মাউথ ওয়াশ হলো ওষুধসমৃদ্ধ একটি অ্যান্টিসেপটিক দ্রবণ, যা কুলি করার জন্য ব্যবহৃত হয়। মুখ ও মুখগহ্বরের সংক্রমণ রোধে মাউথ ওয়াশ ব্যবহার করা যেতে পারে। বিশেষ করে যখন দাঁত ব্রাশ করা সম্ভব হয় না বা সমস্যা হয়। যেমন, অপারেশনের পর যখন কোনো রোগী পূর্ণ বিশ্রামে থাকে, সে সময় মাউথ ওয়াশ দাঁত ব্রাশের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। অ্যান্টিসেপটিক বা অ্যান্টিপ্ল্যাক মাউথ ওয়াশ মুখের সেসব জীবাণু ধ্বংস করে, যার কারণে মুখের ভেতরে প্ল্যাক, মাঢ়ির প্রদাহ বা মুখের দুর্গন্ধ হতে পারে। অ্যান্টিক্যাভিটি মাউথ ওয়াশ সাধারণত ফ্লোরাইড-সমৃদ্ধ হয়ে থাকে, যা দাঁতকে ক্ষয় থেকে রক্ষা করে। মাউথ ওয়াশ ব্যবহারের অর্থ এই নয় যে এটি ব্যবহার করলে দাঁত ব্রাশ করা লাগবে না বা ডেন্টাল ফ্লস (দাঁত পরিষ্কার করার একধরনের সুতা) ব্যবহার করতে হবে না।
আমেরিকান ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) মাউথ ওয়াশকে প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করেছে।

কসমেটিক মাউথ ওয়াশ।

থেরাপিউটিক মাউথ ওয়াশ এবং

এ দুটির সমন্বিত মাউথ ওয়াশ।

কসমেটিক মাউথ ওয়াশ, যা দাঁত ব্রাশের আগে বা পরে ব্যবহার করা যায়। কসমেটিক মাউথ ওয়াশ খাদ্যকণা পরিষ্কার করে এবং সাময়িকভাবে মুখের দুর্গন্ধ দূর করতে সাহায্য করে। কিছুক্ষণের জন্য মুখের সজীবতা ফিরিয়ে আনে। সাধারণত কসমেটিক মাউথ ওয়াশ অন্তত ১০ মিনিটের জন্য কাজ করে। কিন্তু দুই ঘণ্টা পরে আর কাজ করে না।

থেরাপিউটিক মাউথ ওয়াশকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়
অ্যান্টিপ্ল্যাক বা মাঢ়ির প্রদাহবিরোধী মাউথ ওয়াশ ও
অ্যান্টিক্যাভিটি বা দন্ত ক্ষয়বিরোধী ফ্লোরাইড মাউথ ওয়াশ।

মাউথ ওয়াশের উপাদান
মাউথ ওয়াশে যেসব উপাদান ব্যবহৃত হয়ে থাকে সেগুলো হলো থাইমল, ইউক্যালিপটল, হেক্সিটিডিন, মিথাইল স্যালিসাইলেট, হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড, ক্লোরোহেক্সিডিন গ্লুকোনেট, ফ্লোরাইড, পোভিডন আয়োডিন ইত্যাদি।

মাউথ ওয়াশ কীভাবে ব্যবহার করবেন
মাউথ ওয়াশ ব্যবহারের আগে দাঁত ব্রাশ ও দাঁতে ফ্লসিং করে নেওয়া ভালো। মাউথ ওয়াশ দুই চামচ পরিমাণ পানির সঙ্গে মিশিয়ে অথবা চিকিৎসকের পরামর্শে নির্ধারিত পরিমাণে ব্যবহার করতে হয়। মাউথ ওয়াশ ৩০ সেকেন্ডের জন্য মুখের অভ্যন্তরে রেখে কুলি করতে হয়। তবে ফ্লোরাইডযুক্ত মাউথ ওয়াশের ক্ষেত্রে এক মিনিট কুলকুচা করতে হয়। মাউথ ওয়াশ ব্যবহারের ৩০ মিনিটের মধ্যে খাওয়া যাবে না। অন্যথায় মাউথ ওয়াশের কার্যকারিতা অনেকাংশে কমে বা নষ্ট হয়ে যায়।

