হার্ট অ্যাটাক এমন এক হৃদয় সমস্যা যা যেকোনো সময় এতটুকু পূর্বাভাস না দিয়ে, একটুও সময় না দিয়ে কেড়ে নিতে পারে যেকোনো মানুষের জীবন।

বাংলাদেশে প্রতি ১০ জনের মধ্যে একজনের হার্টের সমস্যা আছে এবং প্রতি ১ হাজার জনের একজন হার্টের সমস্যা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ও রিসার্চ ইনস্টিটিউট ১৮ মার্চ ঢাকায় এক বিবৃতিতে একথা জানায়। সাম্প্রতিক এক জরিপের উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়, হার্টের সমস্যা ধীরে ধীরে মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যা সৃষ্টি করে। ফলে প্রতি বছর ১৫ থেকে ২০ শতাংশ লোক উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, বিশ্বে মৃত্যুর সংখ্যার অর্ধেকই মারা যায় হার্টের রোগে ও স্ট্রোকে।

গত তিন দশকে এ দেশে করোনারি হৃদরোগের প্রকোপ যত বেড়েছে, পাল্লা দিয়ে বেড়েছে হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা, বেড়েছে আকস্মিক হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু। হার্ট অ্যাটাক হয়েও বেঁচে থাকার নানা মাত্রার অক্ষমতা আর তীব্র মৃত্যু ভয় নিয়ে দিন কাটানোর বিড়ম্বিত জীবন কাটানোর ঘটনাও স্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক ব্যাপার হলো, এ দেশে হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হচ্ছেন ৫০ পার করা তো বটেই, আক্রান্ত হচ্ছেন ৪০ পার করা অসংখ্য মানুষ। ৩০ পার করে হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হচ্ছেন, বিশেষ করে দেশের বড় শহরগুলোতে এমন সংখ্যাও আজ আর খুব বিরল নয়। করোনারি হৃদরোগ আর হার্ট অ্যাটাক পুরোপুরি না হলেও অনেকটাই প্রতিরোধযোগ্য। করোনারি হৃদরোগ আক্রান্ত হলেও নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন মেনে চললে আর যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে ওষুধপত্র খেলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা কমিয়ে আনা যায় উল্লেখযোগ্যভাবে।

বিশ্বের ১ নম্বর মরণব্যাধি হচ্ছে হৃদরোগ। করোনারি আর্টারি রোগের কারণে এক-তৃতীয়াংশ রোগী মারা যায়। লাখ লাখ হার্ট অ্যাটাক হয় প্রতি বছর। ২৫ শতাংশ লোক হাসপাতালে আসার আগেই মারা যায়। যদিও বাংলাদেশে বেশ কিছু সেন্টারে এনজিওপ্লাস্টি ও বাইপাস করা হচ্ছে তা কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। সচ্ছল রোগীরা প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। হৃদরোগের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে চলছে এবং এভাবে বেড়ে চললে আগামীতে হৃদরোগের চিকিৎসার হাসপাতাল ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার কয়েকগুণ প্রয়োজন হবে। কিন্তু রাতারাতি হৃদরোগের ডাক্তারের সংখ্যা ও বেড বাড়ানো সম্ভব নয়। তাই এর চিকিৎসার পাশাপাশি প্রতিরোধের ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত।

হৃদরোগের কারণঃ এর অন্যতম কারণ এ দেশের মানুষের জীবনযাত্রায় দ্রুতলয়ে পশ্চিমী ধাঁচের পরিবর্তন। ফাস্টফুডের রমরমার সাথে তাল মিলিয়ে বেড়েছে গাদাগুছের ফ্যাট খাওয়ার প্রবণতা, কমেছে যথেষ্ট শাকসবজি আর ফলফলাদি খাওয়ার অভ্যাস, কমেছে টাটকা খাবার খাওয়ার ঝোঁক, কমেছে পরিশ্রম।

