হার্টের উপরিভাগে লেপ্টে থাকে করোনারি আর্টারি বা ধমনী, যার মাধ্যমে হার্ট পুষ্টি এবং অক্সিজেন পায়। যখন করোনারি ধমনীতে চর্বি জমে এবং রক্ত জমাট বেঁধে (শতকরা ১০০ ভাগ) রক্তনালীর রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায় তখন ওই রক্তনালীর মাধ্যমে হার্টের যে অংশটুকু পুষ্টি ও অক্সিজেন পেত সেই মাংসপেশিটুকুতে নানারকম পরিবর্তন সাধিত হয়। যাকে আমরা হার্টঅ্যাটাক বলি, মেডিকেল পরিভাষায় বলা হয় মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন। যদিও হার্টঅ্যাটাক হঠাৎ করেই হয় কিন্তু এটি দীর্ঘদিন ধরে করোনারি ধমনীতে অ্যাথেরোসক্লেরোটিক পরিবর্তনের মাধ্যমে একটি চলমান রোগ প্রক্রিয়ারই বহিঃপ্রকাশ। তাই মারাত্মক এই রোগটিকে কখনো কখনো নিঃশব্দ আততায়ী বলা হয়। তবে সময়মত রোগ নির্ণয় এবং সঠিক চিকিৎসায় রোগী ফিরে পেতে পারে নতুন জীবন।

হার্টঅ্যাটাক প্রতিরোধে করণীয়ঃ হৃদরোগ প্রতিরোধযোগ্য এবং হৃদরোগের প্রক্রিয়াকে সম্পুর্ণ ঘুরিয়ে দেয়া সম্ভব শুধু ছন্দবদ্ধ জীবনযাপনের মাধ্যমে। যে কোনো ধরনের ষ্ট্রেস এড়িয়ে চলুন। কর্মজীবনের সব ব্যস্ততার মধ্যেও মানসিক প্রশান্তির কিছু উপায় বের করে নিতে হবে। পরিমিত কায়িক পরিশ্রম বা ব্যায়াম করুন এবং কম চর্বিযুক্ত পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করুন।

ধুমপান ত্যাগ করা অত্যন্ত জুরুরি। শুধু ধুমপান ত্যাগের মাধ্যমে হৃদরোগের ঝুঁকি প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে আনা সম্ভব। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন এবং নিয়মিত মনিটরিং করুন। রক্তের গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে রাখুন, বিশেষ করে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ। নিয়মিত সজীবভাবে হাঁটার অভ্যাস করুন। কমপক্ষে ৪৫ মিনিট প্রত্যহ হাঁটাহাঁটি করুন। দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় ক্যালরির পরিমাণ কমিয়ে দিন। এজন্য বেশি করে শাকসবজি, কাঁচা ফলমুল গ্রহণ করুন। চর্বিযুক্ত খাবার পরিহার করুন।

হার্টঅ্যাটাকের চিকিৎসায় ওষুধঃ হার্টঅ্যাটাকের চিকিৎসায় জরুরিভাবে কিছু ওষুধ দেয়া হয়। রোগী প্রাথমিকভাবে বিপদমুক্ত হওয়ার পর আরো কিছু ওষুধ দেয়া হয়। হার্টঅ্যাটাকের পর যে ওষুধ দেয়া হয় তা দু’ভাগে কাজ করে-১. হার্টঅ্যাটাকে যে ক্ষতি হয় তা পুষিয়ে নিতে ওষুধ সাহায্য করে। ২. হার্টঅ্যাটাক-পরবর্তী জটিলতা প্রতিরোধে ওষুধ সাহায্য করে।

হাটঅ্যাটাক-পরবর্তী জটিলতা এবং রোগের উপসর্গ কমাতে নিম্নলিখিত ওষুধ ব্যবহার করা হয়ঃ

নাইট্রেটঃ বুকে ব্যথা বা অ্যানজাইনা কমাতে সাহায্য করে। এ ওষুধটি করোনারি ধমনীকে প্রসারিত করে এবং রক্তের প্রবাহ বাড়িয়ে দেয়।

