বদলাচ্ছে জলবায়ুঃ চাই স্বাস্থ্যের সুরক্ষা
৭ এপ্রিল পালিত হয় বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জ্নদিন হিসেবে প্রতিবছর এই দিনে বিশ্ববাসীর প্রধান স্বাস্থ্য-সমস্যার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে সচেতন হতে আহ্বান জানানো হয়। জলবায়ুর পরিবর্তন বিশ্বের জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাড়িয়েছে। তাই এবছর বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে-‘জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব থেকে স্বাস্থ্যের সুরক্ষা’।

জলবায়ুর পরিবর্তনের বিষয়টি ক্রমে স্পষ্ট হয়ে উঠছে, উত্তপ্ত হচ্ছে ভূমণ্ডল। উত্তাপ ক্রমেই বাড়ছে। আর এর জন্য দায়ী মানুষের কাজকর্ম। এ ধারা রোধ করতে না পারলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও তাপপ্রবাহ সম্পর্কিত আঘাত আর রোগ ও মৃত্যুর মুখোমুখি হতে থাকবে সারা বিশ্বের মানুষ। খাদ্যবাহিত, জলবাহিত এবং পোকা-পতঙ্গের মাধ্যমে সম্প্রসারিত রোগে আক্রান্ত হবে অনেক মানুষ। অকালমৃত্যু ঘটবে অসংখ্য লোকের। দূষিত বায়ুবাহিত রোগেও আক্রান্ত হবে অনেকে।

অধিকন্তু বিশ্বের অনেক অংশে স্কীত সমুদ্রজলের প্লাবনে, খরা ও দুর্ভিক্ষের কারণে স্থানান্তরিত হবে অসংখ্য মানুষ। গ্ল্যাসিয়ারগুলো গলতে থাকবে আর তখন বদলে যাবে অনেক দেশের মানচিত্র। জলবায়ুর পরিবর্তনে সার্বিকভাবে স্বাস্থ্যের কতগুলো মূল নির্ণায়ক খাদ্য, বায়ু ও জলের ওপর পড়বে বিরূপ প্রভাব। জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে যেসব রোগ হচ্ছে, যেমন-ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, ডায়রিয়া, প্রোটিন ও শক্তির অভাবে অপুষ্টি-ইতিমধ্যে এগুলো বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর ৩০ লাখ মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছে। জলবায়ুর পরিবর্তন বিশ্বের বৃহৎ এলাকার খাদ্যশস্য ও সুপেয় জল সরবরাহের ওপর যে বিরূপ প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা এবং সে কারণে পরোক্ষ যে প্রভাব স্বাস্থ্যের ওপর পড়বে, একে এখনো অনুমান করা সম্ভব হয়নি। পৃথিবীর সব লোকই সংকটের মুখোমুখি, তবে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর পড়বে কঠোর আঘাত। দারিদ্র্যের কারণে রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি হয়েছে, সেই অগ্রযাত্রা জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে হুমকির মুখোমুখি। ধনী ও দরিদ্রতম লোকদের স্বাস্থ্যসুবিধা ও স্বাস্থ্য-অবস্থার ক্ষেত্রে ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে। এটি সমীচীন নয়, গ্রহণীয়ও নয়। জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব বিশ্বে সর্বত্র একই রকম হয়তো হবে না। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে ছোট ছোট দ্বীপের অধিবাসী, উচ্চ পর্বতাঞ্চলের মানুষ, ঘনবসতিপূর্ণ সমুদ্রতীর এলাকা হবে সংকটের মুখোমুখি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যেমন বিভিন্ন ভৌগোলিক এলাকার মধ্যে হবে নানা রকম, তেমনি স্বাস্থ্যে এর বিরূপ প্রভাব আরও কিছু বিষয়ের ওপরও নির্ভরশীল, যেমন-উন্নয়নের মান, দারিদ্র্য ও শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য অবকাঠামো, ভূমি ব্যবহারের ধরন এবং রাজনৈতিক আচার। প্রথমত, উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর পড়বে চরম আঘাত। যেসব দেশে দারিদ্র্য ও অপুষ্টি বেশি, স্বাস্থ্য অবকাঠামো দুর্বল এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা রয়েছে, সেসব দেশে এই সংকট মোকাবিলা করা দুঃসাধ্য হবে। আর জলবায়ুর পরিবর্তন ও স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাবকে যদি যথাসময়ে কর্মবিবেচনায় না আনা যায়, তাহলে মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্টের লক্ষ্যে পৌঁছানো হবে কঠিন কাজ।

