একটি জ্নগত, বংশগত রক্তরোগ, যা মা-বাবার কাছ থেকে সন্তানের মধ্যে জিনের মাধ্যমে সঞ্চালিত হয়। জিন হচ্ছে এক ধরনের প্রোটিন। মানুষের গায়ের রং, চুল, সর্বোপরি পূর্ণতা প্রাপ্তিতে যা কিছু দরকার, সবই এই জিনের মধ্যে পূর্বনির্ধারিত হয়ে থাকে। ৩০ শতাংশ হিমোফিলিয়া রোগীর ক্ষেত্রে মা-বাবার কাছ থেকে সঞ্চালিত হওয়ার কোনো কারণ থাকে না। সেসব ক্ষেত্রে রোগীর নিজের মধ্যে জিনের পরিবর্তনের ফলেই এ রোগের সৃষ্টি হয়ে থাকে।

হিমোফিলিয়ায় আক্রান্ত রোগীর শরীরে কোথাও কেটে গেলে বা ব্যথা পেলে রক্ত জমাট বাঁধতে বেশ সময় লাগে। রক্ত জমাট বাঁধার জন্য দুটি অত্যাবশ্যকীয় প্রোটিন, যেমন ফ্যাক্টর-৮ ও ফ্যাক্টর-৯ দরকার হয়। যাদের ফ্যাক্টর-৮ বা হিমোফিলিক ফ্যাক্টর থাকে না বা পরিমাণে কম থাকে, সেসব রোগীকে বলা হয় হিমোফিলিয়া ‘এ’, যাদের ফ্যাক্টর-৯ কম থাকে তাদের বলা হয় হিমোফিলিয়া ‘বি’ রোগী। উত্তরাধিকার হিসেবে কীভাবে বংশানুক্রমিক হয়।

?? মা সুস্থ, বাবা হিমোফিলিয়ায় আক্রান্ত, তাহলে এই দম্পতির মেয়েশিশুরা হবে রোগের বাহক, ছেলেরা সুস্থ থাকবে।
?? মা হিমোফিলিয়ার বাহক, সে ক্ষেত্রে ৫০ ভাগ ঝুঁকি ছেলের হিমোফিলিয়া হওয়ার এবং ৫০ ভাগ আশঙ্কা মেয়ের রোগের বাহক হওয়ার।
?? কোনো কোনো ক্ষেত্রে মেয়েরাও এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে, যদি মা বাহক এবং বাবা হিমোফিলিয়ায় আক্রান্ত হন।

সাধারণত তিন ধরনের বহিঃপ্রকাশ হয় রক্ত জমাট বাঁধার মাত্রার ওপর। যেমনঃ মাইল্ড হিমোফিলিয়া, যেখানে ফ্যাক্টর-৮ ও ৯ থাকবে ৫০ থেকে ১৫০ শতাংশে। মডারেট হিমোফিলিয়া এখানে রক্ত জমাট বাঁধার মাত্রা ১ থেকে ৫ শতাংশ।
এসব রোগীর গুরুতর আঘাত বা অনেক সময় ধরে অপারেশন করলে রক্তক্ষরণ হয়।

সিভিয়ার হিমোফিলিয়া, এখানে ফ্যাক্টর-৮ বা ৯-এর মাত্রা থাকে ১ শতাংশেরও কম। সপ্তাহে এক থেকে দুবার আপনাআপনি রক্তক্ষরণ হয় মাংসপেশি বা অস্থিসন্ধিতে, বিশেষ করে হাঁটুতে।

হিমোফিলিয়ার উপসর্গ
জ্নের সময় অনেক শিশুরই দেখা যায় মাথাটা একদিকে ফুলে গেছে অথবা নাভি কাটার পর সহজে রক্ত বন্ধ হতে চায় না।

শিশুকে বাহুতে ধরে কোলে নেওয়ার সময় দেখা যায়, যেখানে ধরে কোলে নেওয়া হয়েছে সেখানটা লাল হয়ে গেছে। শিশু যখন একটু বড় হয়ে হামাগুড়ি দিতে শুরু করে, তখন হাঁটু ও কনুইয়ে বড় বড় নীল দাগ হয়ে যায়।

