আমরা খাবার খাই শক্তির (ক্যালরি) জন্য। আলু ও ভাতের ক্যালরি মূলত কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা থেকে। এই শর্করা মূলত কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট। খাদ্যনালিতে ধীরে হজম হয়, রক্তে প্রবেশ করে আস্তে আস্তে, রক্তের গ্লুকোজ তাই দ্রুত বাড়ায় না।

আঁশ হজম হয় না, তাই কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে, ইনসুলিনের সংবেদনশীলতা বাড়ায়, রক্তে গ্লুকোজ ও চর্বি কমায়, ক্ষুধা কমায়, ওজন কমায় ও বৃহদন্ত্রে ক্যান্সার কমায়। শর্করার পরিমাণ ভাতে আলুর চেয়ে বেশি। কীভাবে খাবার সরবরাহ করা হয় তার ওপরও খাদ্যের ক্যালরির মাত্রা নির্ভর করে। রকমারি পরিবেশনার ওপর ভিত্তি করে আলুর ক্যালরির তারতম্য হয়।

আলু ও ভাতের তুলনামূলক ক্যালরির হিসাব
মূলত শর্করাজাতীয় খাবারের জন্যই খাদ্য হিসেবে আলু ও ভাত আমাদের কাছে সমাদৃত। চোঁচাসহ ১০০ গ্রাম আলুতে থাকে ৮০ ক্যালরি এবং শর্করা ১৯ গ্রাম, পানির পরিমাণ ৭৫ গ্রাম, আমিষ দুই গ্রাম, চর্বি ১০ মিলিগ্রাম, ফাইবার ২·২ গ্রাম। আলুতে ভিটামিন-সি বেশি ২০ মিলিগ্রাম বা ১০০ গ্রাম, থায়ামিন, রিবফ্লেভিন, নায়াসিন, বি-৬, যথাক্রমে ০·০৮, ০৩, ১·১ ও ·২৫ মিলিগ্রাম।

ক্যালসিয়াম, আয়রন, ম্যাগনেশিয়াম, ফসফরাস যথাক্রমে ১২, ১·৮, ২৩, ৫৭ মিলিগ্রাম। পটাশিয়াম বেশি ৪২১ মিলিগ্রাম, সোডিয়াম ছয় মিলিগ্রাম।

আলুর চোঁচায় খাদ্যের প্রয়োজনীয় আঁশের প্রায় অর্ধেক থাকে। ৫০ শতাংশের বেশি খাদ্য-উপাদান মূল আলুতে থাকে। অধিকাংশ আলুর খাবারই গরম পরিবেশিত হয়, যা অধিকতর স্বাস্থ্যসম্মত।

ভাত পৃথিবীর ৩-৪ শতাংশ লোকের আদর্শ খাবার হলেও মানের ক্রমানুসারে আলুর স্থান চতুর্থ-আটা, ভুট্টার পরে। বাদামি চাল খুবই স্বাস্থ্যসম্মত। কারণ এতে ভিটামিন, ফাইবার ও অন্যান্য অনেক জিনিস সুরক্ষিত থাকে। চালে আলুর চেয়ে পানি, ভিটামিন-সি ও পটাশিয়াম কম থাকে।

১০০ গ্রাম ভাতে আছে ১১৬ ক্যালরি, ১০০ গ্রাম আলুতে (ভাপে সেদ্ধ) আছে ৭৩ ক্যালরি, ১০০ গ্রাম আলুতে (পানিতে সেদ্ধ) আছে ৭৩ ক্যালরি, ১০টা আলুর চিপসে আছে ১১০ ক্যালরি, ১০টা ফ্রেঞ্চ ফ্রাইতে আছে ১১০ ক্যালরি, ১০০ গ্রাম আপেলে ৫৩ ক্যালরি, এক কাপ লো ফ্যাট মিল্কে ১৫০ ক্যালরি, এক কাপ নুডলসে ২০০ ক্যালরি, এক ্লাইস রুটিতে ৭০ ক্যালরি, এক কাপ টক দইয়ে ১১০ ক্যালরি। সার্বিক বিবেচনায় (ক্যালরি, শর্করা, ভিটামিন) খাদ্য হিসেবে আলু ও ভাত কাছাকাছি। খরচের হিসাব করলে আলু অনেক সস্তা ও কম মূল্যে এক উপকারী (সাশ্রয়ী) উদ্ভিজ্জ আমিষ, ভিটামিন ও খনিজ উপাদানের উৎস।

আমাদের প্রতিদিনের খাবারে আলু তাই একটা সাশ্রয়ী সংযোজন হতে পারে। আলু জ্নানো সহজ, ফলন অনেক বেশি। সবকিছু বিবেচনা করেই হয়তো জাতিসংঘ ২০০৮ সালকে বিশ্ব আলুবর্ষ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে।

মাঝারি (১৫০ গ্রাম) একটি আলু থেকে দৈনিক খাবারের আমিষের ৬ শতাংশ, ভিটামিন-সির ৫০ শতাংশ, থায়ামিনের ৮ শতাংশ, রিবফ্লাভিনের ২ শতাংশ, নিয়াসিনের ১০ শতাংশ, লৌহের ৮ শতাংশ, ভিটামিন বি-৬-এর ১৫ শতাংশ, ফলিক এসিডের ৮ শতাংশ, ফসফরাসের ৮ শতাংশ, ম্যাগনেশিয়ামের ৮ শতাংশ, জিংকের ২ শতাংশ, কপারের ৮ শতাংশ, প্যান্টথেনিক এসিডের ৪ শতাংশ ও আয়োডিনের ১৫ শতাংশ আসে।

