বিশ্ব কণ্ঠ দিবস ২০০৮
প্রতি বছর ১৬ এপ্রিল বিশ্ব কণ্ঠ দিবস পালিত হয়। আমাদের দেশে এবারই প্রথম বিশ্ব কণ্ঠ দিবস পালিত হলো। সারা বিশ্বে ২০০২ সাল হতে বিশ্ব কণ্ঠ দিবস পালিত হচ্ছে। ১৯৯৯ সালের এপ্রিল মাসে ব্রাজিলে প্রথম মানুষের কণ্ঠ ও কণ্ঠনালীর সমস্যা এবং নাক কান গলা রোগ বিষয়ে জনগণকে সচেতন করার জন্য জাতীয় কণ্ঠ সপ্তাহ পালিত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডেফনেস অ্যান্ড কমিউনিউকেশনের’ সূত্রমতে ৭.৫ মিলিয়ন সব বয়সের জনগণ কোনো না কোনো কণ্ঠস্বরজনিত সমস্যায় ভুগছে। অনেকেই কণ্ঠস্বর সম্পর্কে সচেতন নয় এবং ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়। পারস্পরিক যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হলো কণ্ঠ বা কথা বলা। বিশ্ব কণ্ঠ দিবসের উদ্দেশ্য হচ্ছে কণ্ঠ ও কণ্ঠনালীর সমস্যা এবং সেই সাথে কিভাবে কণ্ঠকে সুস্থ রাখা যায় ও তার প্রতিকার সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে জানানো। এ বছরের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে ‘আপনার কণ্ঠ বা কণ্ঠনালীর ওপর অতিরিক্ত চাপ দেবেন না’।

আমরা কিভাবে কথা বলি?
গলায় অবস্থিত ল্যারিংস বা শব্দযন্ত্রে (voice box) দু’টি ভোকাল কর্ড থাকে। এই কর্ড দু’টির কম্পনের মাধ্যমে শব্দ তৈরি হয়। নিঃশ্বাসের সময় ফুসফুস থেকে প্রবাহিত বাতাস ভোকাল কর্ডে কম্পনের সৃষ্টি করে। কথা বলা বা গান গাওয়ার সময় এই কম্পনের পরিমাণ প্রতি সেকেন্ডে ১০০ থেকে ১০০০ বার। একজন পূর্ণ বয়স্ক মানুষের দিনে এক মিলিয়ন বার ভোকাল কর্ড দু’টির সংস্পর্শ হয়। অতএব চিন্তা করুন আমাদের ভোকাল কর্ডের ওপর আমরা কতটুকু নির্ভরশীল­ কাজে, গৃহে ও সব সময় সবখানে। তাই আমাদের কণ্ঠকে সুস্থ রাখা খুবই জরুরি।

কিভাবে কণ্ঠকে সুস্থ ও সুন্দর রাখা যায়
প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে পানি পান করবেন, কমপক্ষে দুই থেকে তিন লিটার পানি পান করতে হবে। পানি ভোকাল কর্ডকে আর্দ্র রাখে এবং আর্দ্র ভোকাল কর্ড শুষ্ক ভোকাল কর্ড থেকে বেশি ব্যবহার করা যায়। খেলা শুরুর আগে যেমন প্রস্তুতি দরকার তেমন দীর্ঘ বক্তৃতার আগে ভোকাল কর্ডের একইভাবে হালকা ব্যায়াম করা উচিত। প্রস্তুতি ছাড়া কোনো কাজে নামা উচিত নয়। প্র্যাক্টিস করলে ভোকাল কর্ডের কণ্ঠের মান ও উপস্থাপনা সুন্দর হয়। কথা বলা ও গান গাওয়ার মাঝখানে দীর্ঘ শ্বাস-প্রশ্বাস নিলে কথা বলা, গান গাওয়াকে সুন্দর করে এবং ভোকাল কর্ডের অবসাদ হয় না। বক্তব্য বা উপস্থাপনা বা বড় সমাবেশে বক্তৃতা দেয়ার সময় মাইক্রোফোন ব্যবহার করা উত্তম। দিনের একটা নির্দিষ্ট সময়ে কণ্ঠনালীকে বিশ্রাম দেয়া উচিত। যা কণ্ঠনালীর অবসাদ দূর করে এবং শক্তি ফিরিয়ে দেয়। নিজের কণ্ঠকে শুনুন এবং যদি কোনো রকমের উপসর্গ থাকে বা পরিবর্তন লক্ষ করেন তাহলে যথাযথ যত্ন নিন। যদি দুই সপ্তাহের বেশি স্বর পরিবর্তন লক্ষণীয় হয়, তাহলে নাক, কান ও গলা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ দিন। এমন কিছু করবেন না যা কণ্ঠনালীর ক্ষতি হয়।

ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। ধূমপান কণ্ঠনালীর ক্যান্সারের অন্যতম কারণ। এটা ছাড়াও ধূমপান কণ্ঠনালীর প্রদাহ করে। জোরে জোরে বা পরিবর্তিত স্বরে কথা বলা উচিত নয়। জোরে কথা বললে বা কণ্ঠনালীর অপব্যবহার করলে কণ্ঠনালীতে সূক্ষ্ম আঘাত হতে পারে। দূর থেকে কাউকে ডাকতে হলে হাততালি বা শিস বা হাত নেড়ে অথবা লাইটের মাধ্যমে দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়। বড় খেলা উপভোগ করার সময় পছন্দের দলকে সাপোর্ট করার জন্য জোরে চিৎকার না করে পতাকা উড়ান বা ব্যানার লিখেন।

এমন কিছু খাবেন না যাতে এসিডিটি হতে পারে। তাই মাথা উঁচু করে ঘুমাবেন, টাইট কাপড় পরে ঘুমানো যাবে না, হালকা ঢিলেঢালা পোশাক পরিধান করে ঘুমাবেন। খাবারের সাথে সাথে ঘুমানো বা ক্যাফেইনযুক্ত খাবার গ্রহণ করা বাদ দিতে হবে। দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে ভোকাল কর্ডে চাপ পরে এমন কাজ করা থেকে বিরত থাকবেন।

মোবাইল ফোনে কথা বলতে সাবধানতা অবলম্বন করুন। গাড়িতে ভ্রমণ বা ট্রেনে যাত্রার সময় কণ্ঠনালীকে বিশ্রাম দিন। দৈনন্দিন খাবারের সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করবেন না। অতিরিক্ত মোবাইল ফোনে কথা বললে ভোকাল কর্ডে চাপ করে। চিন্তা করুন ফোন কলটি আপনার প্রয়োজনীয় কিনা। শব্দপূর্ণ পরিবেশে মোবাইল ফোনে উচ্চস্বরে কথা বলা থেকে বিরত থাকুন। এতে কণ্ঠনালীর বিশ্রাম হবে, পাশাপাশি ফোন বিলও সাশ্রয় হবে।

কণ্ঠনালীর সমস্যার কারণ
যদি ঘন ঘন কণ্ঠস্বর পরিবর্তন হয় বা দীর্ঘ পনেরো দিন বা দুই সপ্তাহে ভালো হচ্ছে না তবে নাক, কান ও গলা বিশেষজ্ঞকে দেখাতে হবে। বিভিন্ন কারণে কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন হতে পারে। কণ্ঠস্বর বা কণ্ঠনালীর বিভিন্ন সমস্যা নিØে আলোচনা করা হলো­

তীব্র কণ্ঠনালীর প্রদাহ
কণ্ঠস্বর পরিবর্তনের প্রধান কারণ হলো তীব্র কণ্ঠনালীর প্রদাহ। সাধারণত ভাইরাসজনিত কারণে প্রদাহ হয়, কণ্ঠনালী ফুলে যায় যাতে কণ্ঠনালীর কম্পনের সমস্যা সৃষ্টি করে ফলে স্বর পরিবর্তন হয়। প্রচুর পানি খেলে, কণ্ঠনালীকে বিশ্রাম দিলে এটা ভালো হয়ে যায়। তীব্র প্রদাহ অবস্থায় যদি জোরে কথা বলেন তা কণ্ঠনালীর ওপর চাপ সৃষ্টি করে। তবে যেহেতু তীব্র কণ্ঠনালীর প্রদাহ ভাইরাসজনিত এতে এন্টিবায়োটিক লাগে না। যদি ব্যাকটেরিয়াজনিত ইনফেকশন হয় তবে এর সাথে শ্বাসকষ্ট হয় যার বিশেষ চিকিৎসা দরকার।

দীর্ঘমেয়াদি ল্যারিনজাইটিস
পাকস্থলির এসিড রিফ্‌লাক্সের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কণ্ঠনালীর প্রদাহ হতে পারে, ধূমপান, শ্বাসকষ্ট, হাঁপানির জন্য ইনহেলার ব্যবহার বা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম তাদের দীর্ঘমেয়াদি ল্যারিনজাইটিস হতে পারে।

