নানা ধরনের রোগ থেকে বাঁচার অন্যতম উপায় হচ্ছে নিয়মিত ফলমূল খাওয়া।

কেন ফল খাওয়া প্রয়োজন
ফলে উপাদানের মধ্যে মন্দ কোলেস্টেরল থাকে না, যা থেকে উচ্চ রক্তচাপ ও হার্টের সমস্যা দেখা দিতে পারে। মাংস বা প্রাণিজ আমিষে মন্দ কোলেস্টেরলের মাত্রা অনেকটাই বেশি থাকে। যাঁদের বংশে হার্টের রোগ আছে বা যাঁরা মেদস্থূলতায় ভুগছেন, তাঁদের খাবারের তালিকায় ফল থাকাটা জরুরি। লেবুজাতীয় ফল ছাড়াও হলুদ কমলা ও লাল রঙের ফল বেশি পরিমাণে খাওয়া উচিত।

ফলের আরেক নাম ‘ব্রেন ফুয়েল’। মস্তিষ্ককে সজীব ও কর্মক্ষম রাখতে ফলের জুড়ি নেই। ফলের উপাদানের মধ্যে অন্যতম ন্যাচারাল সুগার আমাদের মনে রাখার ও চিন্তা করার ক্ষমতা বেশ কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।

প্রাকৃতিক আঁশ ফলের এক বিশেষ উপাদান। দিনে কমপক্ষে ২৫ থেকে ৩০ গ্রাম ফল খেলেই শরীর তার প্রয়োজনীয় আঁশ পেতে পারে। আঁশের সাহায্যে মেদস্থূলতা, হার্টের অসুখ, রক্তের চিনি ও কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ন্ত্রণে আনা যায়।

শরীরে জমে থাকা বিষ বা টক্সিন ঝরিয়ে ফেলতে সহায়তা করে ফল। লেবুজাতীয় ফলের রস সকালে নাশতার সময় খেলে এই ডিটক্সিফিকেশনের পদ্ধতি অনেকটাই হয়ে যায়। ডিটক্স ছাড়াও ফল শরীরের এনার্জি সাপ্লাইও অনেকটা বাড়িয়ে দেয়।

শরীরের কোষকলার সঠিক বৃদ্ধি ও গঠনেও ফল ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া ভিটামিন-সিযুক্ত ফল অ্যান্টি-অক্সিডেন্টের কাজ করে শরীরের পক্ষে ক্ষতিকারক ফ্রি র‌্যাডিকেলগুলোকে বাড়তে দেয় না।

ফলের অন্যতম উপাদান ফোলেট রক্তের লোহিত কণিকা গঠন করে থাকে। গর্ভস্থ ভ্রূণকে কোনো রকম শারীরিক ত্রুটিমুক্ত রাখতে সাহায্য করে ফোলেট।

