হয়। তাই ইমুনোথেরাপি ওষুধ চিকিৎসার পাশাপাশি রোগমুক্ত স্বাভাবিক সুন্দর জীবনের জন্য অন্যতম নিয়ামক হিসেবে অ্যাজমা ও অ্যালার্জি রোগীদের রোগ চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকা রাখে।


*************************
ডা. গোবিন্দ চন্দ্র দাস
অ্যালার্জি ও অ্যাজমা রোগ বিশেষজ্ঞ, অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, অ্যালার্জি অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল ইমুনোলোজি বিভাগ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, ঢাকা।
দৈনিক নয়া দিগন্ত, ১৬ মার্চ, ২০০৮