সুন্দর দাঁত মানেই সুন্দর হাসি। সুন্দর হাসির জয়জয়কার সারা বিশ্বজুড়ে। সুন্দর দাঁত স্রষ্টার এক অমুল্য দান। সবার ক্ষেত্রে সুন্দর দাঁতের অধিকারী বা অধিকারিণী হওয়া হয়ে ওঠে না। তাই বলে কি দাঁত অসুন্দরই থেকে যাবে? না, স্রষ্টা নিজের সৃষ্টির অসৌন্দর্যের সমাধান মানুষের কাছেই দিয়ে দিয়েছেন। দাঁতের সৌন্দর্য রক্ষায় ডেন্টাল সার্জনদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠা পেয়েছে ইস্হেটিক ডেন্টিস্ট্রি বা কসমেটিক ডেন্টিস্ট। বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতিনিয়ত উন্নত থেকে উন্নততর হচ্ছে ইস্হেটিক ডেন্টিস্ট্রি। মুলত দাঁতের আকার আকৃতি অর্থাৎ গঠন সুন্দর করতে, দাঁতের ঔজ্জ্বল্য ফিরিয়ে আনতে এক কথায় বয়সকে পিছে ফেলে সুন্দর দাঁত নিয়ে জীবনকে উপভোগ করার নামই হচ্ছে ইস্হেটিক ডেন্টিস্ট্রি।

ইস্হেটিক ডেন্টিস্ট্রি দাঁতের সাধারণ চিকিৎসা পদ্ধতি নয়। এক্ষেত্রে আধুনিক ডেন্টাল টেকনিকের সঙ্গে ব্যবহৃত হয়ে থাকে নানা রকম উন্নত ও অত্যাধুনিক ডেন্টাল সরঞ্জাম। তাই বর্তমানে ইস্হেটিক ডেন্টিস্ট্রি এত বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এই আধুনিক চিকিৎসা গ্রহণের পুর্বে আমাদের জানা প্রয়োজন, দাঁতের কসমেটিক সমস্যাগুলো কি কি। দাঁতের কয়েকটি সাধারণ কসমেটিক সমস্যাগুলো হচ্ছে-দাগযুক্ত বা বিবর্ণ দাঁত, ভাঙা দাঁত, দাঁতের মাঝে ফাঁকা, দাঁত না থাকা, এলোমেলো বা আঁকাবাঁকা দাঁতের সারি, গজদাঁত বা অতিরিক্ত দাঁত, অপেক্ষাকৃত ছোট দাঁত, হাসলে মাঢ়ি দেখা যাওয়া ইত্যাদি।

বিবর্ণ বা কালচে দাঁত আমাদের কারোরই কাম্য নয়। আমাদের দাঁত সাধারণত ঝকঝকে সাদা হয়ে থাকে। কারো কারো দাঁত জন্ম থেকেই বিবর্ণ হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে শিশু গর্ভে থাকা অবস্হায় মায়ের বিপজ্জনক ওষুধ সেবনের জন্যও পরবর্তী সময়ে বিবর্ণ দাঁত উঠতে পারে। আবার অতিরিক্ত চা কফি, পান, সিগারেট, বিভিন্ন মাদকদ্রব্য গ্রহণেও দাঁতে কালচে বা বাদামি রংয়ের ছোপ ছোপ দাগ পড়ে থাকে। দাঁতের বর্ণহীণতার ইস্হেটিক চিকিৎসা হলো ব্লিচিং। ব্লিচিং হলো এমনই এক পদ্ধতি যার সাহায্যে দাঁতের ঝকঝকে সাদা ভাব ফিরিয়ে আনা হয়। এক্ষেত্রে চিকিৎসার সময় বিশেষ ধরনের ব্লিচিং তেল ব্যবহার করা হয়। অনেকে বাসায় ব্লিচিং করে থাকেন, তবে তা সম্পুর্ণ নিরাপদ নয়, অনেক ক্ষেত্রে মাঢ়ির ক্ষতিও হয়ে থাকে। অভিজ্ঞ ডেন্টিস্টের কাছেই ব্লিচিং করা নিরাপদ, এছাড়া চিকিৎসার ফলও নির্ভরযোগ্য, অব্যর্থ ও দীর্ঘস্হায়ী। ব্লিচিং একবার করালে অনেকদিন থাকে, প্রয়োজনে রি-ব্লিচিংও করা যায়। যারা অতিরিক্ত চা-কফি খান কিংবা ধুমপান করেন তাদের ক্ষেত্রে ব্লিচিং দীর্ঘস্হায়ী হয় না।