ফল খাওয়ার সাতসতেরো
* দিনে অন্তত পাঁচবার একটা না একটা ফল খান।
* দিনে অন্তত এক গ্লাস ফলের রস অবশ্যই খাবেন। টাটকা ফল রস করে পানি বা চিনি মিশিয়ে খাওয়াই ভালো। ফলের রস একবারে গিলে না ফেলে বেশ কিছুক্ষণ ধরে তারিয়ে তারিয়ে খান। ভালো ফল পাবেন।
* সকালে উঠে খালিপেটে এক গ্লাস ফলের রস খান, এতে শরীরে জমে থাকা টক্সিন চলে যাবে। চেষ্টা করুন রুটি বা ভাতের সঙ্গে ফল না খেতে। যেকোনো খাবার খাওয়ার আগে বা পরে ফল খান।
* খাওয়ার টেবিল, কিচেন কাউন্টার বা ফ্রিজের ওপর একটা সুন্দর ফ্রুট বোল কিনে তাতে আঙ্গুর, জামরুল, লিচু, চেরিজাতীয় ফল সাজিয়ে রাখুন, যাতে পরিবারের সদস্যরা সারা দিন ধরে ফলগুলো খেতে পারে।
* অতিথি এলে চা, কফি বা কোমল পানীয় না দিয়ে তাজা ফলের রস দিয়ে আপ্যায়ন করুন।
* বোতলজাত ফলের রসে ক্ষতিকারক প্রিজারভেটিভস থাকে। এর চেয়ে টাটকা ফলের রস অনেক বেশি পুষ্টিগুণসম্পন্ন।
* শিশুদের টিফিনে রোজ কিছু না কিছু ছোট ফল-যেমন আঙ্গুর, জামরুল, খেজুর ইত্যাদি দিতে চেষ্টা করুন।
* সব সময় দেশিমৌসুমি ফল খাওয়ার চেষ্টা করুন।
* লাল, নীল, হলুদ, সবুজ বিভিন্ন রঙের ফল খাওয়ার চেষ্টা করুন।
* ভিন্ন ভিন্ন রঙের ফলে নির্দিষ্ট খাদ্যগুণ আছে, যা প্রোস্টেট ক্যান্সার, হার্টের অসুখ, টাইপ টু ডায়াবেটিস প্রভৃতি অসুখের মোকাবিলা করতে শরীরকে সাহায্য করে।
* ভরপেট খাওয়াদাওয়ার পর কয়েক টুকরো আনারস খান।
* ফল কাটলে এয়ারটাইট কনটেইনারে ভরে ফ্রিজ রেখে খেতে পারেন। তবে চার-পাঁচ ঘণ্টার বেশি না রাখাই ভালো। কাটা ফল খাওয়ার সময় বাচ্চাদের কাঁটাচামচ ব্যবহার করতে শেখান, যাতে হাত থেকে কোনো জীবাণু মিশে না যায়।
* আধপাকা ফল ফ্রিজে না রেখে বাইরে রাখলে তাড়াতাড়ি পাকবে। তবে পাকা ফল সব সময় ফ্রিজে রাখুন। এক সপ্তাহের বেশি ফল ফ্রিজে রাখবেন না।
* আপেল, নাশপাতিজাতীয় ফল খোসাসুদ্ধ খান।
* ফল খাওয়ার আগে অবশ্যই ভালো করে ধুয়ে ও শুকিয়ে নেবেন। ফল কাটার পর আর ধোবেন না।
* ফল ফ্রিজে রাখলে মাছ, মাংস, ডিম বা অন্যান্য খাবারের কাছাকাছি রাখবেন না।

দৈনন্দিন ফল খাওয়ার নিয়ম

সকালের নাশতায়
কলা, আনারস টুকরো করে মিশিয়ে নিন সিরিয়ালে। দইয়ের মধ্যে আম, বেদানা, কমলালেবু কিংবা শসা যোগ করে মজাদার ডিপ বানিয়ে নিতে পারেন। আঙ্গুর বা কমলালেবুর রস এক গ্লাস অবশ্যই খাবেন।

দুপুরে
আনারস, কলা, আপেল, পাকা পেঁপে, তরমুজ, আঙ্গুর ইত্যাদি দিয়ে ফ্রুট সালাদ বানিয়ে নিন। অফিসে দুপুরের খাবারের সময় একটা কলা বা আপেল অবশ্যই খান। একটা বাক্সে ড্রাই ফ্রুটস ও ডুমুর রেখে দিন। কাজের ফাঁকে ফাঁকে টুকটাক মুখ চালান।

বিকেলে
কমলালেবু, আনারস, আঙ্গুর, কলা দিয়ে তৈরি করে নিন ফ্রেশ ফ্রুট শরবত। চা বা কফির থেকে বেশি সুস্বাদু ও পুষ্টিকর। আপেল বেক করে নিয়ে পাই করতে পারেন। বিভিন্ন ফল কুচিয়ে কাস্টার্ড বা পুডিংও করতে পারেন। বাদাম, শসা, টমেটো, পেঁয়াজ দিয়ে মুড়িমাখাও খেতে পারেন।

রাতে
আনারস, কলা, শিকে গেঁথে ফ্রুট-কাবাব বানাতে পারেন। ফ্রিজে টুকরো করে রাখা ফলের ওপর হালকা করে পি নাট বাটার বা মেয়োনিজ ছড়িয়ে দিতে পারেন।
 
************************
ডা· গৌতম দাশগুপ্ত
চিকিৎসা কর্মকর্তা, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন
দৈনিক প্রথম আলো, ১৪ মে ২০০৮