দাঁত ওঠার সময় অতিরিক্ত রক্ত পড়া
বড়দের ক্ষেত্রেঃ যেকোনো আঘাতে মাংসপেশি অথবা বড় বড় অস্থিসন্ধি-যেমন হাঁটু, হিল জয়েন্ট-এসব জায়গা ফুলে যাওয়া, প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত যাওয়া, এমনকি মস্তিষ্কের ভেতর রক্তক্ষরণ হয়ে রোগীর মৃত্যুও হতে পারে।
ক্রমাগত অস্থিমজ্জায় রক্তক্ষরণ হতে হতে রোগী পঙ্গু হয়ে যায়।

চিকিৎসার ধরন, কখন প্রয়োজন
যখনই যেখান থেকে রক্তক্ষরণ হবে, সঙ্গে সঙ্গে সেটা বন্ধ করতে হবে। যেমনঃ
?? মাংসপেশিতে রক্তক্ষরণ, বিশেষ করে বাহু ও পায়ে।
?? নাক, কান, গলায় ব্যথা পেলে।
?? অতিরিক্ত মাথাব্যথা হলে।
?? যেকোনো দুর্ঘটনায় রক্তপাত হলে।

কখন চিকিৎসার প্রয়োজন নেই
শরীরের বিভিন্ন অংশে ছোট ছোট নীল দাগ। নীল দাগ যদি মাথার কোথাও হয়, অবশ্যই চিকিৎসক বা হিমোফিলিয়া নার্সের মাধ্যমে পরীক্ষা করাতে হবে।
?? অল্প কাটাছেঁড়া হলে। তবে ক্ষত যদি অপেক্ষাকৃত গভীর হয় তাহলে প্রেসার ব্যান্ডেজ দিলেই রক্তপাত বন্ধ হয়ে যাবে।

নাক দিয়ে রক্ত পড়লে পাঁচ মিনিট নাক চেপে ধরে রাখতে হবে। এতেও যদি রক্তপাত নিয়ন্ত্রণে না আসে তাহলে চিকিৎসা নিতে হবে।

হিমোফিলিয়া রোগীদের প্রতি নির্দেশ
?? যখনই রক্তপাত হবে সঙ্গে সঙ্গে তা বন্ধ করতে হবে। তাহলে ব্যথাও কম হবে, অস্থিসন্ধিও সুস্থ থাকবে।
?? মাংসপেশি কার্যক্ষম রাখতে হিমোফিলিয়া চিকিৎসক অথবা ফিজিওথেরাপিস্টের নির্দেশে ব্যায়াম করতে হবে।
?? ব্যথানিরোধ বড়ি-যেমন অ্যাসপিরিন খাওয়া যাবে না।
?? নিয়মিত রক্তরোগ-বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।
?? মাংসপেশিতে ইনজেকশন নেওয়া যাবে না। তবে টিকা নেওয়া যাবে।
?? দন্তরোগ-বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।
?? মেডিকেল আইডেনটিফিকেশন কার্ড সব সময় সঙ্গে রাখতে হবে।
?? তাড়াতাড়ি রক্তপাত বন্ধ করতে প্রাথমিক চিকিৎসা জানতে হবে।

আরও কিছু
?? হিমোফিলিয়া জ্নগত রোগ, এটি ছোঁয়াচে নয়।
?? নির্মূল করতে হলে জেনেটিক্যাল কাউন্সেলিং করা প্রয়োজন।
?? রোগের বাহককে চিহ্নিত করতে হবে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে।
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রতি পাঁচ হাজার ছেলেশিশুর মধ্যে একজন হিমোফিলিয়া নিয়ে জ্ন নেয়। বর্তমানে সারা বিশ্বে চার লাখ লোক এ রোগে আক্রান্ত। এর মধ্যে মাত্র ২৫ শতাংশ উপযুক্ত চিকিৎসা পাচ্ছে। 
 
**************************
ডা• মাসুদা বেগম
সহযোগীঅধ্যাপক, হেমাটোলজি বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখমুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
প্রথম আলো, ২৩ এপ্রিল ২০০৮