দাঁত আঁকাবাঁকা বা অতিমাত্রায় ঠাসাঠাসি থাকার আধুনিক অর্থাৎ ইস্হেস্টিক সমাধান হলো কসমেটিক কন্ট্যুরিং। এই পদ্ধতিতে দাঁতের সারির গঠনের মেরামত করা হয় এবং এলোমেলো দাঁতের সারিকে সোজা করা হয়। এক্ষেত্রে ডেন্টাল ক্লিপ বা ওয়্যার ব্যবহার করা হয়ে থাকে। দাঁতের আঁকাবাঁকা বা এলোমেলো থাকার পরিমাণের উপর নির্ভর করে চিকিৎসার ব্যয় ও সময়। তবে এটি খুবই নিরাপদ ও স্হায়ী পদ্ধতি যার মাধ্যমে ব্যক্তিত্ব অনুযায়ী হাসি বদলানো এখন আর কোনো ব্যাপারই নয়। তবে অভিজ্ঞ ডেন্টিস্টের কাছে না করালে বিপদ ঘটতে পারে। অতিরিক্ত এনামেল ওঠাসহ ভালো দাঁত ভেঙে যেতে পারে।

দাঁতের পুনর্গঠন ও ক্ষতিগ্রস্ত দাঁতের সুরক্ষার সহজ ও সাধারণ পদ্ধতিটি হচ্ছে কম্পোজিট বন্ডিং। যেসব ক্ষেত্রে কম্পোজিট বন্ডিং প্রযোজ্য তা হলো-দাঁতের মাঝে ফাঁকা বন্ধ করতে, বাঁকা দাঁত সোজা করতে, দাঁতের ফ্র্যাকচার বা ফাটল ঠিক করতে, দাঁতের গর্ত পুরণ করতে, ছোট দাঁত বড় করতে, পুরনো ফিলিং ঠিক করতে, এমনকি দাঁতের সাদা রং ফিরিয়ে আনতেও। তবে এক্ষেত্রে দাঁতের গায়ে পুনরায় দাগ পড়তে পারে, বিশেষ করে সে স্হানে কম্পোজিট বন্ডিং করা হয় তাতে দাগ পড়ার বেশি সম্ভাবনা থাকে।

কম্পোজিস্ট বন্ডিংয়ের চেয়ে অত্যাধুনিক পদ্ধতির নাম হচ্ছে পোর্সেলিন ভিনিয়ার্স। এক্ষেত্রে আমাদের কাছে পরিচিত শব্দ হচ্ছে ক্যাপব্রিজ। একটি দাঁতে পোর্সেলিন ভিনিয়ার্স দেয়া হলে তাকে ক্যাপ বলা হয়, অন্যদিকে মাঝে মাঝে দাঁত না থাকার জন্য পার্শ্ববর্তী দাঁতের সাহায্যে দাঁত তৈরি করে একাধিক দাঁতে পোর্সেলিন ভিনিয়ার্স দেয়া হলে তাকে ব্রিজ বলা হয়। তবে সাধারণত দাঁতের ফাঁক কমাতে, ক্ষয়ে যাওয়া বা ভাঙা দাঁত ঠিক করতে দাঁতের মাঢ়ি দেখা গেলে ফিলিং নষ্ট হয়ে গেলে, বিবর্ণ দাঁতের রং ঠিক করতে পোর্সেলিন ডিনিয়ার্স ব্যবহার করা হয়। এটি সাধারণ বন্ডিংয়ের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর এবং সঠিক পরিচর্যায় এটি দীর্ঘস্হায়ী হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে তৈরি পোর্সেলিনের পাতলা সেমি-ট্রাসলিউসেন্ট শেল, প্লেটস বা ল্যামিনেটস তৈরি করে স্বাভাবিক দাঁতের উপর বসানো হয়। পোর্সেলিন ভিনিয়ার্সে কোনো দাগ পড়ে না, রং নষ্ট হয় না, দেখতে খুবই স্বাভাবিক মনে হয়। আবার অতিরিক্ত চা-কফি ও ধুমপানের জন্য দাগ পড়ে গেলেও তা খুব সহজেই পুনরায় পলিশ করে নেয়া যায়। আপনার দাঁতের সৌন্দর্যের দায়ভার আপনারই। তাই আপনার সামনে হাসতে গিয়ে মনে মনে বিব্রত না হয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্লিচিং, বন্ডিং, পোর্সেলিন যে কোনোটাই আপনি নিমিষে করিয়ে নিতে পারেন। তখন হাসতে গিয়ে একটা কথাই বার বার মনে পড়বে, সুন্দর দাঁতের কোনো তুলনাই হয় না।
 
 **************************
আমার দেশ, ২০ মে ২০০৮
ডা. আওরঙ্গজেব আরু