জলবায়ুর পরিবর্তনের জন্য উদ্বেগের সূচনা অনেক আগে হলেও গত বছরই এ বিষয়ে ব্যাপক উৎসাহের সৃষ্টি হয় বিজ্ঞানী মহলে। জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর আন্তসরকার প্যানেলের (আইপিসিসি) চতুর্থ মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় ২০০৭-এ। তিন হাজার ৬০০ বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞের তিনটি ওয়ার্কিং গ্রুপের তিন বছরের অক্লান্ত গবেষণা, চার হাজার ৫০০ বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ এবং বিভিন্ন সরকারের ৩০০ মন্তব্যের মিলিত ফসল হলো এই প্রতিবেদন। প্রতিবেদনে দৃঢ়ভাবে দেখানো হয় যে বিশ্বজুড়ে জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটার কারণ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল প্রতিনিয়ত মানবসৃষ্ট গ্রিনহাউস গ্যাসে হচ্ছে ভারাক্রান্ত। বনভূমি উজাড় হওয়ার জন্য এবং শক্তি আহরণের জন্য জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে নির্গত হচ্ছে কার্বন ডাই-অক্সাইড; আর ধানক্ষেত, পশুপালন ও ভূমি ভরাট স্থল থেকে নির্গত হচ্ছে মিথেন গ্যাস। ২০০৬ সালে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মান হলো ৩৮৫ পিপিএম, যা গত ছয় লাখ ৫০ হাজারের জলবায়ু রেকর্ডের সীমা অতিক্রম করেছে। আইপিসি বলছে, ২১০০ সালের মধ্যে ভূমণ্ডলের উত্তাপ বাড়বে ১·৮ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২১০০ সালের মধ্যে সমুদ্র স্কীত হবে ৯·৮৮ সেন্টিমিটার।

বাংলাদেশের জন্য এ চিত্রটি আরও প্রকট। বাংলাদেশে ১৫০ বছরের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়বে ১·৫ মিটার, ফলে ২২ শতাংশ স্থলভাগ হবে নিমজ্জিত, এর বিরূপ প্রভাব পড়বে প্রায় এক কোটি ৫০ লাখ মানুষের ওপর।

স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব কেমন হবে?
আইপিসিসির মতে, ১৮টি তাপপ্রবাহ আঘাত করেছে ভারতকে ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সালের মধ্যে। এতে মৃত্যু হয়েছে কয়েক হাজার লোকের। বেশি মৃত্যু হচ্ছে গ্রামের লোকদের, বৃদ্ধ ও বাইরে থাকা মানুষ বেশি প্রভাবিত হয়েছে এ বিপর্যয়ে। যেমন বাংলাদেশে রিকশাওয়ালা ও অন্য কর্মজীবীদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে বেশি। ২০০৬ সালে বানের কারণে রোগ বেড়েছে বাংলাদেশ ও ভারতে। ২০০৭ সালেও বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালে হয়েছে প্রবল বন্যা। গত বছর নভেম্বরে ঘূর্ণিঝড় সিডর আঘাত হেনেছে বাংলাদেশে। বাতাস বয়েছে ঘণ্টায় ২৪০ কিলোমিটার বেগে, হয়েছে প্রবল বৃষ্টি। ৮৫ লাখ মানুষ হয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত, মৃত্যুবরণ করেছে তিন হাজার তিন শরও বেশি লোক।

আবহাওয়ার কারণে, বিশেষ করে উত্তপ্ত ভূমণ্ডলের জন্য বাড়ছে অনেক রোগ।
যেমন-অপুষ্টি (বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর ৩৭ লাখ মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে)। ডায়রিয়ায় ১৯ লাখ মানুষ প্রাণ হারাতে পারে। ম্যালেরিয়ায় প্রাণ হারাতে পারে নয় লাখ মানুষ।

বাড়ছে শ্বাসযন্ত্রের ব্যাধি, যেমন-হাঁপানি।

তাপপ্রবাহের জন্য অনেক লোক হবে তাপাহত। সুপেয় পানির অভাবে বাড়বে পানিবাহিত রোগ কলেরা ও অন্যান্য ডায়রিয়াজনিত বালাই। বাড়বে অপুষ্টি, কমে যাবে খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ।

আবহাওয়ার দুর্যোগের কারণে অনেকে প্রাণ হারাবে, অনেকে হবে আহত ও পঙ্গু। ভেক্টরবাহিত রোগ, যেমন-ম্যালেরিয়া ও ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়বে।

বাংলাদেশে সমুদ্রপৃষ্ঠ স্কীত হওয়ার জন্য ভবিষ্যতে অনেক মানুষ হবে গৃহহারা ও স্থানান্তরিত। এমনটি ঘটবে মালদ্বীপ ও ইন্দোনেশিয়ায়।

বাংলাদেশে সিডরের কারণে নয়টি জেলার যে লাখ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেখানে কাজ করছে ৬৯০টি চিকিৎসা দল। বাগেরহাট জেলা হয়েছে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত। ডায়রিয়া, চর্মরোগ, চোখের সংক্রমণ, নিউমোনিয়া, টাইফয়েডের প্রকোপ সেখানে সবচেয়ে বেশি।

