রোগিণীর নামটা ঊহ্যই থাক। বয়স ৩৯। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান। তাঁর পরিবারে রয়েছে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের ইতিহাস। তাই নিজের শরীরের ওজন, স্বাস্থ্যের পরিণতি নিয়ে তিনি কিছুটা উদ্বিগ্ন। পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চি লম্বা শরীরের ওজন ১৭০ পাউন্ড। প্রমাণ-সংজ্ঞা অনুযায়ী তিনি ভারী ওজনের আওতায় পড়েন। খুব মেদস্থূল বলা না হলেও তিনি যে বেশ ভারী, তা তিনি বোঝেন। ঢাকার একটি নামকরা স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে ইদানীং ওবেসিটি ক্লিনিক খুলেছে। সেখানকার একজন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিলেন তিনি। কিন্তু চিকিৎসক তাঁর ওজন না মেপে টেপ দিয়ে কোমরের মাপ নিলেন। ৩৫ ইঞ্চি কোমরের মাপ। বিপদ অঞ্চলে তো বটেই। চিকিৎসক বললেন, ‘একজন ভারী ওজনের নারীর কোমরের মাপ যদি ৩৫ ইঞ্চি বা বেশি হয় এবং একজন ভারী ওজনের পুরুষের কোমরের মাপ যদি ৪০ ইঞ্চি হয়, তাহলে ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকি খুব বেড়ে যায়।’

সেই ভদ্রমহিলার বডি মাস ইনডেক্স বা বিএমআই যেমন ছিল ২৭•৪, মেদস্থূলতার ধারেকাছে নেই, স্থূল বলতে বিএমআই ৩০ থেকে শুরু হতে হবে। তাঁর বিএমআই অত হতে গেলে ওজন হতে হবে ১৮৫ পাউন্ড। (যেমন একজন পুরুষ, যিনি ছয় ফুট লম্বা এবং ওজন ২২১ পাউন্ড, তাঁকে বলা যাবে মেদস্থূল)।

এখন চিকিৎসক যদি আলোচ্য ব্যক্তির স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময় শুধু বিএমআই ব্যবহার করতেন তাহলে সিদ্ধান্ত হতো যে তাঁর যে ওজন তাতে তিনি গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে নেই। তাঁর হৃদরোগের মাত্র একটি ঝুঁকি ছিল-কারণ রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইড বা চর্বির মান ছিল বেশি।

বিএমআই গাইড লাইন অনুযায়ী ভারী ওজনের লোকের গুরুতর ঝুঁকি বলতে গেলে আরও দুটো ঝুঁকি সঙ্গে থাকতে হয়-যেমন উচ্চমান ট্রাইগ্লিসারাইড ও উচ্চমান কোলেস্টেরল বা উচ্চ রক্তচাপ।

বিএমআইর বেশ সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। পেশিবহুল লোকদের থাকতে পারে উঁচু বিএমআই, যে জন্য তাদের সঠিক অবস্থার চেয়ে বেশি মেদবহুল মনে হতে পারে। বৃদ্ধ লোকদের অনেক সময় কম বিএমআই থাকতে পারে পেশি ক্ষয়ের জন্য।
এ ক্ষেত্রে বিএমআই মান এবং কোমরের মাপ একত্র করলে ভদ্রমহিলাকে উচ্চ ঝুঁকির পর্যায়ে ফেলা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল হার্ট, লাং অ্যান্ড ব্লাড ইনস্টিটিউটের গাইড লাইন অনুযায়ী এই টেস্টটি উপযোগী যাঁদের শরীর ভারী ও রয়েছেন প্রচ্ছন্ন ঝুঁকির মধ্যে। তাঁদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কী? এ রকম প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কিছুটা কঠিনই।

কোমরের মাপ ৩৫ ইঞ্চির কম হলে চিকিৎসকদের এত চিন্তা করতে হয় না।
আবার ভিন্নমতও রয়েছে। ইউনাইটেড স্টেটস প্রিভেনটিভ সার্ভিসেস টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান ডা• নেড ক্যালোজ বলেন, ‘একটা লোক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ার মতো মেদবহুল কি না, তা নির্ধারণের জন্য বিএমআই পরিমাপই ভালো। বেশির ভাগ পূর্ণবয়স্ক লোকের ক্ষেত্রে অন্যান্য পরিমাপের তুলনায় বিএমআই বেশি নির্ভরযোগ্য ও সঠিক। তবে কাউকে মেদস্থূল নির্ণয় করাই যথেষ্ট নয়। লক্ষ্য হতে হবে সুস্বাস্থ্য বজায় রাখা। ‘বিএমআই বা অন্য যেকোনো পরিমাপ, যা দিয়েই মেদস্থূলতা নির্ণয় করা হোক না কেন, এর জন্য রোগীরা চিকিৎসকের কাছ থেকে যেসব পরামর্শ পান, তা স্বাস্থ্যের উন্নতি তেমন বিধান করে না।’ বললেন ডা• ক্যালোজ।

তিনি আরও বলেন, ‘বিভিন্ন গবেষণা থেকে প্রমাণিত হয়, খাদ্যবিধি ও ব্যায়ামের বিষয়ে প্রবল অথচ ব্যয়বহুল কাউন্সেলিং রোগীদের ওজন কমাতে এবং যেসব অবস্থা তাদের হৃদরোগের ঝুঁকিতে নিয়ে যায়, সেসব অবস্থার উন্নতি সাধন করতে সাহায্য করে।’

ইউনিভার্সিটি অব পিটস্‌বার্গ মেডিকেল সেন্টারের হেলথ সিসটেম ওয়েট ম্যানেজমেন্ট সেন্টারের পরিচালক মেডেলিন ফার্নস্ট্রমের কাছে একটি মেডিকেল পরীক্ষার লক্ষ্য হচ্ছে-কে কত স্থূল তা নির্ণয় করা এবং ওজনের সমস্যা ছাড়াও অন্যান্য সমস্যা আছে কি-না তা খুঁজে বের করা।

যেমন ডায়াবেটিস বা রক্তে উচ্চমান কোলেস্টেরল বা উচ্চ রক্তচাপ-যা চিকিৎসা করা যায়।

আলোচ্য ব্যক্তির ক্ষেত্রে কোমরের মাপ নেওয়ায় সে ব্যাপারটি করা গেল। তিনিও খুশি। তিনি বলেন, ‘এরপর আমি নতুন উদ্যমে জীবন চালাতে পারছি। আমি শর্করা খুব কম খাচ্ছি, স্বাস্থ্যসম্মত স্ম্যাক্‌স খেতে শিখেছি, খাওয়ার জন্য যেসব দ্রব্য বাছাই করছি, এ ব্যাপারে অনেক সতর্ক ও যত্নবান হচ্ছি। ইয়োগাও করছি। হাঁটছি।’

২০ পাউন্ড ওজন শরীর থেকে হারিয়েছেন তিনি। কোমর থেকে হারিয়েছেন দু-তিন ইঞ্চি। রক্তের ট্রাইগ্লিসারাইড মান কমে এসেছে। কোমর এখন বেশ চিকন, খুশি হয়ে বললেন, ‘আমি বিপদ অঞ্চলের বাইরে এখন।’ 

**************************
অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরীর কলম থেকে
পরিচালক, ল্যাবরেটরি সার্ভিসেস
বারডেম হাসপাতাল, ঢাকা
প্রথম আলো, ২৩ এপ্রিল ২০০৮