কণ্ঠস্বরের অতি ব্যবহার
কথা বলার সময় কণ্ঠনালীর সাথে আশপাশে অবস্থিত মাংসপেশিরও সাহায্য লাগে। কণ্ঠনালীকে সঠিক ও নিয়মের বাইরে ব্যবহার করা, কঠিন উচ্চস্বরে, অতিরিক্ত, দীর্ঘমেয়াদি বা পরিবর্তিত স্বরে কথা বললে কণ্ঠনালীর প্রদাহ দেখা যায়। যা ভারী জিনিসকে ঠিকভাবে না উঠানোর জন্য পিঠে ব্যথার সমতুল্য। গলা ও শব্দযন্ত্রের মাংসপেশির সঙ্কোচন এবং কথা বলার সময় ঠিকভাবে শ্বাস না নিলে শ্বাসযন্ত্রের অবসাদ হয়, কথা বলতে কষ্ট হয়; ফলে কণ্ঠস্বর পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে এবং ভোকাল কর্ডে পলিপ বা নডিউল এমনকি রক্তক্ষরণও হতে পারে।

ভোকাল কর্ড অপব্যবহারের কারণ
কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে জোরে কথা বলা। অতিরিক্ত ও দীর্ঘ সময় মোবাইল ফোনে কথা বলা। ঘাড় ও কানের মাঝে ফোন চেপে ধরে কথা বলায় ঘাড় ও শব্দযন্ত্রের মাংসপেশিতে টান লাগে। উচ্চস্বরে বা চিৎকার করে কথা বলা। জনসমাবেশে বা বড় লেকচার গ্যালারিতে মাইক ছাড়াই জোরে কথা বলা।

বিনাইন বা কম ক্ষতিকারক কণ্ঠনালীর রোগ
দীর্ঘমেয়াদি কণ্ঠনালীর অপব্যবহারে যে ক্ষতি হয় পরিবর্তিতে তা কণ্ঠনালীর কম্পনের মাত্রার ওপর প্রভাব ফেলে এবং কণ্ঠনালীর পলিপ, নডিউল বা সিস্ট হতে পারে। নডিউল সাধারণত কণ্ঠশিল্পীদের মধ্যে বেশি হয়। রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, আইনজীবী, অধিক সন্তানের জননী, মসজিদের ইমাম, হকারদের মধ্যে এসব রোগ হতে পারে। চিকিৎসা হলো অপারেশন এবং ভয়েস থেরাপি।

কণ্ঠনালীতে রক্তক্ষরণ
প্রচণ্ড জোরে চিৎকার করলে বা গলায় অধিক শক্তি দিয়ে কথা বললে বা গলায় আঘাত পেলে হঠাৎ করে কথা বন্ধ হতে পারে। ভোকাল কর্ডের সূক্ষ্ম রক্তনালী ছিঁড়ে রক্তজমাট বাঁধতে পারে। এ অবস্থায় কথা বলা বন্ধ রাখতে হবে যত দিন না জমাট রক্ত মিলিয়ে না যায়।

ভোকাল কর্ড প্যারালাইসিস বা দুর্বলতা
ভোকাল কর্ড বা ল্যারিংসের নার্ভের দুর্বলতা বা কোনো সমস্যার জন্য কণ্ঠনালীর পরিবর্তন হতে পারে। ভাইরাসজনিত প্রদাহের জন্য নার্ভের দুর্বলতা হয়। সাধারণত একদিকের নার্ভই প্যারালাইসিস হয়, দুই দিকের নার্ভ একই সাথে আক্রান্ত হওয়া খুবই বিরল। এক দিকের নার্ভ প্যারালাইসিসের কারণ হচ্ছে ভাইরাল ইনফেক্‌শন, টিউমার, ক্যান্সার ও থাইরয়েড অপারেশন। কণ্ঠনালীর প্যারালাইসিসের জন্য ফেঁসফেঁসে আওয়াজ হয় এবং এটি নিঃশ্বাসের সাথে জড়িত। কয়েক মাসের মধ্যে এক দিকের প্যারালাইসিস ভালো হয়ে যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভোকাল কর্ড প্যারালাইসিস ভালো হয় না, তখন চিকিৎসা প্রয়োজন হয়।

কণ্ঠনালীর ক্যান্সার
গলার ক্যান্সার বা কণ্ঠনালীর ক্যান্সারকে মোটেও অবহেলা করা উচিত নয়। গলার স্বর পরিবর্তন পনের দিনের মধ্যে ভালো না হলে, চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া ও প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যান্সার নির্ণয় করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কণ্ঠনালীর ক্যান্সার প্রাথমিক পর্যায়ে নির্ণয় করে চিকিৎসা করলে সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যায় এবং এ চিকিৎসা আমাদের দেশেই বিদ্যমান।

লেখকঃ অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ইএনটি, মেডিক্যাল কলেজ ফর উইমেন অ্যান্ড হসপিটাল, উত্তরা, ঢাকা; সভাপতি, বিশ্ব কণ্ঠ দিবস উদযাপন কমিটি।

**************************
অধ্যাপক ডা. এম আলমগীর চৌধুরী
দৈনিক নয়া দিগন্ত, ২০ এপ্রিল ২০০৮