বিটা ব্লকারঃ এ ওষুধটি হার্টের গতি স্পন্দনকে পরিমিত রাখে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে।

এসপিরিন এবং ক্লোপিডোগ্লেরলঃ এ দুটি ওষুধ এন্টিপ্লাটিলেট হিসেবে কাজ করে এবং রক্তকে পাতলা রাখে। রক্তকে জমাট বাঁধতে বাধা দেয় বলে এ ওষুধ হার্টঅ্যাটাকের ঝুঁকি কমিয়ে দেয়।

ষ্টাটিনঃ রক্তের কোলেষ্টেরল কমাতে সাহায্য করে। এছাড়া আরো কিছু কাজ করে যা হার্টঅ্যাটাকের ঝুঁকি কমায়। ভবিষ্যতে হার্টঅ্যাটাক প্রতিরোধে লিপিড প্রোফাইল নিম্নরুপ থাকা বাঞ্ছনীয়-

কোলেষ্টেরল <২০০ মিগ্রা/ডিএল
এলডিএল কোলেষ্টেরল < ৭০ মিগ্রা/ডিএল
এইচডিএল > ৪০ মিগ্রা/ডিএল
ট্রাইগ্লিসেরাইড < ১৫০ মিগ্রা/ডিএল

কি কি পরীক্ষা করা উচিতঃ হার্টঅ্যাটাকের পর রোগীর উপসর্গ অনুযায়ী নিয়মিত ইসিজি ফলোআপ, ইকোকার্ডিওগ্রাফি এবং ইটিটি করানো উচিত। প্রয়োজনবোধে স্পেক্ট এমপিআই বা থ্যালিয়াম স্ক্যানিং করানো যেতে পারে। উপরোক্ত পরীক্ষার আলোকে কখনো কখনো করোনারি এনজিওগ্রামও করা হয়ে থাকে।

করোনারি এনজিওগ্রাম কিঃ করোনারি ধমনীর রোগ বা ব্লকেজ হয়েছে কিনা তা নির্ণয়ের জন্য করোনারি এনজিওগ্রামকে গোল্ড ষ্ট্যান্ডার্ড ধরা হয়। এটি কোনো সার্জিক্যাল অপারেশন নয়, লোকাল এনেস্হেসিয়ার মাধ্যমে রোগীর পায়ের কুঁচকি বা হাতের ধমনীর মাধ্যমে ক্যাথেটার (সরু প্লাষ্টিক টিউব) প্রবেশ করানো হয়। তারপর অল্প পরিমাণ কন্ট্রাষ্ট মিডিয়া বা ডাই প্রবেশ করিয়ে বুকের এক্স-রে ছবি নেয়া হয়। এর মাধ্যমেই করোনারি ধমনীতে শতকরা কত ভাগ ব্লকেজ হয়েছে তা জানা যায়।

হার্টঅ্যাটাকের পর কখন রোগী স্বাভাবিক কাজ করতে পারেনঃ হার্টঅ্যাটাকের কতদিন পর রোগী স্বাভাবিক কাজকর্ম বা কাজে যোগদান করতে পারেন তা নির্ভর করে কাজের মানের ওপর অর্থাৎ কতটা ষ্ট্রেসফুল কাজ। এছাড়া হার্টঅ্যাটাক যেটা হয়েছিল তা কতটা ভয়াবহ ছিল তার ওপর। দেখা গেছে, হার্টঅ্যাটাকের পর কারো কারো জীবনের প্রতি ভালোবাসা আরো বেড়ে যায়। কারো কারো আরেকটি হার্টঅ্যাটাকের ভয় পেয়ে বসে। তবে একথা সত্য, হার্টঅ্যাটাকের রোগীদের শতকরা দশ ভাগ এক বছরের মধ্যে আরেকটি অ্যাটাকের সম্মুখীন হন। তবে রোগী যদি ভালোভাবে চিকিৎসকের ফলোআপে থাকেন, এই ঝুঁকি বছরে তিন থেকে চার ভাগ কমানো সম্ভব। পরবর্তী হার্টঅ্যাটাক প্রতিরোধে সঠিক রিহ্যাবিলিটেশন পরিকল্পনা প্রয়োজন, যার মাধ্যমে শরীর এবং মনের যত্ম নেয়া সম্ভব। সাধারণ হার্টঅ্যাটাকের পর যদি কোনো জটিলতা না হয় তবে রোগীকে ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেয়া হয়। আস্তে আস্তে ছোটখাটো কাজের মাধ্যমে হার্টকে প্রস্তুত করা হয়। অধিকতর জটিল হার্টঅ্যাটাক নয়, এমন রোগীর ক্ষেত্রে ৪ থেকে ৬ সপ্তাহের মধ্যে রোগী স্বাভাবিক কাজকর্মে যোগদান করতে পারেন। তবে ষ্ট্রেস হয় এমন কাজ করা উচিত নয়। যেমন গাড়ি চালানো এ সময়টাতে না করাই উত্তম।

