আমরা অনেকেই মাছ খেতে উৎসাহী নই। আর মাছ খেলেও ছোট ছোট মাছ খেতে শিশুদের একেবারেই অনীহা। অথচ শিশুদের গুঁড়ামাছ খাওয়া খুব দরকার। গুঁড়ামাছের জন্য পুরুষের বাজারে কেনার আগ্রহ থাকলেও ঘরে গিন্নিদের গুঁড়ামাছ কাটার ঝামেলা চিন্তা করে তা অনেকেই কেনেন না। কিন্তু গুঁড়ামাছ স্বাস্থ্যের জন্য যেমনি উপকারী, তেমনি আর্থিকভাবেও তুলনামূলক সাশ্রয়ী।

গুঁড়ামাছ কেন খাবেনঃ
(১) বয়স ৪০-এর উপরে আমাদের শরীরে ফ্যাট এবং কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। গুড়ামাছে তা অত্যন্ত কম। তাই বয়স্করা গুড়ামাছ খাবেন।

(২) গুড়ামাছে আছে প্রচুর আমিষ, ভিটামিন, খনিজদ্রব্য, আয়রন, ভিটামিন-সি, নিয়াসিন, ভিটামিন-ডি, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস এবং ভিটামিন-এ।

(৩) শিশুদের রাতকানা রোগ ঠেকাতে ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ মলা, ঢেলা ও গুঁড়ামাছ খাওয়ান। শিশুদের ভবিষ্যৎ ভালো দৃষ্টিশক্তির জন্য গুঁড়ামাছ খুবই দরকার।

(৪) বাড়তি বয়সী শিশুদের প্রোটিন, আয়রন, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, এসকরবিক এসিড, ভিটামিন বি-৩, ভিটামিন-ডি-এর জন্য গুঁড়ামাছ উপকারী।

(৫) গুঁড়ামাছে প্রচুর প্রোটিন আছে। দরিদ্র দেশে অল্প টাকায় আমিষের অভাব পূরণ করে তা পুষ্টিহীনতা দূর করতে সাহায্য করে।

(৬) যাদের উচ্চ রক্তচাপ আছে তাদের জন্য ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ গুঁড়ামাছ ব্ল্যাডপ্রেসার কমায়। কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখে।

(৭) ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য খনিজ লবণ সমৃদ্ধ গুঁড়ামাছ উপকারী।

(৮) হৃদরোগী ও স্ট্রোকের রোগীর জন্যও তা উপকারী। বৃদ্ধাদের জন্যও বেশ উপকারী।

(৯) গর্ভবতী মা ও দুগ্ধদানকারী মায়ের জন্য গুড়ামাছ উপকারী।

(১০) খাদ্যে অরুচি এবং ক্ষুধামন্দা দূর করতে গুড়ামাছ বেশ সুস্বাদু উপাদেয় খাদ্য।
মাছের ইতিহাসঃ মৎস্য বিজ্ঞানীদের মতে খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ বছর আগে চীনে প্রথম মাছ চাষ হয়। পরে তা রোম থেকেও চাষ শুরু হয়। যিশু খ্রিষ্টের জন্মের ১ হাজার ৯০০ বছর পর মাছ চাষ শুরু হয় ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, ফিনল্যান্ড, হাঙ্গেরি, রাশিয়া প্রভৃতি দেশে। ভরতবর্ষে মাছ চাষ শুরু হয় খ্রিষ্টপূর্ব ৩৫০ সালে। বাঙালির প্রিয় খাদ্য মাছ সেই প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই। মাছ স্বাস্থ্যের জন্য ভালো যদি তা তৈলাক্তও হয়। কারণ ইলিশ, রুই, পাঙ্গাশ ইত্যাদি বড় মাছের তেলে আছে ওমেগা-৩ ফ্রাটি এসিড যা হৃদরোগসহ স্বাস্থ্যবান্ধব ও ক্ষতিকর কোলেস্টেরলকে নষ্ট করে। বাঙালির প্রিয় খাদ্য এখনো মাছ।

