চিকিৎসা বিজ্ঞানী অ্যান্ডোস্কোপি সার্জারি বা মিনিম্যাল এক্সেস সার্জারি (এমএএস) যাকে ল্যাপারোস্কপি বলা হয়­ নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করেছে। জার্মানির শ্যাম ও লিন্ডারম্যান, ফ্রান্সের ব্রুহাটও হ্যাময়, ইংল্যান্ডের স্যাটন এবং যুক্তরাষ্ট্রের রিচও গোল্ডরথে ১৯৭০ থেকে ১৯৮০ সালে অ্যান্ডোস্কোপি সার্জারিতে এক বৈপ্নবিক পরিবর্তন আনেন। শল্য চিকিৎসায় প্রথম পিত্ত থলি অপারেশন (ল্যাপকলি) হয় ১৯৮৫ সালে। ১৯৮৭ সাল থেকে এটি জনপ্রিয় হতে শুরু করে। আর বর্তমান সময়ে ল্যাপারোস্কপি শল্য চিকিৎসার এমন এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়েছে যে এটিকে চিকিৎসকের স্টেথোস্কোপ বা গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড বলা হয়ে থাকে।

পদ্ধতিঃ নাভির নিচে ১ বা ১.৫ সেমি কেটে যন্ত্র ঢুকিয়ে পেটের মধ্যে কার্বন ডাই অক্সাইড প্রবেশ করিয়ে ন্যামোপেরিটানয়ম তৈরি করা হয়। এর ফলে পরিপাকতন্ত্র নিচে সরে যায়। এর ফলে অতি সহজে দেখে দেখে রোগ সনাক্ত করা যায়। এটি টিভি মনিটরিংয়ে ১০ থেকে ৪০ গুণ বড় করে দেখানোর ফলে রোগ সনাক্তে আরো সহজ হয়। প্রয়োজনে আরো ২-৩ টি ছোট ছিদ্র করেও যন্ত্র ঢুকিয়ে কাজ করা হয়। স্ত্রী রোগ চিকিৎসার জন্য নিচে ভ্যাজাইনা দিয়ে টেনেকুলাম দিয়ে উপরে-নিচে বা সামনে -পেছনে এনে (সহকারী) সার্জনকে উপর থেকে কাজ করতে সাহায্য করেন। ১৯৮৯ সালে হ্যারি রিচ প্রথমে ফাইব্রো অপটিকস অ্যান্ডোস্কোপ বা ল্যাপারোস্কপির মাধ্যমে জরায়ু অপারেশন (ল্যাপারোস্কপি অ্যাস্টিটেড ভ্যাজাইনাল হিস্টেরেক্টমি বা এলএভিএইচ করে চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনেন যা এত দিন শুধু পেট কেটেই করা হতো। এখন পিত্তথলি, স্ত্রীরোগ চিকিৎসা ছাড়াও মুত্র থলি বিষয়ক এপিন্ডিসেক্টমি, শিশু জন্মগত পরিপাকতন্ত্রে সমস্যা, হার্নিয়া অপারেশন, এপিআর (অ্যাবডোমিনু পেরিনেটাল রিসেকশান), মস্তিষ্কে টিউমার, থাইরয়েড গ্রন্থি টিউমার ইত্যাদি রোগে এ চিকিৎসা অভূতপূর্ব সাফল্য এনেছে।

যন্ত্রপাতি
ভেরেস নিডিলঃ পেটে ছোট ছিদ্র করে গ্যাস প্রবেশ করানোর জন্য উন্নত ধরনের ল্যান্স সিস্টেম বা টেলিস্কোপ, লাইট সোর্সঃ উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন লাইট (জেনন বা হ্যালোজেন); মাইক্রোচিপ ভিডিও ক্যামেরা; অপারেশন কক্ষে ভিডিও মনিটরিং ও থ্রি ডাইমেনশনাল ইমেজ সিস্টেম। সর্বোপরি ইনসাফ্লেটর (যার মধ্যে বাতাস ভর্তি থাকে)।

স্ত্রী রোগ বিষয়ে চিকিৎসার জন্য অ্যান্ডোস্কোপিকে দুভাগে ভাগ করা যায়। ১) ল্যাপারোস্কপিতে রোগ সনাক্তকরণ ও চিকিৎসা দুইই সম্ভব।
হিস্টেরোস্কোপিঃ এর মাধ্যমে জরায়ুর ভেতরে প্যানোরোমিক ভিউ বা পুরোটা সব দিক থেকে দেখা ও প্রয়োজন মতো অপারেশন সম্ভব। এ ক্ষেত্রে রোগীকে পুরোপুরি অজ্ঞান করারও প্রয়োজন নেই। শক্ত নল জরায়ুর ভেতরে ঢুকিয়ে নরমাল স্যালাইন দিয়ে প্রসারিত করে দেখা হয়।

