রুপকথার গল্প থেকে আমরা জেনেছি লবণ ছাড়া রান্না করা খাবারের কোনও স্বাদ নেই রাজার মুখে, তাই ছোট রাজকুমারীর 'লবণের মত ভালবাসাই প্রকৃত ভালাবাস' শরীরবৃত্তিয় প্রয়োজনে পরিমিত মাত্রার খাবার লবণের যেমন দরকার তেমনি অতিরিক্ততা গুরুতর ক্ষতিরও কারণ। অধিক পরিমাণে খাবার লবণ গ্রহণ থেকে বিরত থাকলেই সুস্বাস্থ্য অর্জন করা যায়-এই প্রসঙ্গেই আজকের আলোচনা।

প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যে লবণ, খাবার রান্নার মশলা হিসেবেই সমাদূত। খাবার তৈরিতে লবণ খাবারকে সুস্বাদু করে, উপযুক্ত সিদ্ধ বা নরম করে, পচন রোধ করে। খাবার সংরক্ষণ করতেও (মাছ/মাংশ শুঁটকি হিসেবে) লবণ কাজে লাগে। রান্নার লবণ ও খাবার পাত্রে আলগা লবণ আমাদের জন্য লবণের মূল উৎস। এছাড়াও সব ধরণের তৈরি খাবার (হোটেলের তৈরি নাস্তা/ফাস্ট ফুড প্রভূতি), কৌটার সংরক্ষিত খাবার, সকল কোমল পানীয়, শাক সবজি ও ফল থেকেও আমরা লবণ গ্রহণ করি। খাবার লবণ বলতে আমরা সাধারণত সোডিয়াম ক্লোরাইড যৌগটিকেই বুঝি। বিট লবণ বা সোডিয়াম হাইপো ক্লোরাইটও বিশেষ কিছু খাবার তৈরিতে কাজে লাগে। শাক সবজি ও ফল থেকে আমরা লবণ পাই পটাশিয়াম-এর যৌগ হিসেবে।

একজন সুস্থ মানুষের শরীরে প্রতিদিন মাত্র ১ গ্রাম সোডিয়াম ক্লোরাইড প্রয়োজন। আমরা বাংলাদেশীরা প্রতিদিন গড়ে ১৬-১৭ গ্রাম সোডিয়াম ক্লোরাইড গ্রহণ করি। প্রতিদিন ইংল্যান্ড এবং আমেরিকাবাসীরা গড়ে ৯-১০ গ্রাম, চীন এবং জাপানবাসীরা গড়ে ১২-১৪ গ্রাম সোডিয়াম ক্লোরাইড গ্রহণ করে। প্রতিদিন লবণের পরিমাণ বিষয়ে ডঐঙ (ডড়ৎষফ ঐবধষঃয ঙৎমধহরুধঃরড়হ) দৈনিক সর্বোচ্চ ৫ গ্রাম এবং ডঅঝঐ (ডড়ৎষফ অপঃরড়হ ড়হ ঝধষঃ ্ ঐবধষঃয) দৈনিক সর্বোচ্চ ৬ গ্রাম এর বেশি কখনোই গ্রহণ করা উচিত নয় বলে মতামত দিয়েছে। সারা বিশ্বজুড়ে গবেষণাকৃত শথাধিক বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্রের দ্বারা এই বিষয়টি প্রমাণিত যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ শরীরের রক্তচাপ বাড়িয়ে তোলে। উচ্চ রক্তচাপকে বলা হয় নীরব ঘাতক। কারণ এর সুনির্দিষ্ট শারীরিক লক্ষণ নেই। শুধুমাত্র অতিরিক্ত লবণ সেবনই আপনাকে ঠেলে দিবে উচ্চ রক্তচাপ জনিত অধিকতর গুরুত্বর স্বাস্থ্য সমস্যা-হূদরোগ, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ ও স্থায়ী কিডনি রোগের দিকে। এছাড়াও পাকস্থলীর ক্যান্সার, কিডনিতে পাথর, অস্থি ক্ষয়রোগ, অতিরিক্ত ওজন, স্মৃতিশক্তি হ্রাস প্রভূতি রোগের ঝুঁকি অতিরিক্ত লবণ সেবনের দ্বারা বৃদ্ধি পায়। শুধুমাত্র পরিমিত লবণ সেবন করলেই বিনা খরচেই এইসব রোগের ঝুঁকি থেকে বেঁচে থাকা যায়। উদাহরণ হিসেবে, হিমালয়ের পাদদেশের কিছু গ্রামের মানুষের কথা বলা যায়। তারা লবণ সেবন করেন না বলে তাদের উচ্চ রক্তচাপও হয় না।

তাই, এখন থেকেই খাবারে অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ না করার জন্য আমাদের সচেতন হতে হবে। যদি আমরা ধীরে ধীরে চেষ্টা করি এটা খুবই সম্ভব। সহজেই নীচের কাজগুলো করা যায়-

০০ রান্নাতে অল্প লবণ ব্যবহার করা

০০ ঘরের বাইরে তৈরি খাবার (হোটেলের তৈরি নাস্তা/ফাস্ট ফুড প্রভূতি) যতদূর সম্ভব পরিহার করা।

০০ কৌটায়/প্যাকেট এ সংরক্ষিত খাবার গ্রহণের ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়া।

০০ সব ধরণের সস, পনির ও কোমল পানীয় কম পরিমাণে গ্রহণ করা।

০০ প্রতিদিনের খাবারে শাক সবজি ও কাঁচা ফল রাখা।

সচেতনতা বৃদ্ধিতে গণমাধ্যমের (টেলিভিশন/রেডিও/সংবাদপত্র) পাশাপশি সমাজের গুরুত্বপূর্ণ লোকদের (শিক্ষক, ইমাম, ধর্ম যাজক, জনপ্রতিনিধি সকলকেই) এ বিষয়ে মতামত প্রদান করতে হবে। সরকারকে উপযুক্ত সহযোগিতার জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকেও কর্মসূচী দিতে হবে। সবচেয়ে বেশী গুরুত্ব দিতে হবে কিশোর এবং যুবক বয়সীদের প্রতি, যাতে কম বয়স থেকেই তারা অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ না করে বিনা খরচেই গুরুতর অসুস্থতা থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখে এবং সুস্থ সবল জাতি হিসেবে ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করে।

আশার কথা এই যে, যেহেতু লবণের সোডিয়াম উপাদানটিই বেশী ক্ষতি করে, তাই লবণ থেকে সোডিয়ামকে সরিয়ে এসকরবিক এসিড বসানোর জন্য বিজ্ঞানীরা গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে লবণের স্বাদ ঠিক থাকবে কিন্তু ক্ষতি হবে না। সারা বিশ্বের মত বাংলাদেশেও আগামী ২১ হতে ২৭ মার্চ বিশ্ব লবণ সচেতনতা সপ্তাহ পালন করা হবে। সেই আলোকে সবশেষে পুনরায় বলতে চাই-

অতিরিক্ত লবণ গ্রহণে উচ্চ রক্তচাপ বৃদ্ধি পায়। উচ্চ রক্তচাপ হূদরোগ, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ ও কিডনি রোগের একটি প্রধান কারণ। সুতরাং কম লবণ গ্রহণ করে ঝুঁকমুক্ত থাকুন এবং সুস্বাস্থ্য লাভ করুন।

**************************

অধ্যাপক ডা: আর কে খন্দকার

হৃদরোগ বিভাগ
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল
ও রিসার্চ ইনস্টিটিউট, মিরপুর-২, ঢাকা।

দৈনিক ইত্তেফাক, ২৬ মার্চ ২০১১