গুড়ামাছ কোনগুলোঃ গুঁড়ামাছ দুই রকমের
(১) খুব গুঁড়ামাছ কাচকি, মলা, ঢেলা, দাড়কিলা, আউন্যা, চান্দা, বজুরী, ছোট ইছা (চিংড়ির বাচ্চা)।
(২) একটু বড় প্রকৃতির পুঁটি, টেংরা, গনিয়া, কাটা মেনী, চাপিলা, টাকি, চেলা, বাইন, বেতরাঙ্গি, পাবদা, শিং, মাগুর, কৈ, হইল্যা, খইয়া।
তবে বাংলাদেশের এলাকাভিত্তিক নানা স্থানে নানা নামে গুঁড়ামাছ পাওয়া যায় নানা রকম।

গুড়ামাছ গরিবের প্রোটিনঃ বাংলাদেশের মতো দরিদ্র পুষ্টিহীন মানুষের জন্য গুঁড়ামাছ বিশাল ভূমিকা রাখে। ১০০ গ্রাম পুঁটি মাছে আছে ১৮ গ্রাম প্রোটিন, আর ১০০ গ্রাম বড় রুই মাছে আছে ১৬ গ্রাম প্রোটিন। তাই গুঁড়ামাছ দামেও কম, প্রোটিনও বেশি। শক্তি উৎপাদনেও গুড়ামাছ বিরাট ভূমিকা রাখে। ১০০ গ্রাম পুঁটি মাছ শক্তি উৎপাদন করে ১০৬ কিলোক্যালরি। তাই বড়লোকের রুই মাছের চেয়ে গরিবের পুঁটি মাছই বেশি প্রোটিন দেয়, বেশি শক্তি দেয়। সব গুঁড়ামাছেই গরিবের বিশাল প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।

গুড়ামাছের তরকারিঃ গুড়ামাছ বাঙালির বেশ উপাদেয় খাদ্য;
(১) এই শীতের সকালে আগের রাতে রান্না করা আউন্যা, বজুরী মাছের সরপড়া তরকারি কী যে মজার।
(২) টমেটো দিয়ে, জলপাই দিয়ে বা টক শাক (চুয়াই পাতা), মেট্রস দিয়ে গুঁড়ামাছের টক ঝোল কী যে সুস্বাদু দুপুরের গরম ভাতে।
(৩) টাকি মাছের ভর্তা আজো বাঙালির ভর্তার রাজা।
(৪) মলা, ঢেলা, কাচকি মাছ ধনিয়াপাতা, পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ দিয়ে রান্না বড়ই মুখরোচক খাবার।
(৫) গুঁড়ামাছের আদি রান্না পাতোরা (কলাপাতা বা কুমড়া পাতায়) বড়ই মজাদার খাবার।
(৬) পুঁটি মাছ ভাজা-গরমভাতে ধনিয়াপাতা ও কাঁচামরিচ দিয়ে অতুলনীয়।
(৭) মাগুর মাছ বা শিং মাছের আনাজী কলার তরকারি আর ঝোল জিব্বায় জল আসার মতো।
(৮) গরম ভাতে কৈ মাছ ভাজা তৈলাক্ত ঘ্রাণ। আহ কী যে মুখরোচক!
(৯) চান্দা মাছের বাটা দিয়ে বড়া ভাজা কতই না মজার।
(১০) হইল্যা মাছের বাটা দিয়ে কোপ্তা হলে আর যেন ভাত খেতে কিছুই লাগে না। (১১) চাপিলা বা পাবদা মাছের দো-পেয়াজা কতই না মজার।

আসুন গুঁড়ামাছ খাইঃ
(ক) দেশে গুঁড়ামাছ দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য বান্ধব এসব গুড়ামাছ আমাদের চাষ করে টিকিয়ে রাখতে হবে
(খ) শিশুদের গুঁড়ামাছ খেতে উৎসাহী করতে হবে।
(গ) গুঁড়ামাছ আর্থিকভাবে লাভ-জনক, সহজলভ্য ও পুষ্টিকর।

*************************
ডা. মোঃ আজিজুর রহমান সিদ্দীকি
গ্রন্থনাঃ সাজেদুর রহমান
দৈনিক নয়া দিগন্ত, ১৬ মার্চ, ২০০৮