এর ব্যবহার
মাসিক বন্ধ হবার আগে অথবা পরেও অনিয়মিত ঋতুস্রাব যা ওষুধে নিয়ন্ত্রণ আসেনি এমন; জরায়ুতে পলিপ, ছোট টিউমার অপসারণ; বারবার অন্যান্য কারণ ছাড়া গর্ভপাত হওয়া যেমন জরায়ুর গঠনগত সমস্যা, পর্দা থাকা; জরায়ুতে ফরেন বডি বা আইইউসিডি শক্ত হয়ে বসে থাকা; জরায়ু মুখ, জরায়ু ভেতর বা কোনায় লেগে থাকা; মাসিকের মাঝামাঝি সময়ে রক্ত যাওয়া বা সহবাসের পর রক্ত যায় জরায়ু মুখ স্বাভাবিক থাকার পরও।

ল্যাপারোস্কপির ব্যবহারঃ
সানক্তকরণ (ডায়গনোসিস)ঃ বন্ধ্যা নারীর জন্য টিউব বা ডিম্বনালী ঠিক আছে কি না, টিউবের পাশে অ্যাডেসান আছে কি না, ওভারি ঠিক আছে কি না, এতে ডিম ঠিকমতো পরিপক্ক ও বের হয় কি না (ওভোলেশন), পরিসিস্টিক ওভারি কি না দেখে সনাক্ত করা যায়।

পেলভিক পেইনের জন্যঃ অ্যান্ডোমেট্রিওসসিস, পিআইডি, টিউবে বাচ্চা ইত্যাদিতে।
মাসিক একেবারে (প্রাইমারি), বা পরে না হওয়া (সেকেন্ডারি অ্যামেনোরিয়া) জরায়ু না থাকা (এজেনেসিস), ওভারি বা ডিম্বাশয় না থাকা (স্ট্রিক গোনাড বা ডিসজেনেসিস)।
চিকিৎসা ক্ষেত্রে (ট্রিটমেন্ট বা সার্জারি)ঃ অ্যাক্টোপিক বাচ্চা ফেটে যাবার আগে বা পরে, পেলভিক পেইনে, লেগে থাকা ছুটানো (অ্যাঢেসিওলাইসিস), পলিসিস্টিক ওভারির চিকিৎসা, ওভারিতে পানি ভর্তি টিউমার চিকিৎসা (ওভারিয়ান সিস্ট),
জরায়ু টিউমার অপসারণ (মাইওমেক্টমি): জরায়ু অপসারণ (এলএভিএইচ), টিউব বন্ধ বা লাইগেশন করাঃ ক্লিপ রিং দিয়ে বা ব্যান্ড দিয়ে।

কখন ল্যাপারোস্কপি করা যাবে নাঃ পেটের ভেতরে খারাপ প্রদাহ (সিভিয়র পেরিটোনিটিস), পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা (প্যারালাইটিক আইলিয়াস), খারাপ ধরনের রক্তক্ষরণ সমস্যা (বি্নডিং ডিসওর্ডার), পেটে আগে অস্ত্রোপচার করা হয়ে থাকলে, তল পেটে অনেক বড় টিউমার
ল্যাপারোস্কপির সুবিধাসমুহঃ কম রক্ত ক্ষরণ, কম ব্যথা ও কম ওষুধ, কম সময় হাসপাতালে থাকা, দ্রুত ভালো হওয়া ও কাজে যোগদান, পেটে কোনো বড় দাগ না থাকা
অসুবিধাসমূহঃ অর্থনৈতিক, এ চিকিৎসা গ্রহণের মানসিকতা, এজাতীয় চিকিৎসা ক্ষেত্রে তুলনামুলক ব্যয় একটু বেশি।

গাড়ির চালক বা পে্ননের পাইলট যেমন চোখ, কান অর্থাৎ পঞ্চইন্দ্রিয় এক করে সমগ্র মনোনিবেশ করেন তেমনি ল্যাপারোস্কপির মাধমে চিকিৎসার প্রয়োজন দক্ষ সার্জন যিনি এর যন্ত্র ও এদের ব্যবহার, থ্রি ডাইমেনশন এনাটমি সম্বন্ধে এবং কোনো সমস্যা হলে (রক্তক্ষরণ বা হঠাৎ জরুরি অংশ কেটে গেলে যিনি সামলে নিতে পারবেন শুধু তিনিই এ চিকিৎসায় সফল হবেন। এজন্য সঠিক পদ্ধতি ব্যবহার ও সঠিক রোগ চিহ্নিত করা জরুরি।

**************************
ডা. হামিদা বেগম
সহকারী অধ্যাপক, স্ত্রী ও প্রসূতি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়।
গ্রন্থনাঃ ডা. সানজিদা ইব্রাহিম