করোনারি এজিওপ্লাষ্টিঃ এটি একটি মেডিকেল পদ্ধতি, যার মাধ্যমে সরু রক্তনালীকে প্রশস্ত করা হয়। যে পথে এনজিওগ্রাম করা হয়েছিল, সেই একই পথে ক্যাথেটারের সঙ্গে বেলুন প্রবেশ করানো হয়। বেলুন ফুলিয়ে করোনারি ধমনীর সরু অংশটুকু প্রশস্ত করা হয়। এতে করে ধমনীর ভেতর রক্তের প্রবাহ স্বাভাবিক হয়ে যায়। ধমনীর এই প্রশস্ততাকে ধরে রাখতে ষ্টেন্ট বা রিং বসানো হয়। বিভিন্ন ধরনের ষ্টেন্ট ব্যবহৃত হয়।

অ্যান্টিপ্লাটেলেট ড্রাগ বন্ধ করবেন নাঃ আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিপ্লাটেলেট ড্রাগ বন্ধ করবেন না। বেয়ার মেটাল ষ্টেন্টের ক্ষেত্রে কমপক্ষে ছয় মাস এবং ড্রাগ কোটেড ষ্টেন্টের ক্ষেত্রে কমপক্ষে এক বছর অ্যাসপিরিন ও ক্লোপিডোগ্রেল ওষুধ চালিয়ে যাবেন। শুধু তাই নয়, জটিল এনজিওপ্লাষ্টির ক্ষেত্রে কখনো কখনো ক্লোপিডোগ্রেল ওষুধটি ২/৩ বছরও চালাতে হয। নতুবা ষ্টেন্ট থ্রম্বোসিস হয়ে ধমনী পুনরায় বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সমস্যা দেখা দেয় রোগীর শরীরে অন্যান্য অপারেশনের প্রয়োজন হলে। অনেক সার্জন অপারেশনের পাঁচদিন আগে থেকেই এ ওষুধ দুটো বন্ধ করে দেন, কারণ ব্লাড থিনার ওষুধের উপস্হিতিতে অপারেশনের সময় বেশি রক্তপাত হয়। কিন্তু এতে করে মারাত্মক ষ্টেন্ট থ্রম্বোসিস হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এক্ষেত্রে যদি অপারেশন জরুরি না হয়ে থাকে তবে ন্যুনতম ছয় মাস বা এক বছর পর অপারেশন করা উচিত। ইমার্জেসি হলে কমপক্ষে একটি ওষুধ অর্থাৎ অ্যাসপিরিন বা ক্লোপিডোগ্রেল চালিয়ে যেতে হবে।

বি.দ্র. এই লেখাটি ভারতের ম্যাক্স হার্ট এন্ড ভাসকুলার ইনষ্টিটিউটে ইন্টারভেনশন কার্ডিওলজিতে ফেলোশিপ করার সময় অভিজ্ঞতার আলোকে লেখা হয়েছে।

**************************
ডা. এসএম মোস্তফা জামান   ২০০৮-০৫-১৩ 
লেখকঃ সহকারী অধ্যাপক, হৃদরোগ বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, চেম্বারঃ ল্যাবএইড লিমিটেড, বাড়ি-১, রোড-৪, ধানমন্ডি, ঢাকা।
দৈনিক আমার দেশ, ১৩ মে ২০০৮