বাংলাদেশের ওষুধশিল্প অনেকখানি এগিয়ে গেছে। এখানে গুণগত মানসম্পন্ন ওষুধ যেমন উৎপাদিত হচ্ছে, তেমনি মানহীন ওষুধও তৈরি হচ্ছে। কাঁচামালের ওপর ওষুধের কার্যকারিতা নির্ভর করে।

আমাদের দেশে এখনো খুব বেশি পরিমাণে কাঁচামাল তৈরি হয় না। হাতে গোনা চার-পাঁচটি কোম্পানি পাঁচ-ছয় রকমের ওষুধের কাঁচামাল তৈরি করে থাকে, সেটা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য।

তাই প্রায় সব ওষুধের কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, কাঁচামালের দামের ওপর অধিকাংশ ওষুধের দাম নির্ধারিত হয়।

বিষয়টি আরেকটু সহজ করে বলা যাক। দুভাবে দেশের ওষুধের মূল্য নির্ধারিত হয়। একটি সরকারের ওষুধ নিয়ন্ত্রণ পরিদপ্তরের নির্ধারিত সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য। সব প্রস্তুতকারককে একই দামে এসব ওষুধ বিক্রি করতে হবে।

আরেকটি হচ্ছে, ওষুধ কোম্পানি কতৃêক প্রস্তাবিত মূল্য (এ ক্ষেত্রে কাঁচামালের দাম কমবেশি দেখানোর সুযোগ রয়েছে) এবং সেখানে ওষুধ নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অনুমোদনের ছোঁয়া থাকে। এ দেশে শেষোক্ত ওষুধের সংখ্যা তুলনামূলক অনেক বেশি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ৩৫৫টি ওষুধকে ‘অত্যাবশ্যক ওষুধের’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। অথচ দেশে এর মধ্যে মাত্র ১১৭টি ওষুধকে অত্যাবশ্যক হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এই অত্যাবশ্যক ওষুধের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য সব ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য একইভাবে নির্ধারিত।

প্যারাসিটামল, অ্যাসপিরিন, মেট্রোনিডাজল, আইবুপ্রোফেন, কিছু ভিটামিন, কয়েক ধরনের আইভি স্যালাইন ইত্যাদি এ দেশের ‘অত্যাবশ্যক ওষুধ’। ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো অত্যাবশ্যক ওষুধ তৈরিতে খুব একটা আগ্রহী নয়। এখানে মুনাফা তুলনামূলকভাবে কম।

আর এ ক্ষেত্রে ওষুধ কোম্পানিগুলো কোনো বাধ্যবাধকতার মধ্যে নেই। তাই ওষুধ কোম্পানিগুলো ‘ইনডিকেটিভ প্রাইস’ অর্থাৎ ওষুধ নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অনুমোদনের ছোঁয়া লাগা কোম্পানিগুলোর প্রস্তাবিত মূল্যের ওষুধের ব্যাপারে বেশি আগ্রহী।

যেহেতু একই ওষুধের কাঁচামাল নানা দামে বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়, তাই ওষুধের মূল্যের হেরফের হওয়া স্বাভাবিক। কোম্পানিগুলোর কথায় বিশ্বাস করে ওষুধের মূল্য নির্ধারণের এ সুযোগ কে কতটা কাজে লাগাচ্ছে, সেটাই এ ক্ষেত্রে দেখার বিষয়। যে মূল্যের কাঁচামাল দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে সেই মূল্যের কাঁচামাল ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, সেটাও দেখার বিষয়।
 
************************
সুভাষ সিংহ রায়
ফার্মাসিস্ট
দৈনিক প্রথম আলো, ১৪ মে ২০০৮