জীবনের গতি বাড়তে বাড়তে জেটগতির জীবনের অভ্যস্ত হতে শুরু করেছেন একশ্রেণীর মানুষ। দ্রুতগতির জীবনে ইঁদুর দৌড় দৌড়াতে হলে মনের ওপর চাপ বাড়বেই। বাড়বে টেনশন, চাপ সইতে না পেরে বিক্ষত, বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা করোনারি হৃদরোগ বেড়ে চলার এও একটি অন্যতম কারণ।

অবিশ্বাস্যভাবে বেড়ে গেছে ধূমপান, বিশেষ করে কম বয়সে ধূমপান রপ্ত হওয়ার অভ্যাস। অতীতে বাঙালি জীবনে নানা ধরনের শারীরিক পরিশ্রম ছিল বেঁচে থাকার আবশ্যিক এক প্রয়োজন। কর্মমুখর, পরিশ্রমনির্ভর সেই জীবনযাপনের পদ্ধতি থেকে সরে এসেছেন দেশের এক বড় অংশের মানুষ। গ্রামের একশ্রেণীর মানুষ এখন মোটরসাইকেলে চড়েন বেশি, সাইকেলে চড়েন কম, হাঁটেন আরো কম। শহরাঞ্চলে লাফ দিয়ে দিয়ে বাড়ছে পরিশ্রমবিমুখ গাড়িচড়া আর বসে কাজ করার আয়েশি জীবন কাটানোর প্রবণতা। কমছে শরীরের ব্যায়াম, বাড়ছে হুলত্ব। এ দেশে করোনারি হৃদরোগ বাড়ানোর জন্য এরকম পরিশ্রমহীন বিলাসবহুল জীবনযাপন অনেকটা দায়ী।
ধমনীর ভেতরকার দেয়ালে চর্বির স্তর জমে কমতে থাকে রক্তের সঞ্চালন। ধমনীর ভেতর চর্বি জমে ধমনীর গহ্বর ধীরলয়ে সরু হতে থাকে যেকোনো মানুষের ২০-২২ বছর বয়স থেকে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে চর্বি জমার হারও বাড়ে, ধমনীর গহ্বর সরু হয় আরো। ধমনীতে চর্বির স্তর জমে ধমনীর দেয়াল মোটা আর গহ্বর সরু হতে থাকা, চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় আথোরোস্কোলোরোসিস, পরিণামে অ্যানজিনা প্যাকটোরিস এবং মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন ঘটনা ঘটে, সোজা কথায় হার্ট অ্যাটাক।
অনেকে করোনারি আর্টারি ব্লকের সমস্যাকে গ্যাস্ট্রিক সমস্যা বলে মনে করে গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খান এবং এ রোগের ভয়াবহতা দিন দিন বেড়েই চলে। যখন তীব্র লক্ষণ দেখা দেয় তখন হাসপাতালে যাওয়ার আগে বা পরে অনেকেরই মৃত্যু পর্যন্ত বরণ করতে হয়।

