নাকের অত্যন্ত দরকারী কাজগুলোর মধ্যে একটি ভালো-মন্দ গন্ধ নির্ণয়ে সাহায্য করা। গন্ধ নির্ণয়ের জন্য নাক ছাড়াও অলফ্যাক্টরি নামে একটি স্নায়ু এবং ব্রেইনের একটি অংশের প্রয়োজন রয়েছে। নাকে গন্ধ পাওয়া শুধু ভালো-মন্দ জিনিসই নির্ণয় করে না, খাবারের স্বাদও অনেকটা এর ওপর নির্ভর করে। উদাহরণস্বরুপ বলা যায়, সর্দি লাগলে খাবারের স্বাদও অনেক কমে যায়। খাবারের ভালো গন্ধ খাদ্য পরিপাকেও সাহায্য করে থাকে। যেমন-আমরা খেতে বসতে বসতে বা রান্না ঘর থেকে সুন্দর খাবারের সুন্দর গন্ধ ভেসে এলে পরিপাক নালীর এনজাইম নিঃসরণ শুরু হয় যা পরে খাদ্য হজম হতে সাহায্য করে। ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ভাইরাস জ্বরে খাবারের গন্ধ ঠিকমত পাওয়া যায় না বা সব খাবার থেকে অন্য ধরনের গন্ধ মনে হয়, ক্ষুধা থাকে না, স্বাদও পাওয়া যায় না আর খেলেও খাবার পেটের ভিতরে হজম হতে চায় না।

গন্ধ নির্ণয়ের প্রয়োজনীয়তা
খারাপ এবং ভালো গন্ধ নির্ণয় করে নাক এবং সংশ্লিষ্ট অরগানগুলো আমাদের নির্দেশনা দেয় ভালো জিনিস খুঁজে বের করতে আর খারাপ জিনিস থেকে দুরে থাকতে। খাবারের স্বাদ নির্ণয় বা খাবার হজমের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কথা তো আগেই বলেছি। অন্যান্য জীব-জন্তুদের বেলায় এটা আরো কিছু প্রয়োজনীয় কাজ করে, যেমন- নিজের আত্মীয়-স্বজনকে চেনা, শিকার এবং খাবার খুঁজে বের করা, প্রজনন ইত্যাদি।

গন্ধ না পাওয়ার প্রকারভেদ
একদম গন্ধ না পাওয়াকে বলে এনোসমিয়া, কম গন্ধ পাওয়াকে বলে হাইপোসমিয়া আর বাজে গন্ধ পাওয়াকে বলে ক্যাকোসমিয়া। এ অসুবিধাসমুহ নাকের এবং সংশ্লিষ্ট অংশের একদিকের বা দুইদিকের অসুবিধার জন্য হতে পারে।

কারণ সমুহঃ
১) নাকের ভিতরে গঠনগত অথবা বিভিন্ন অসুখের জন্য প্যাথলজিক্যাল পরিবর্তনের প্রয়োজন। শুধু নাকের মধ্যবর্তী দেয়ালের জন্য গন্ধ না পাওয়া তেমন একটা দেখা যায় না। বিভিন্ন প্যাথলজিক্যাল কারণসমুহের মধ্যে রয়েছে সর্দি বা কমন কোল্ড নাকের পলিপ, নাকের প্রদাহ (ক্রনিক), সাইনুসাইটিস, নাকের ভিতরের টিউমার, এন্ট্রাফিক রাইনাইটিস ইত্যাদি। নাকের ভিতরে ওপরের দিকে পার্শ্বদেয়াল বা নাকের ছাদেও রয়েছে গন্ধ নির্ণয়ের জন্য সেসিটিভ নার্ভ রিসিপ্টর। কাজেই যেসব কারণে নাকের ভিতরে শ্বাসের সঙ্গে নেয়া বাতাস বাধাপ্রাপ্ত হবে বা উল্লিখিত স্হানে পৌঁছতে পারে না, সেসব কারণগুলোই গন্ধ না পাওয়ার জন্য দায়ী। এছাড়াও রয়েছে অ্যালার্জি এবং ভ্যাসোমটররাইনাইটিস-এ ধরনের প্রচুর রোগী আমাদের দেশে দেখা যাচ্ছে।