একটি মাঝারি আকারের আলু (১৫০ গ্রাম) প্রতিদিনের ক্যালরির ৪ থেকে ৫ শতাংশ পেলেও আলু থেকে আমরা অনেক বেশি পরিমাণ অন্যান্য উপাদেয় ভিটামিন, উদ্ভিজ্জ আমিষ ও খনিজ উপাদান পাই। আলুভক্ত কেউ যদি দুটি বা এর বেশি খায়, তাহলে তো কথাই নেই। বেলারুশের মানুষ সবচেয়ে বেশি আলু খায়। যেকোনো মার্কিনি বছরে ১২০ পাউন্ড আলু খায়।

ডায়াবেটিস ও আলু
ডায়াবেটিক রোগীদের খাবারকে আমরা তিন ভাগে ভাগ করি। ভাত, আলু ইত্যাদি কমপ্লেক্স শর্করা বেশি পরিমাণে খাওয়া যায়। চর্বিজাতীয় খাবার, চিনি ও গ্লুকোজ না খাওয়া ভালো। দুধ, মাংস, মাংসজাতীয় খাবার যত কম খাওয়া যায় তত ভালো।

কোন খাবার খেলে রক্তে কতটুকু গ্লুকোজ বাড়ে, ওই খাবারের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স দিয়ে তা বোঝা যায়। যে খাবারের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স যত বেশি, সেই খাবার তত বেশি গ্লুকোজ বাড়ায়। ভাত ও আলু দুটোই হাই ইনডেক্স খাবার। লাল চালের ভাত, মধু, আলু, পাকা কলা, পাকা আম, পাকা পেঁপের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স ৮০ থেকে ৯০। সাদা চালের ভাত, কর্ন ফ্লেকস, আইসক্রিমের ইনডেক্স ১০০। আলু, গাজর, এপিকটের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স ৮০ থেকে ৯০। গম, শিমের বিচির গ্লাইসেমিক ইনডেক্স ৭০ থেকে ৭৯, কমলার গ্লাইসেমিক ইনডেক্স ৪০ থেকে ৪৯। আপেল, চর্বিমুক্ত দুধের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স ৩০ থেকে ৩৯।

রক্তে গ্লুকোজ বাড়ানোর ক্ষমতা অনুসারে আগে খাদ্যদ্রব্যকে কমপ্লেক্স ও সিম্পল এ দুই ভাগে ভাগ করা হতো। এখন গ্লাইসেমিক ইনডেক্স ও গ্লাইসেমিক লোড দিয়ে খাদ্যের গ্লুকোজ বাড়ানোর ক্যাপাসিটি নির্ণয় করা হয়।

কোনো একটা খাবারের যে পরিমাণে ৫০ গ্রাম শর্করা থাকে এবং সেই পরিমাণ খাবার খেলে ওই খাবার রক্তে যতটুকু গ্লুকোজ বাড়ায়, তার সঙ্গে ৫০ গ্রাম পিওর গ্লুকোজ খেলে রক্তে যে পরিমাণ গ্লুকোজ বাড়ে, তার তুলনাই হলো গ্লাইসেমিক ইনডেক্স।

বলার অপেক্ষা রাখে না, কোন খাবার থেকে কতটুকু ক্যালরি পাওয়া যাবে তা নির্ভর করে এ খাবারের শর্করা ও অন্যান্য জিনিসের (যেমন চর্বি, আমিষ ইত্যাদি) পরিমাণে ওপর। আলু কম ক্যালরি, কম চর্বি এবং উদ্ভিজ্জ আমিষ, খনিজ উপাদান ও ভিটামিনসমৃদ্ধ খাবার। তাই সার্বিক বিবেচনায় খাবার হিসেবে ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য আলু খারাপ নয়। তবে আলু কীভাবে পরিবেশন হচ্ছে সেটা অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে।

উচ্চ রক্তচাপ ও আলু
আলুতে কুকো-এমিন ও কিছু রাসায়নিক পদার্থ থাকে, যা উচ্চ রক্তচাপ কমায়। ফোটানো আলুতে ভাজা আলুর চেয়ে এ রাসায়নিক বেশি থাকে। আলুতে প্রায় শূন্য পরিমাণ চর্বি, পানি বেশি, আলু খেলে মোটা হয়ে যাওয়া-এ ধারণা ঠিক নয়। আলু সাশ্রয়ী, স্বাস্থ্য-উপযোগী। তাই আলু খাওয়ার অভ্যাস করুন। বেশি করে আলু খান। মধ্যাহ্নভোজে অর্ধেক ভাত ও অর্ধেক আলু খাওয়া যেতে পারে।

হাইব্রিড সবরির যুগে আমরা সাগরকলাতেই স্বাদ মেটাই, আসল সবরিকলা আর খুঁজি না। মূল কথা হলো, প্রয়োজন ও বাস্তবতা-সময়ের তাগিদে আমাদের অভ্যাস বদলাতে হয়েছে, হবে।
 
************************
ডা· খাজা নাজিম উদ্দিন
অধ্যাপক, মেডিসিন বিভাগ, বারডেম, ঢাকা
দৈনিক প্রথম আলো, ১৪ মে ২০০৮