সে দিন বিকেলে চেম্বারে গিয়ে যখন ঢুকি তখন আনুমানিক বিকেল ৫টা। আমি রোগী দেখা শুরু করার আগেই এক মধ্যবয়সী মহিলা মুখ ঢাকা অবস্থায় হন্তদন্ত হয়ে আমার রুমে ঢুকে বলেন­ স্যার, আমার খুব সমস্যা। আমাকে একটু আগে দেখে দেবেন কি? আমি বললাম­ আপনি কি সিরিয়াল নিয়েছেন? উত্তরে তিনি বললেন­ আমার সিরিয়াল ১৩। একটু পেছনে। আমার তো খুব কষ্ট হচ্ছে। যদি একটু দয়া করতেন, স্যার। আমি তার আবদার-অনুরোধ শুনে তাকে বসার জন্য বললাম এবং জানতে চাইলাম আপনার সমস্যাটা কী? তিনি তখন মুখের কাপড় খুলে বললেন­ স্যার, দেখুন আমার মুখের অবস্থাটা কী। আমি তাকিয়ে দেখলাম এবং বললাম কী হয়েছে আপনার মুখে? উত্তরে বললেন, অ্যালার্জি, স্যার। আমি বললাম­ কী করে হলো? তিনি বললেন­ জানি না। আমি বললাম­ ক’দিন ধরে এমন হয়েছে? তিনি বললেন­ পাঁচ দিন। তবে গত দুই দিন এত বেশি যে, পাগল হয়ে যাচ্ছি। রাতে এক ফোঁটাও ঘুমাতে পারিনি। খালি মুখ চুলকায়, শুধু হাত চলে যায় মুখের ওপর। আর চুলকালে ভালো লাগে। এখন মুখ ফুলে লাল হয়ে গেছে। আমি তাকিয়ে দেখলাম সত্যিই তার মুখে লাল আর ফোলা গোটা উঠে ভরে গেছে সারা মুখ। বললাম­ শুধু কি মুখেই এমন হয়েছে, না শরীরেও আছে? উত্তরে না, শুধু মুখেই। পাল্টা প্রশ্ন করে বললাম­ মুখে কি কোনো প্রসাধনী বা মলমজাতীয় কিছু মেখেছেন? তিনি বললেন­ মাখতাম, কিন্তু পাঁচ-ছয় দিন ধরে বন্ধ করে দিয়েছি। জানতে চাইলাম­ কী মাখতেন? তিনি উত্তরে বললেন­ মলম। তিনি যে মলমটির নাম বললেন তা শুনে আমার বুঝতে বাকি রইল না তার মুখের অবস্থার কারণ কী? তিনি যে মলমটির নাম বললেন সেই মলমটির নাম উল্লেখ না করেই আমি বলতে চাই­ এই মলমটি একটি স্টেরয়েড জাতীয় মলম যা ত্বকে অ্যালার্জি আর অ্যাকজিমা জাতীয় সমস্যায় যত্রতত্র ব্যবহার করা হয় আমাদের দেশে। কিন্তু সম্ভবত এ দেশে মুখের রঙ ফর্সা করতে এ মলমটির অপব্যবহার করা হচ্ছে দারুণভাবে। রোগিনী আমাকে আরো জানালেন, তিনি একজন বিউটিশিয়ানের পরামর্শে মুখের রঙ ফর্সা করতে এ মলমটি আড়াই বছর ধরে ব্যবহার করে চলছেন। অচিন্তনীয় ব্যাপারই বটে। এ জাতীয় স্টেরয়েড মলম স্বল্প সময়ের জন্য বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে মুখে ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে কোনো অবস্থায়ই একনাগাড়ে তা এক-দেড় সপ্তাহের বেশি হওয়া উচিত নয়। এর ক্ষেত্রে যেটা হচ্ছে দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে তার ত্বক এই মলমটির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। যেই না মলমটির ব্যবহার বন্ধ করা হয়েছে অমনি অ্যালার্জিক বিক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং এর ফলেই তার মুখের চুলকানি আর গোটাগুলো। স্টেরয়েড ত্বকে দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে এর বাইরেও নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়। যেমন­ ত্বক শুকিয়ে পাতলা হয়ে যেতে পারে, ত্বকের সরু রক্তনালীগুলো প্রসারণ, ফাটা ফাটা দাগযুক্ত হওয়া, অন্তঃত্বকের কোলাজেনের ক্ষয়, ত্বকের নিচে রক্ত জমাট বাধা। যা শুকাতে দেরি হওয়া, স্টেরয়েড-জনিত ব্রণ হওয়া অথবা ব্রণ-সদৃশ বোজাশিয়া রোগটিও হতে পারে, বেশি লোম গজাতে পারে, ছত্রাক বা জীবাণুর আক্রমণ ঘটতে পারে।

বাজারে আবার অনেক ধরনের ত্বক ফর্সাকারী মলমের বিজ্ঞাপনও দেয়া হয়। এটিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যবসার কৌশল মাত্র। তবে অনেক মহিলারই মুখে মেসতা হতে দেখা যায়; যেগুলো অনেক ক্ষেত্রে দূর করা সম্ভব হয়। কারণ, মহিলাদের ক্ষেত্রে মেসতার একটি অন্যতম কারণ জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি। আবার মহিলা গর্ভবতী হলেও মুখে মেসতা হতে দেখা যায়। সে ক্ষেত্রে বরং হাইড্রোকুইনিন মলম ব্যবহারে মেসতা দূর হয়। পাশাপাশি যদি মেসতার কারণ খুঁজে পাওয়া যায়, তা এড়িয়ে চললে মেসতা এমনিতেই ভালো হয়। মনে রাখবেন, মুখের ত্বক যাদের কালো পারতপক্ষে সূর্যের আলো একটু এড়িয়ে চলবেন। অন্তত মুখে যেন সূর্যের আলো একটু বেশি না পড়ে সে দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। কারণ সূর্যের আলোর অতি বেগুনি রশ্মি ত্বককে কালো করে দেয়। যদিও ত্বকের সংস্পর্শে সূর্যের আলোর সাহায্যে আমাদের দেহে ভিটামিন ডি তৈরি হয়, যা আমাদের সুস্থতার জন্য খুবই প্রয়োজন। আরেকটি কথা, একটু স্পষ্ট করে বলি­ যারা জন্মগতভাবে কালো অথবা শ্যামলা, তারা মলমের মাধ্যমে ফর্সা হওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা চালাবেন না। কারণ এতে ত্বক সাময়িকভাবে কিছুটা ফর্সা হতে পারে, কিন্তু ওষুধ বন্ধ করে দেয়ার পর আবার পূর্বাবস্থায় ফিরে যায়। মনে রাখবেন, কালোই জগতের আলো! তবে যদি কেউ কালো নিয়ে খুব বেশি দুশ্চিন্তায় ভোগেন, তবে একটু বেশি করে গাজর খাবেন। গাজরে ক্যারোটিন থাকে, যা ত্বকের গায়ে হালকা হলদে আভা এনে দেয়।

**************************
ডা. দিদারুল আহসান
চর্ম-অ্যালার্জি ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ, আল রাজি হাসপাতাল, ১২, ফার্মগেট, ঢাকা।
দৈনিক নয়া দিগন্ত, ২৩ মার্চ ২০০৮