কিলয়েড হলো এক ধরনের অস্বাভাবিক স্কার যা আঘাতের ছয় মাস পরেও ক্রমেই বাড়তে থাকে। নাক বা কান ফোড়ানো, কাটা-ছেঁড়া, পুড়ে যাওয়া অথবা অপারেশনের পর এটা হতে পারে। কিলয়েড দেখতে কালো ও উঁচু দাগের মতো। যা রোগীর জন্য প্রায়ই গ্রহণযোগ্য হয় না। এতে প্রচন্ড চুলকানিও হতে পারে। জেনেটিক কারণে কোনো কোনো ব্যক্তির কিলয়েড তৈরির প্রবণতা দেখা যায়। শরীরের বিশেষ কিছু জায়গা যেমন কানের লতি, বুকের উপর, কাঁধ প্রভৃতিতে কিলয়েড হতে দেখা যায়।

চিকিৎসা
লোকাল কমপ্রেশনঃ এই পদ্ধতিতে কোনো কোনো কিলয়েডের আকার ছোট করা যায়। কিলয়েডের বৃদ্ধির প্রতিরোধে এটি বেশ কার্যকরী।

ষ্টেরয়েড ইনজেকশনঃ কিলয়েডের ভেতরে ট্রায়েমসিলেনেল ইনজেশন অনেক ক্ষেত্রে ভালো ফল দেয়। কিন্তু এটি চার সপ্তাহ পরপর কয়েকবার দিতে হয়।

সিলিকন জেলঃ সিলিকন জেল শিট বা জেলি আকারে কিলয়েডের ওপর লাগানো অত্যাধুনিক পদ্ধতি হিসেবে আজকাল প্লাষ্টিক সার্জনরা ব্যবহার করছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি খুব কার্যকরী। যদিও সিলিকন জেল কীভাবে কিলয়েডের ওপর কাজ করে সেটা এখনো সম্পুর্ণ জানা যায়নি।

ইন্ট্রালেশনাল এক্সিশনঃ এর অর্থ হলো অপারেশনের মাধ্যমে কিলয়েড টিস্যুর অপসারণ। যখন অন্য পদ্ধতিগুলো বিফল হয় অথবা কিলয়েডটি বড় ও শক্তি থাকে তখন এই পদ্ধতি ব্যবহার করা যায়। অন্য সব অপারেশন থেকে এটি একটু ভিন্ন ধরনের। এক্ষেত্রে চারদিকে খুব পাতলা কিলয়েড টিস্যু রেখে মাঝখান থেকে কিলয়েড টিস্যু অপসারণ করা হয়। যাতে চারদিকের স্বাভাবিক ত্বক কাটা না পড়ে। নয়তো কাটা স্হানে আবার কিলয়েড গঠিত হবে। একই সঙ্গে প্রান্তে থেকে যাওয়া কলিয়েড টিস্যুতে ষ্টেরয়েড ইনজেকশন দেয়া হয়। এরপর সেলাই করে মাঝখানের ফাঁকা জায়গা জোড়া দেয়া হয়। তবে ফাঁক বড় হলে তা স্কিন গ্রাফটিংরে মাধ্যমে পুরণ করা হয়। অপারেশনের মাধ্যমে সম্পুর্ণ কিলয়েড অপসারণ কখনই করা উচিত নয়। কারণ এতে আরো বড় কিলয়েড গঠিত হয়। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, এই পদ্ধতি এখনো ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

কেস রিপোর্টঃ কানে নডিউলসহ একজন ১৯ বছরের মেয়েকে জনৈক ডাক্তার ‘রেফার’ করেন। মেয়েটি ছিল অবিবাহিত ও খুবই সুশ্রী, তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেল কানে কিলয়েডের কারণে সে বড়ই অসহায় বোধ করছে এবং সব সময় ওড়না দিয়ে কান ঢেকে রাখে।

চার বছর আগে কান ফোড়ানের পর থেকেই এই ঘটনার সুত্রপাত। প্রথমে কান ছিদ্রের জায়গায় ছোট দানা দেখা যায় এবং এক বছর না যেতেই কানের ছিদ্র সম্পুর্ণরুপে বন্ধ হয়ে যায় ফলে দুল পরা আর সম্ভব হয় না। ডান কানের কিলয়েডটি বাঁ কানটার থেকে আকারে ছোট ছিল। এক সময় বাঁ কানের লতির সামনে ও পেছনে উভয়দিকই ফুলে যায়। তার সুন্দর মুখশ্রীর সঙ্গে ছিল সত্যিই বেমানান। আসলে দু’বছর আগে একজন সার্জন টোটাল এক্সিশনের মাধ্যমে তার কিলয়েডটি অপারেশন করেন, ফলে কিলয়েড পুনরায় আরো বড় আকারে তৈরি হয়। বর্তমানে চিকিৎসার ব্যাপারে সমস্ত ব্যাপার তাকে বুঝিয়ে বলা হয়। তার ডান কানের কিলয়েডটি ছোট থাকায় এতে ট্রামেসিলেনেল ইনজেকশন দেয়া হয়। বা কানেরটা বড় থাকায় এখানে ইন্ট্রালেসনাল এক্সিশন পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। আশপাশের নরমাল ত্বক স্পর্শ না করে খুব সাবধানে কিলয়েড টিস্যু বের করে আনা হয়। এই অপারেশনে তীক্ষ্ন ছুরি ও খুব সুক্ষ্ম যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়। কিনারাগুলোতে অল্প পরিমাণ ষ্টেরয়েড ইনজেকশন দেয়ার পর মাঝখানের ফাঁকা জায়গাটি সুক্ষ্ম সুতার সাহায্যে জোড়া দেয়া হয়। সেলাই খালি চোখে দেখাই যাচ্ছিল না। সেলাই ধীরে ধীরে শরীরের সঙ্গে মিশে যাওয়ায় তা কাটার আর প্রয়োজন পড়েনি। মাঝের ফাঁকা জায়গা সেলাইয়ের মাধ্যমে জোড়া লেগে যাওয়ায় স্কিন গ্রাফটিংয়ের প্রয়োজন হয়নি। এই চিকিৎসার ফলাফল ছিল নাটকীয় ও অত্যন্ত সন্তোষজনক। আয়নায় নিজেকে দেখার পর মেয়েটির মুখে খুশির ঝলক ছিল সত্যিই দেখার মতো। তাৎক্ষণিক ফলাফলের চেয়েও গুরুত্বপুর্ণ হলো দীর্ঘমেয়াদি ফল অর্থাৎ কিলয়েড পুনর্গঠিত না হওয়া এবং এটিই তাকে দেয়া সম্ভব হয়েছে। অপারেশনের পরেও ফলোআপ অবসারভেশনে তাকে আসতে বলা হয়। অপারেশনের দুই বছর পরে এখন সে সম্পুর্ণভাবে সুস্হ ও কিলয়েডের পুনর্গঠন থেকে সম্পুর্ণ মুক্ত।

**************************
অধ্যাপক ডা. সাঈদ আহমেদ সিদ্দিকী
লেখকঃ এফসিপিএস, (সার্জারি) এফআরসিএস (গ্লাসগো)
এফআইসিএস, এফএসিএস (ইউএসএ)
প্লাষ্টিক সার্জন, কসমেটিক সার্জারি সেন্টার লিঃ
শংকর প্লাজা (৫ম তলা),৭২, সাত মসজিদ রোড
ধানমন্ডি, ঢাকা-১২০৯। 
আমার দেশ, ১লা এপ্রিল ২০০৮