মাউথ ওয়াশ সঠিকভাবে ব্যবহার না করলে যেসব সমস্যা হতে পারে সেগুলো হলো
?? মুখের স্বাদে পরিবর্তন আসতে পারে। মুখের স্বাদের এ পরিবর্তন তিন থেকে চার ঘণ্টার জন্য হতে পারে, আবার ক্ষেত্রবিশেষে এক সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

?? দাঁতে দাগ পড়তে পারে।
?? মুখের ভেতরে শুষ্কভাব বিরাজ করতে পারে।
?? মুখের ভেতরে জ্বালাপোড়া বা প্রদাহজনিত অনুভূতির সৃষ্টি হতে পারে।
?? অতিরিক্ত ব্যবহারে মুখে ঘা বা আলসার দেখা দিতে পারে।

কী ধরনের মাউথ ওয়াশ ব্যবহার করবেন
বাংলাদেশে তৈরি যেসব মাউথ ওয়াশ রয়েছে, সেগুলোর মূল উপাদান হলো অ্যাসেনশিয়াল অয়েল, পোভিডন আয়োডিন ও ক্লোরোহেক্সিডিন। অ্যাসেনশিয়াল অয়েল মাউথ ওয়াশ মুখের প্রদাহজনিত সমস্যায় এক সপ্তাহের জন্য ব্যবহার করা যায়। তবে মাউথ ওয়াশ সমপরিমাণ পানির সঙ্গে মিশিয়ে নিতে হবে। এই মাউথ ওয়াশে থাকা মেনথলের স্বল্পমাত্রায় প্রদাহ বিনাশকারী কার্যকারিতা রয়েছে। তা ছাড়া অন্য উপাদান থাইমল অ্যান্টিসেপটিক হিসেবে কাজ করে। অ্যাসেনশিয়াল অয়েল মাউথ ওয়াশ মাঢ়ির রোগ ও প্ল্যাকের বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখে। অ্যাসেনশিয়াল অয়েল মাউথ ওয়াশে রয়েছে ইউক্যালিপটল যৌগ, যা ইউক্যালিপটাস গাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়। ইউক্যালিপটাস অ্যাসেনশিয়াল অয়েল ইউক্যালিপটাস গাছের তাজা পাতা থেকে তৈরি করা হয়। ইউক্যালিপটাস অয়েল বিভিন্ন ওষুধে ব্যবহৃত হয় এবং ইউক্যালিপটল যৌগ থাকায় এটি ব্যবহৃত হয় মাউথ ওয়াশে। অ্যাসেনশিয়াল অয়েলের সবচেয়ে বড় গুণ হলো, এটি মুখের যেকোনো জীবাণুর বিরুদ্ধে কার্যকর। এ কারণেই অ্যাসেনশিয়াল অয়েল শুধু মাউথ ওয়াশ নয়, শরীরের বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায়ও অনেক সময় ব্যবহৃত হয়। যারা পান সেবনে অভ্যস্ত, সাধারণত তাদের দাঁতে ও মুখে বেশি ময়লা জমে থাকে। সে ক্ষেত্রে অ্যাসেনশিয়াল অয়েল মাউথ ওয়াশের মিথাইল স্যালিসাইলেট কার্যকর ভূমিকা রাখে।

আমাদের দেশে মাউথ ওয়াশের ক্ষেত্রে ক্লোরোহেক্সিডিন গ্লুকোনেট ০•২ শতাংশ মাঢ়ির রোগে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে ক্লোরোহেক্সিডিন মাউথ ওয়াশ বেশি দিন ব্যবহার করলে দাঁতে দাগ পড়তে পারে। ক্লোরোহেক্সিডিন মাউথ ওয়াশ ব্যবহারের পর কোনো কোনো ক্ষেত্রে কয়েক ঘণ্টার জন্য জিহ্বায় স্বাদের পরিবর্তন আসতে পারে। রক্তশূন্যতা হলে খাবারে রুচি থাকে না, আর স্বাদও যথাযথভাবে অনুভূত হয় না। এসব ক্ষেত্রে ক্লোরোহেক্সিডিন মাউথ ওয়াশ ব্যবহার করা ঠিক নয়। না হলে ক্লোরোহেক্সিডিনে স্বাদ বিনাশকারী কার্যকারিতার কারণে সার্বিক মুখের অবস্থার আরও অবনতি হবে। তবে স্বাদের কোনো পরিবর্তন না হলে ক্লোরোহেক্সিডিন মাউথ ওয়াশ ব্যবহার করা যাবে।

