ছয় থেকে ১২ বছর-এ হলো মধ্য শৈশব। এ সময় শিশুরা মা-বাবার পরিমণ্ডল থেকে আরও কিছুটা বেরিয়ে এসে শিক্ষক, বন্ধু ও অন্যদের সান্নিধ্যে আসে, নিজের সত্তা খুঁজে বেড়ায়। অন্যরা তার সম্পর্কে কী ভাবে, তাও অনুধাবন করতে শেখে। যাদের সংস্পর্শে আসে তাদের আচার-আচরণ তার দেহ, মন ও বুদ্ধিতে দারুণ প্রভাব ফেলে। তাই সেখানে তাল মেলাতে না পারলে শিশুটি নিভৃতচারী বা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ার মতো ঝুঁকিতে থাকছেই কিন্তু সব সময়!

দৈহিক বৃদ্ধির খতিয়ান
প্রতিবছর এ বয়সের শিশু প্রায় তিন থেকে তিন দশমিক পাঁচ কেজি বা সাত পাউন্ডের মতো ওজনে বাড়ে; আর উচ্চতা বৃদ্ধি পায় প্রায় ছয় সেন্টিমিটার বা দুই দশমিক পাঁচ ইঞ্চির মতো। তবে পুরো সময়ে মাথার বেড় বাড়ে প্রায় দুই থেকে তিন সেন্টিমিটার। কেননা মস্তিষ্কের বৃদ্ধি তখন বেশ স্থিতাবস্থায় পৌঁছায়, দুধদাঁত পড়তে থাকে, মাংসপেশির ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ, পারদর্শিতা আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে।

বিদ্যালয়ে ভালো ফল করা
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার প্রথম দুই বছরে শিশুকে শেখার কিছু মূল ভিত্তি পাইয়ে দিতে হয়। পড়ার ক্ষমতা, লেখার ক্ষমতা ও অঙ্কের প্রাথমিক দক্ষতা অর্জনের এ হলো আদি স্তর বা ভিত। এ ভিতের ওপর ধীরে ধীরে আরও জটিল অঙ্ক বা পড়ালেখার বৈচিত্র্য ধারণের শক্তি অর্জন করে। তবে এ পর্বে শ্রেণীকক্ষে ভালো করা বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল। যেমন-মনোযোগী হওয়ার ব্যাপারটি। অমনোযোগী হলে যেমন বিষয়টি তার কাছে বোধগম্য হবে না, তেমনি বোধগম্য মনে না হলে সেও বিষয়টির ধারেকাছে যাবে না। এ ছাড়া শিক্ষককে সন্তুষ্ট করা, প্রতিযোগিতামূলক মনোবৃত্তি, কাজ করার আনন্দ-আগ্রহ, সাফল্য ধরা না দিলেও জোর চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতা ইত্যাদি শিশুর স্কুল পারফরম্যান্সে ভূমিকা পালন করে।

বাসা, বিদ্যালয়, সমাজ-তিন পরিবেশের প্রভাব
তিন-তিনটি ক্ষেত্রের পরিবেশ মিলিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের সামাজিক ও মানসিক বিকাশ ঘটে। প্রথমত, তার বাড়ি বা বাসার পরিবেশ, যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি। সন্তান ও মা-বাবার মধ্যকার সম্পর্ক যদি শিশুকে পূর্ণ নিরাপত্তা দেয়, শুধু তখনই শিশু সেটিকে ভিত্তি করে সামনের দিকে এগোতে পারে। মা-বাবার উচিত শিশুকে তার বিদ্যালয়ের কর্মসূচির সব কাজে ও পাঠক্রমের বাইরের অন্যান্য বিষয়ে সহায়তা করা। দ্বিতীয়ত বিদ্যালয়ের পরিবেশ। শিক্ষক-শিক্ষিকা ও বন্ধুবান্ধবের সংস্পর্শ, সহমর্মিতা, প্রতিযোগিতামূলক আবহাওয়া তার অভিজ্ঞতার ঝুলি ভরতে থাকে। তৃতীয়ত পরিবেশ তৈরি করে তার সমাজ। কোনো কোনো শিশু সামাজিক ভুবনে সহজ জয়ের ধারা পেয়ে বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। শিশুর ব্যক্তিত্বে, আচার-আচরণে, উচ্চারণে, উৎসাহদানে, নিয়মনীতিতে, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের মতো বিষয়ে শিশুর ওপর বেশি ভূমিকা পালন করে তার বন্ধুরাই।

মা-বাবার দায়িত্ব
এ বয়সে দৈহিক বাড়ন, গড়ন বা নানা ক্ষমতা অর্জনে ভিন্ন ভিন্ন শিশুর মধ্যে পার্থক্য থাকে। কোনো শিশু যখন এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে, মা-বাবা বা অভিভাবকের দায়িত্ব তাকে পুরো বিষয় সঠিকভাবে বুঝিয়ে তার আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তোলা। এটি কি আসলে কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি, নাকি সাধারণ ভিন্নতা মাত্র-এ ব্যাপারে শিশুবিশেষজ্ঞ তা যাচাই করে পরামর্শ দিতে পারেন। এ বয়সে শিশু সফল হলে তা তার আরও সাফল্যের ভিত নির্মাণ করে।

আর ব্যর্থ হলে তা তাকে হতাশায় ডুবিয়ে আরও ব্যর্থতার অতলে ডুবিয়ে দিতে পারে। মা-বাবা বা অভিভাবকের উচিত তাকে উৎসাহ দেওয়া, কোনো কিছুতে ভালো করলে সেটার প্রশংসা করা। অনেক মা-বাবা শিশুকে বিভিন্ন বিষয়ে অতিরিক্ত চাপের মধ্যে রাখেন। তাঁরা সন্তানকে দিয়ে তাদের সব রকমের স্বপ্নপূরণের প্রত্যাশা করেন।

এ বয়সের শিশু কিন্তু তার প্রথম স্কুলজীবনের তুলনায় আর মায়াবী রঙিন কাল্পনিক জগতে বাস করে না। তার ভুবন ও চিন্তা-চেতনায় বাস্তবতা আস্তে আস্তে ধরা দিতে থাকে। ফলে মা-বাবার মনের ইচ্ছা পূরণে সেও সাধ্যমতো চেষ্টা করে। মা-বাবার উচিত সব ধরনের পরিস্থিতিতে শিশুকে সহযোগিতা করা, মানসিক চাপ বা নির্যাতনে না রাখা। মা-বাবার মধ্যে বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটলে প্রায় বেশির ভাগ শিশুই ভেঙে পড়ে। মা-বাবার কলহ তার মন পুড়ে ছারখার করে দেয়। মা-বাবার ুকেউ নেশাগ্রস্ত থাকলে তা শিশুকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। মানসিক বিকাশে ব্যাঘাত ঘটায়।

শেষ কথা
শিশুবিশেষজ্ঞ যখন শিশুকে পরীক্ষা করে দেখেন, তখন তার বাসাবাড়ি, শিক্ষা, কর্মধারা, বন্ধুবান্ধব, কোনো কিছুতে আসক্তি, যৌনতা ও হতাশাচিত্র সম্পর্কে ধারণা নেন এবং সে অনুযায়ী চিকিৎসা দেন।
 
************************
দৈনিক প্রথম আলো, ১৪ মে ২০০৮
ডা· প্রণব কুমার চৌধুরী
শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