প্রচলিত চিকিৎসাঃ প্রচলিত চিকিৎসা বিজ্ঞানে এই করোনারি হার্ট ডিজিসের জন্য অ্যানজিওপ্লাস্টি বা বাইপাস সার্জারি করা হয়। উভয় পদ্ধতিতেই খচর অনেক বেশি এবং তা-ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ামুক্ত নয় এবং কয়েক বছরের মধ্যেই আবারো ব্লক দেখা দেয়। সার্জারির পর একজন মানুষের জীবনীশক্তি কার্যত অর্ধেকে এসে দাঁড়ায়।
ওষুধ ও অস্ত্রোপচার ছাড়া চিকিৎসাঃ ওষুধ ও অস্ত্রোপচার ছাড়াই হৃদরোগের নিরাময় লাভ করা সম্ভব এবং এ পদ্ধতির প্রবর্তক হচ্ছেন ক্যালিফোনিয়ার বিজ্ঞানী ডা. ডিন অরনিস। ১৯৮৭ সালে এই পদ্ধতি প্রবর্তনের পর থেকে এর সফলতা সর্বমহলে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। জীবনযাপন পরিবর্তনই হচ্ছে এ পদ্ধতির ভিত্তি। ওষুধ ছাড়াই হৃদরোগ চিকিৎসা ডা. অরনিশের সাফল্যের কথা বিশ্ববাসী প্রথম জানতে পারে ১৯৮৮ সালে। করোনারি আর্টারি রোগী অথচ বাইপাস সার্জারি করতে রাজি ছিলেন না এমন রোগীকে তিনি দু’ভাগে ভাগ করে চিকিৎসা শুরু করলেন। প্রথম গ্রুপের রোগীদের কম ফ্যাট ও বেশি আঁশযুক্ত খাবার, স্টেসমুক্ত থাকার পদ্ধতি, প্রাণায়াম যোগব্যায়াম ও মেডিটেশন করার উপদেশ ওেয়া হলো। আর দ্বিতীয় দলের রোগীদের হৃদরোগের সচরাচর ওষুধ দেয়া হলো।

দু’গ্রুপের লোকজনকেই বিশেষ তত্ত্বাবধানে রাখা হলো। রোগের অবস্থা আবার আগাগোড়া পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হলো কিছু দিন পরপর, পাওয়া গেল অদ্ভুত ফল। ডা. অরনিশের কার্যসূচি যারা অনুসরণ করেছিলেন তাদের ধমনীতে জমে থাকা চর্বি বা কোলেস্টেরল পরিষ্কার হয়ে রক্ত চলাচল বেড়ে যাওয়ায় তারা ভীতিকর বুকব্যথা থেকে মুক্তি পান এবং তাদের হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা কমে আসে। অপর দিকে দ্বিতীয় দলের রোগীরা আগের অবস্থায়ই থেকে গেল অর্থাৎ তাদের অবস্থার কোনো উন্নতি হলো না বরং কারো কারো ক্ষেত্রে আগের তুলনায় আরো খারাপ হলো।
ভারতের গবেষণাঃ ভারতের রাজস্থানের মাউন্ট আবুতে অবস্থিত গ্লোবান হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারে ডা. সতিশ গোপ্তার নেতৃত্বে করোনারি আর্টারি ডিজিস রিগ্রেশনের এক গবেষণা করা হয়। এতে ভারতের অন্যতম হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা অংশগ্রহণ করেন, তাদের মধ্যে প্রফেসর অনিল কুমার, ভাইস প্রেসিডেন্ট, এশিয়া প্যাসিফিক সোসাইটি অব কার্ডিওলোজি ও সাবেক প্রেসিডেন্ট, ইন্ডিয়ান কার্ডিওলোজি সোসাইটি, ডা. এইচ কে চোপড়া (দিল্লি), সেক্রেটারি, কার্ডিওলোজি সোসাইটি অব ইন্ডিয়া, ডা. নরেশ তেহবান, এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্টর, এসকট হার্ট ইনস্টিটিউট অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারসহ অনেক কার্ডিওলোজিস্ট ও অন্য বিশেষজ্ঞরা অংশগ্রহণ করেন।

তারা ১ হাজার ২০০ রোগীর ওপর গবেষণা চালিয়ে যান। ৭ দিন পর থেকেই রোগীরা অনেকটা সুস্থবোধ করতে থাকেন এবং তাদের ওষুধ নেয়ার প্রয়োজনীয়তা কমে যায়। স্ট্রেস হরমোন লেভেল কমে যায় সেই সাথে কমে ওজন, উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস, অ্যাজমা এবং কোলেস্টেরল এবং বেড়েছে ইটিটি, ইজেকশন ফোর্স ও ট্রেডমিল টেস্টের ক্ষমতা। তারা ভারতের প্রেসিডেন্টের কাছে এই গবেষণার রিপোর্ট পেশ করেন। তাতে দেখা যায় প্রায় সব রোগীরই উন্নতি হয়েছে এবং সুস্থতা ফিরে পেয়েছে।

