চিকিৎসা বিজ্ঞানের ব্যাপক উন্নতির পরও এ কথা সত্য যে গ্যারান্টি দিয়ে কোনো রোগেরই চিকিৎসা করা যায় না। অথচ আমাদের দেশে অনেকেই গ্যারান্টি দিয়ে ক্যান্সার সারানোর কথা বলে থাকে। শৌচাগার, স্টেশনের আনাচে-কানাচে, লাইট পোস্ট ও গাছের গায়ে গ্যারান্টি দিয়ে ক্যান্সার সারানোর প্রতিশ্রুতি সংবলিত মিনি সাইনবোর্ড অনেকেরই চোখে পড়ার কথা। এ ছাড়া রাস্তাঘাটে এসবের ওপর প্রচুর লিফলেটও বিলি করা হয়। সেই সব লিফলেটে ক্যান্সার সারানোর স্বঘোষিত বৈদ্যরাজের আকর্ণ বিস্তৃত হাসিমাখা ছবিও শোভা পেতে থাকে। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে এসব অপচিকিৎসার ব্যবসা চলছে সর্বত্র। অনেক নামীদামি পত্রিকায় এসব গ্যারান্টি চিকিৎসার উদ্ভট বিজ্ঞাপনও ছাপা হচ্ছে। অথচ এসব গ্যারান্টি চিকিৎসার দাবিদাররা ক্যান্সারের ‘ক’ও জানে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক কতৃêক শনাক্তকৃত প্রেসক্রিপশন এবং বায়োপসি রিপোর্ট থেকে এসব গ্যারান্টি চিকিৎসার দাবিদার প্রতারকরা ক্যান্সার নির্ণয় করে থাকে। কারণ সত্যিকার অর্থে ক্যান্সার নির্ণয়ের কোনো রকম যোগ্যতাই তাদের নেই। এসব প্রতারক যদি ক্যান্সার নির্ণয় করতে পারে তাহলে অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন যে কেউই ক্যান্সার নির্ণয় করতে পারবে। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের মাধ্যমে শনাক্তকৃত ক্যান্সারের চিকিৎসায় এসব প্রতারক হোমিও-কবিরাজি-ইউনানির বকচ্ছপ ককটেল চিকিৎসা রোগীর ওপর চালায়, যার ফলস্বরূপ রোগী ক্রমশ মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। অথচ আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে ক্যান্সারের অনেক ভালো চিকিৎসা পদ্ধতি এসেছে। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ক্যান্সার সূচনাতে নির্ণয় করতে পারলে তা নিরাময় করা যায়। স্তন ক্যান্সার, স্তনে টিউমার ও অন্যান্য ক্যান্সার সারানোর নামে এসব বকচ্ছপ প্রতারক সাধারণ মানুষকে মর্মান্তিক পরিণতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ক্যান্সার সম্পর্কে সামান্যতম জ্ঞান না থাকার কারণে এসব বৈদ্যরাজ অনেক সময় ভিন্ন ধরনের ক্যান্সারকে ‘ক্যান্সার নয়’ বলে ঘোষণা দিয়ে থাকে। সম্প্রতি এক কিশোরের লিম্ফগ্ল্যান্ডের ক্যান্সার হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানে যার নাম ‘নন হজকিন লিম্ফোমা’। ঠিক হলো কিশোরকে কেমোথেরাপি দেয়া হবে। অর্থাৎ ইনজেকশনের মাধ্যমে এন্টিক্যান্সার ওষুধ প্রয়োগ করে চিকিৎসা করা হবে। এ সময় সেই কিশোরের এক শুভাকাঙ্ক্ষী খবর নিয়ে এলেন, এক বৈদ্যরাজ ভেষজ চিকিৎসায় অনেকের ক্যান্সার সারিয়েছেন। এ অবস্থায় সেই কিশোরকে বৈদ্যরাজের কাছে নেয়া হলে সে বায়োপসি রিপোর্ট দেখে বলল, ওর তো ক্যান্সার হয়নি। ক্যান্সার হলে নাকি রিপোর্টে কারসিনোমা বা ম্যালিগন্যান্সি লেখা থাকে।

অথচ কিশোরটির হয়েছে লিম্ফোমা। এটি লিম্ফগ্ল্যান্ডের ক্যান্সার। এ কথা তো বৈদ্যরাজের জানার কথা নয়। তবে বৈদ্যরাজ বলল বায়োপসি করেই ডাক্তাররা ওর ক্ষতি করেছে। সেই কিশোরের শিক্ষিত অভিভাবকরা বৈদ্যরাজের অজ্ঞতার ফাঁদে পা দিলেন এবং ছয় মাসের মাথায় সেই কিশোরের মৃত্যু ঘটল। কিন্তু এ জন্য সেই বৈদ্য কারো কাছেই ধিকৃত হয়নি। কোর্টকাছারিও হয়নি এবং বৈদ্যরাজ বারবার বলছিল বায়োপসি করানোর জন্যই কিশোরটিকে বাঁচানো গেল না।

এ ঘটনাটি বলার একই উদ্দেশ্য, চার দিকে এখন নকল ডাক্তারের ছড়াছড়ি। কাজেই চিকিৎসা করানোর ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে। অন্যের মুখে ঝাল না খেয়ে নিজের বুদ্ধিতে কাজ করুন। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান এখন এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে আর্থিক সঙ্গতি থাকলে প্রায় সব রোগ শনাক্ত করা যায়। যে পদ্ধতিতেই চিকিৎসা করান না কেন, রোগটা কী তা অবশ্যই জানতে হবে। আর যে চিকিৎসক আপনার চিকিৎসা করছেন তিনি সত্যিকার অর্থে চিকিৎসা বিজ্ঞানের জ্ঞানে শিক্ষিত হয়ে থাকলে কখনো গ্যারান্টি দিয়ে চিকিৎসা করবেন না। তিনি সম্ভাব্য নিরাময় ও ঝুঁকির কথা বলবেন, মিথ্যা গ্যারান্টি ও আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রতি বিষোদগার করবেন না। মূর্খের মতো বলবেন না বায়োপসিতে ক্যান্সার বাড়ে। প্রকৃতপক্ষে বায়োপসি করলে নিশ্চিতভাবে ক্যান্সার রোগ ধরা পড়ে। আর গ্যারান্টি দিয়ে কখনো ক্যান্সারের চিকিৎসা করা যায় না। তবে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের উপদেশ গ্রহণ করে অনেকেই বিনা গ্যারান্টিতে ক্যান্সার থেকে সেরে উঠেছেন।

**************************
ডা. সজল আশফাক
লেখকঃ নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ, চেম্বারঃ ইনসাফ ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টার, ১২৯ নিউ ইস্কাটন, ঢাকা।
দৈনিক নয়া দিগন্ত, ২৭ এপ্রিল ২০০৮