জলবায়ুর পরিবর্তনের এ বিষয়টি নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে এসে দাঁড়িয়েছে। আমাদের স্পষ্ট করে জানাতে হবে যে দ্রুত পরিবর্তনশীল এ পরিবেশে শুধু পশুপাখি ও গাছপালা রক্ষা করা দরকার তা-ই নয়, সুরক্ষা চাই মানুষের জন্যও। আর চিরাচরিত জনস্বাস্থ্য রক্ষার কৌশলগুলো দিয়েই একে মোকাবিলা করা সম্ভব। বিশুদ্ধ পানি ও পয়োনিষ্কাশনের সুব্যবস্থা, নিরাপদ ও পর্যাপ্ত খাদ্য, টিকাদান কর্মসূচি, রোগের তদারকি, নজরদারি ও ব্যবস্থা গ্রহণ, ভেক্টর নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ, দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি-এগুলো জলবায়ু পরিবর্তনে স্বাস্থ্যের ওপর যে প্রভাব ফেলবে তা মোকাবিলা করার মূল কৌশল। এ জন্য দেশে দেশে সরকার জলবায়ু পরিবর্তন নীতির কেন্দ্রে রাখবে জনগণের সুস্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্য রক্ষা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে এ বিষয়ে উদ্যোগী ভূমিকা নিতে হবে। জলবায়ুর পরিবর্তন স্বাস্থ্যের জন্য যে হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে, একে মোকাবিলা করা প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষা কীভাবে সম্ভব? জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার আরও জোরালো ও সুসমন্বিত কর্মোদ্যোগ, বিশেষ করে জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট রোগের ব্যাপারে নজর দেওয়া এবং অগ্রাধিকার দেওয়াও জরুরি। বিশেষ করে এ উদ্যোগ উঠে আসতে হবে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার পর্যায় থেকে।
প্রতিরোধক জনস্বাস্থ্য ক্রিয়াকলাপের লক্ষ্য হবে দুটো-বর্তমান স্বাস্থ্য পরিস্থিতির উন্নতি এবং জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে বিপদ থেকে ভবিষ্যতে মানুষকে আরও বেশি নিরাপত্তা দেওয়া। কেবল সরকার কেন, ব্যক্তি, গোষ্ঠী, করপোরেট খাত, বেসরকারি সংস্থা-সবার মিলিত উদ্যোগে এ কাজটি সুসম্পন্ন হওয়া সম্ভব।
গলে যাওয়া গ্ল্যাসিয়ার ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে সৃষ্ট খাদ্য ও পানীয় জলের সংকট সমুদ্র-তীরবর্তী অঞ্চলে সমুদ্রজলের প্লাবনে হতে পারে মানুষের মধ্যে এসব সংকট এবং ফলে অপুষ্টি। এ ছাড়া আবহাওয়া- সংবেদনশীল রোগ, যেমন-মালেরিয়া, ডেঙ্গু ও কলেরা এবং অন্যান্য পানিবাহিত রোগ বাড়বে। সবশেষে অসংখ্য মানুষ এ সংকট থেকে রক্ষার একমাত্র পথ হিসেবে বেছে নেবে দেশান্তরি হওয়াকে। গৃহহারা, আশ্রয়হারা, সম্পদহারা ও জীবিকার উপায়হীন মানুষের মধ্যে বাড়বে মানসিক রোগ।

মানবতার ইতিহাসে এই চ্যালেঞ্জটি সম্ভবত এত বড় যে আগে একে অনুমান করা যায়নি। তাই প্রথমে এ ব্যাপারে চাই ব্যাপক গণসচেতনতা, চাই সম্মিলিত উদ্যোগ।

শেষ কথা
জলবায়ু পরিবর্তনে যে সমস্যা দেখা দেবে, একে মোকাবিলার জন্য প্রথম সারিতে থাকবে হেলথ প্রফেশনালরা। কোন ধরনের জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হবে? যেসব দেশে স্বাস্থ্যব্যবস্থা দুর্বল; ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, অপুষ্টি, ডায়রিয়ার মতো রোগ নিয়ন্ত্রণ কঠিন; সেসব দেশে জনস্বাস্থ্য-ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হবে। সরকার, বেসরকারি সংস্থা-সবাইকে সম্মিলিতভাবে সংক্রামক রোগের তদারকি, নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ, সুপেয় পানি সরবরাহ, জরুরি অবস্থায় স্বাস্থ্য রক্ষা-এসব বিষয়ের দিকে বেশি করে নজর দিতে হবে। 
 
**************************
অধ্যাপক ডা· শুভাগত চৌধুরী
পরিচালক, ল্যাবরেটরি সার্ভিসেস
বারডেম হাসপাতাল, ঢাকা