আরেকটি উল্লেখযোগ্য কারণ হচ্ছে অতিরিক্ত নাকের ডিকনজেষ্টেন্ট ড্রপ ব্যবহার করা। প্রথমে এ ধরনের ওষুধ নাক বন্ধ হয়ে গেলে রোগীরা নাক খোলার জন্য ব্যবহার করেন। পরে ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়াই অনবরত ব্যবহার করার ফলে নাকের ভিতরে এক ধরনের প্রদাহ শুরু হয় আর এর জন্যও গন্ধ না পাওয়া রোগ হতে পারে।

২) নাকের ভিতর থেকে গন্ধের সেনসেশন ইলেকট্রিক্যালি ব্রেইনে পৌঁছে দেয়ার যে নার্ভ আছে তাতে কোনো কারণে অসুবিধা হলে যেমন-ইনফ্লুয়েঞ্জা, দুর্ঘটনার জন্য নার্ভ ছিড়ে যাওয়া বা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এতে কিছু পরিবর্তন ইত্যাদি।

৩) ব্রেইনের ভিতরে কোনো অসুখের জন্য যেমন-আঘাত, টিউমার, মৃগীরোগ বা বয়স বাড়ার জন্য ইত্যাদি।

৪) মানসিক কিছু কারণে যেমন হিষ্টিরিয়া গন্ধ না পাওয়া অসুখ আস্তে আস্তে হতে পারে বা হঠাৎ করেও হতে পারে।

রোগ নির্ণয়ঃ বেশ কিছুদিন যদি নাকে গন্ধ না পাওয়া যায় অথবা কম গন্ধ পাওয়া যায় অথবা পরিবর্তিত গন্ধ পাওয়া যায় তবে একজন নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া উচিত। তিনি রোগীর ইতিহাস নিয়ে পরীক্ষা করে প্রয়োজনে ইনভেষ্টিগেশন করে রোগ নির্ণয় করতে চেষ্টা করেন-যদি সত্যিই কোনো অসুবিধা থাকে এর কারণ নির্ণয় করেন। দরকারমতো রোগীকে ওষুধ দিয়ে বা অপারেশনের প্রয়োজন হলে তিনি ব্যবস্হা করবেন। নাকের ভিতরের বেশির ভাগ অসুখের ওষুধ বা অপারেশন করে রোগীকে সুস্হ করা সম্ভব। তবে নাকের ভিতরের অনেক অসুখ যদি খুব বেশিদিন থাকে তবে তা দুর হলেও গন্ধজনিত না পাওয়া অসুবিধা থেকে যেতে পারে। নাকের ভিতরে যদি কোনো অসুবিধা না থাকে তবে প্রয়োজন অনুসারে এবং রোগের ধরন হিসেবে নিউরোসার্জন বা মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ দরকার মতো ব্যবস্হা নেবেন।

নাকের অপারেশনগুলো প্রচলিত অথবা সর্বাধুনিক এন্ডোস্কপিক পদ্ধতিতে করা যায়। এন্ডোস্কপিক পদ্ধতিতে সীমিতভাবে আমরা চিকিৎসা করছি। এ পদ্ধতিতে নাকের অপারেশন হয় প্রায় নিখুঁত। নাকের ভিতরের প্রয়োজন মতো অংশ সরিয়ে বা কমিয়ে অপারেশন করে। কাটা-ছেঁড়াও হয় কম। হাসপাতালে থাকতে হয় কম সময়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে লোকাল অ্যানেসথেসিয়া দিয়ে। বেশকিছু দিন গন্ধ না পেলে আর দেরি না করে নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
 
**************************
ডা. মোঃ সফিউল্যাহ্ 
আমার দেশ, ২০ মে ২০০৮