শরীরের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খাবার খেলে খাবারের বেশি অংশটুকু চর্বি আকারে শরীরে জমতে থাকে। সাধারণত এভাবেই অতিরিক্ত ওজন কেন হয় তা বলা যেতে পারে। তবে অতিরিক্ত ওজন হওয়ার পেছনে আরও অনেক জানা ও অজানা কারণ রয়েছে।

অতিরিক্ত ওজন বা ওবেসিটির কারণ
* অতিরিক্ত খাওয়া, বিশেষ করে উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবার প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খাওয়া।

* অতিরিক্ত আরাম-আয়েশে জীবন যাপন করা, যখন-তখন অনেকক্ষণ ধরে খাওয়া আর বসে বসে টেলিভিশন দেখা, শারীরিক পরিশ্রম কম করা, বেশি সময় ধরে কম্পিউটারে গেম খেলা, হাঁটার বদলে সব সময় যানবাহন ব্যবহার করা।

* কিছু হরমোনজনিত রোগ-যেমন কুশিং সিনড্রোম হাইপোথাইরয়েডিজম বা শরীরে থাইরয়েড হরমোন কমে যাওয়া ইত্যাদি থাকলে।

* বংশগত ও বিপাকীয় কারণেও ওজন বাড়তে পারে।

স্থূলতার পরিমাণ বা বিএমআই (বডি মাস ইনডেক্স) নির্ণয়
একটা সাধারণ পদ্ধতিতে আপনি আপনার স্থূলতার পরিমাপ করতে পারেন। আপনার উচ্চতা নিন মিটারে ও ওজন নিন কেজিতে এবং নিচের ফর্মুলায় বিএমআই বের করুন।

বিএমআই =
ধরুন, আপনার ওজন ৬১ কেজি এবং উচ্চতা ১·৬ মিটার। তাহলে আপনার বিএমআই হবে ২৪-এর কাছাকাছি।

বিএমআই কত-জেনে কী লাভ
বিএমআইঃ ১৮-২৫  স্বাভাবিক ওজন। ২৫·১-৩০ঃ অতিরিক্ত ওজন। ৩১·১-৩৫ঃ মাত্রাতিরিক্ত ওজন। ৩৫·১-এর ওপরঃ মরবিড ওবেসিটি বা মৃত্যুঝুঁকিপূর্ণ অতিরিক্ত ওজন।

স্থূলতা পরিমাপে কোমর ও নিতম্বের মাপও নেওয়া যেতে পারে। একজন পুরুষের কোমরের বেড় ১০২ সেমির বেশি এবং একজন নারীর কোমরের বেড় ৮৮ সেমির বেশি হলে তাদের মাত্রাতিরিক্ত ওজনের মধ্যে ফেলা যাবে।

মাত্রাতিরিক্ত ওজনকে একটা রোগ বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে। কারণ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, অতিরিক্ত ওজনের একজন একই বয়সের স্বাভাবিক ওজনের অধিকারী অন্যজনের চেয়ে গড়ে ১৫ বছর আগে মৃত্যুবরণ করে।

অতিরিক্ত ওজন বিভিন্ন জটিল রোগের কারণ হতে পারে। যেমন ডায়াবেটিস (টাইপ টু) উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, স্লিপ এপনিয়া, রক্তে চর্বি বেশি হওয়াজনিত রোগ, লিভারের অসুখ ইত্যাদি। ওজন কীভাবে কমাবেন, সেটার উত্তর প্রায় সবারই কম-বেশি জানা আছে। তার পরও এটি একটু কঠিন বলেই মনে করা হয়।

আপনি যা করবেন
ডায়েটঃ আপনি যদি শারীরিক কোনো কাজ না করেন, তবে দিনে ১৫০০ কিলোক্যালরির বেশি শক্তিসম্পন্ন খাদ্য থেকে বিরত থাকুন। খাদ্যের শক্তি পরিমাপ করা খুব সহজ। যেমন ১ গ্রাম চাল বা আটায় ৪ কিলোক্যালরি, ১ গ্রাম আমিষ (মাছ, মাংস) ৪ কিলোক্যালরি, ১ গ্রাম চর্বিজাতীয় খাদ্য আপনাকে দেবে ৯ কিলোক্যালরি।

দেখা যাচ্ছে, চর্বিজাতীয় খাবার সবচেয়ে বেশি শক্তির জোগান দেয়। এখানে মনে রাখা দরকার, সব ধরনের খাবারই শরীরের জন্য প্রয়োজন। তাই একটা সুষম খাবারের তালিকা নিজের জন্য তৈরি করে নিন। এই খাদ্যতালিকা সাধারণ পুষ্টিবিশেষজ্ঞরা করে থাকেন।

জীবনযাপনের ধারায় পরিবর্তন আনুন
ব্যক্তিগত অভ্যাস ও লাইফ স্টাইলে পরিবর্তন আনা জরুরি। টিভির রিমোট কন্ট্রোল ব্যবহার কমিয়ে নিজে উঠে গিয়ে চ্যানেল পরিবর্তন করুন। অল্প দূরত্বের জন্য গাড়ি বা রিকশায় চড়বেন না। কম্পিউটার ব্যবহার ও গেম খেলা কমিয়ে দিন। এ ধরনের কাজ আপনার ওজন কমাতে একটু হলেও সাহায্য করবে।

দরকার খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন
সময়মতো ও পরিমাণমতো খাবার আস্তে আস্তে খান। তাড়াহুড়ো করে খাবার খাবেন না। তিন বেলা খাবারের মধ্যে নাশতা খাবেন না। যদি এর মধ্যে বেশি ক্ষুধার্ত হন তাহলে শসা বা অন্য কোনো সবজি খাবেন, যে খাবারে কোনো ক্যালরি নেই। খাওয়ার পর এক ঘণ্টা পরে পানি পান করবেন। কোমল পানীয় একদম খাবেন না। টিভি দেখতে দেখতে চিপস বা অন্য কোনো খাবার খাবেন না।

ব্যায়াম চলবে
ব্যায়াম ও শারীরিক কাজকর্ম ওজন কমাতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। নিয়মিত ব্যায়াম করা একটি ভালো অভ্যাস। সাঁতার কাটা একটি ভালো ব্যায়াম। নিয়মিত সাইক্লিং ও দ্রুত হাঁটা খুবই ভালো। দিনে ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট এবং সপ্তাহে পাঁচ দিন ব্যায়াম শুরু করুন। পরে সম্ভব হলে ব্যায়ামের সময় বাড়ান।

যদি এ সবকিছুই বিফলে যায়, তাহলে আপনাকে চিকিৎসা নিতে হবে। তাতেও কিছু না হলে অপারেশনের মাধ্যমে আপনার চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। আপনার বিএমআই যদি ২৫-এর ওপরে হয়, তাহলে আপনি খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন ও ব্যায়ামের মাধ্যমে ওজন কমাতে পারেন। বিএমআই ৩০-এর ওপরে হলে আপনাকে চিকিৎসা নিতে হবে।
 
************************
ডা· এস এম আবু জাফর
সহযোগী অধ্যাপক, সার্জারি, বারডেম হাসপাতাল
দৈনিক প্রথম আলো, ১৪ মে ২০০৮