পোভিডন আয়োডিন ০•১ শতাংশ মাউথ ওয়াশও আমাদের দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু গর্ভবতী ও শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন-এমন মায়েদের ক্ষেত্রে পোভিডন আয়োডিন নিয়মিত ব্যবহার করা ঠিক নয়। কারণ শোষিত আয়োডিন প্লাসেন্টা অতিক্রম করতে পারে এবং তা মায়ের দুধে নিঃসৃত হয়। থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যকারিতা পরীক্ষার সময় পোভিডন আয়োডিন মাউথ ওয়াশ ব্যবহার করা যায় না। কারণ আয়োডিন শোষণের কারণে থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যকারিতা পরীক্ষায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতে পারে। আয়োডিনের প্রতি সংবেদনশীলতা থাকলে পোভিডন আয়োডিন মাউথ ওয়াশের বিকল্প মাউথ ওয়াশ ব্যবহার করা উচিত।

কসমেটিক মাউথ ওয়াশ
কসমেটিক মাউথ ওয়াশের বিকল্প মাউথ ওয়াশ বাড়িতেও বানানো যায়।

স্বাভাবিক মাত্রার মাউথ ওয়াশ
আধা চা চামচ লবণ চার আউন্স পানির সঙ্গে মিশিয়ে স্বাভাবিক মাত্রার মাউথ ওয়াশ তৈরি করা যায়।

শক্তিশালী মাউথ ওয়াশ
আধা চা চামচ লবণ চার আউন্স পানির সঙ্গে মিশিয়ে মাউথ ওয়াশ তৈরি করা যায়।
আধা চা চামচ বেকিং সোডা আট আউন্স পানির সঙ্গে মিশিয়ে মাউথ ওয়াশ তৈরি করা যায়।

অনেকেই ভাবেন মাউথ ওয়াশ তো কুলি করার জন্যই, এ জন্য এত কিছু ভাবতে হবে কেন? তাই জানা প্রয়োজন যে বিশেষ ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা মাউথ ওয়াশ ব্যবহার করতে বলেন ঠিকই, কিন্তু মাউথ ওয়াশ অতিরিক্ত ব্যবহারে মুখে আলসার দেখা দিতে পারে। আর মুখের আলসারজনিত অবস্থায় অতিরিক্ত বা ভুল মাউথ ওয়াশ ব্যবহারের কারণে ক্যান্সারের পূর্বাবস্থা সৃষ্টি হলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। ১২ বছর বয়সের নিচে কোনো মাউথ ওয়াশই ব্যবহার করা ঠিক নয়। একান্ত প্রয়োজন হলে বাসায় তৈরি কসমেটিক মাউথ ওয়াশ ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে সেটি ব্যবহার করতে হবে পরিমাণমতো এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। মাউথ ওয়াশের নানা দোষ-গুণ রয়েছে ঠিকই; তবে এও সত্য, বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে এটি প্রয়োগের প্রয়োজন হয়। সে ক্ষেত্রে মুখের সার্বিক অবস্থা, ত্বকের ধরন, রোগের গুরুত্ব বুঝেই মাউথ ওয়াশ বাছাই করা জরুরি। তাই মাউথ ওয়াশের ব্যবহার সম্পর্কে সবাইকেই যথেষ্ট সচেতন হতে হবে এবং মনে রাখতে হবে, কোনো অবস্থাতেই এর অপব্যবহার করা যাবে না। 
 
**************************
ডা• মো• ফারুক হোসেন
মুখ ও দন্তরোগ বিশেষজ্ঞ
প্রথম আলো, ২৩ এপ্রিল ২০০৮