বাংলাদেশের অভিজ্ঞতাঃ ৩০-৩২ বছর বয়সের এক বাংলাদেশী রোগীর কথা বলছি। ৩ মাস আগে এনজিওগ্রামে তার লেফট এন্টেরিয়র ডিসেন্ডিং আর্টারিতে ৮৫-৯০ শতাংশ ব্লক ধরা পড়ে। ডাক্তাররা তাকে তাৎক্ষণিক এনজিওপ্লাস্টি করার পরামর্শ দেন। কিন্তু টাকার অভাবে তিনি তা করাতে পারেননি। তাকে প্রাণায়াম ও মেডিটেশন পদ্ধতি চালিয়ে যেতে বলা হয়। তিনি বিগত আড়াই-তিন মাসে এখন আগের অপেক্ষা অনেক ভালো আছেন। যেখানে তার আগে আধা মাইল হাঁটতে কষ্ট হতো, এখন সে কষ্ট ছাড়াই দুই-তিন মাইল হাঁটতে পারেন। তিনি এর মধ্যে ভারতের এক হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারকে দেখিয়ে এসেছেন। তিনি পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তার বর্তমান অবস্থা দেখে তাকে আগের পদ্ধতিগুলো মেনে চলার পরামর্শ দেন এবং আপাতত এনজিওপ্লাস্টি করার দরকার নেই বলে মত দেন।

কারা করবেনঃ (১) যাদের হৃদরোগ হওয়ার সম্ভাবনা আছে, যেমন­ হাইপারটেনশন, ডায়াবেটিস, অ্যাজমা, পরিবারে হার্টের অসুখের ইতিহাস, উচ্চ কোলেস্টেরল ও স্থূলতা তারা উপরোক্ত পদ্ধতিগুলো মেনে চলে প্রাথমিক প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন যাতে তাদের করোনারি আর্টারি ডিজিস না হয়। (২) যাদের এনজিওগ্রাম করার পর করোনারি আর্টারিতে ব্লক ধরা পড়েছে তারা সেকেন্ডারি, প্রতিরোধ করে এ রোগের ভয়াবহ উপসর্গ থেকে পরিত্রাণ পেতে পারেন। (৩) যাদের এনজিওপ্লাস্টি বা বাইপাস অপারেশন করা হয়ে গেছে তাদের যেন আবার ব্লক না হয় সে জন্য তারা টারসিয়ারী প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন।

অধিকাংশ ডাক্তার মনে করেন করোনারি আর্টারি একবার ব্লক হতে শুরু করলে এর গতি আর পাল্টানো যায় না। কিন্তু উপরিউক্ত গবেষণায় দেখা গেছে, জীবনধারা পরিবর্তন করে বিশেষত খাওয়ার পরিবর্তন, সুচিন্তা, প্রাণায়াম ও মেডিটেশনের মাধ্যমে ব্লক সারানো সম্ভব। আমাদের দেশের লাখ লাখ হৃদরোগী যারা এ রোগের নিরাময়ের জন্য প্রচুর টাকা ব্যয় করে এমনকি অনেকে বাড়িঘর, জমিজমা বিক্রি করে এনজিওপ্লাস্টি বা বাইপাস অপারেশন করছেন বা অনেকে বিদেশে যাচ্ছেন, আবার অনেকের হৃদরোগ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তারা উপরিউক্ত পদ্ধতি প্রয়োগ করে আবার পরিপূর্ণ সুস্থ জীবন পেতে পারেন।

**************************
ডা. গোবিন্দ চন্দ্র দাস
লেখকঃ বিভাগীয় প্রধান, ইমিউনোলজি বিভাগ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, ঢাকা। দৈনিক নয়া দিগন্ত, ১৩ এপ্রিল ২০০৮