এইডস (একুয়ার্ড ইমিউনো ডেফিসিয়েনসি সিনড্রোম) রোগের জীবাণুর নাম এইচআইভি (হিউম্যান ইমিউনো ডেফিসিয়েনসি ভাইরাস)। এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তি আনেক দিন সুস্থ থাকতে পারে। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে ধীরে ধীরে রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা হ্রাসের কারণে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয় এবং মৃত্যুই তার জীবনের সর্বশেষ পরিণতি হয়ে থাকে।

১৯৮১ সালে এইডস রোগের সন্ধান পাওয়া যায় এবং ১৯৮৫ সাল থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা রক্ত পরিসঞ্চালনের আগে রক্ত এইচআইভি ভাইরাস জীবাণুমুক্ত কি না স্ক্রিনিং করে নিশ্চিত হওয়ার পরই কেবল রক্ত সরবরাহ করার পরামর্শ দেয়। এ পর্যন্ত এইডস রোগে আক্রান্তদের মধ্যে ৯০ শতাংশই উন্নয়নশীল দেশে।

২০০৭ সালে সারাবিশ্বে এইচআইভি আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ছিল ৩ কেটি ৩২ লাখ প্রায়। এদের প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার যাদের বয়স ১৫ বছরের কম। ২০০৭ সালে ২১ লাখ মারা গেছেন এইডসে। বিশ্বে প্রতিদিন আক্রান্ত হচ্ছে ৬ হাজার ৮০০ জন অর্থাৎ ২৮৩ জন প্রতি ঘণ্টায়।

আমাদের দেশের চার দিকে ভারত, মিয়ানমারসহ অন্যান্য দেশে এই রোগের প্রাদুর্ভাব অনেক বেশি। তাই আমরা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানে আছি।

এইচআইভি সংক্রমণের উৎস
১। অরক্ষিত যৌন মিলনের মাধ্যমে (নারীতে পুরুষে)/ অসমকামী ৭৩.১০ শতাংশ
২। অরক্ষিত/ অস্বাভাবিক যৌন মিলনের মাধ্যমে
(পুরুষে পুরুষে-৬০ শতাংশ, নারীতে নারীতে)/সমকামী ০.৭০ শতাংশ
৩। স্বামী-স্ত্রীর মাধ্যমে ১.৩০ শতাংশ
৪। শিরায় মাদকদব্য গ্রহণকারী ৮.২০ শতাংশ
৫। রক্ত পরিসঞ্চালন ৬.৯০ শতাংশ
৬। রক্ত উপাদান গ্রহণকারী ০.৮০ শতাংশ
৭। অনান্য (সংক্রমিত গর্ভবতী মা থেকে নবজাতকে,
মায়ের দুধের মাধ্যমে ইত্যাদি) ৯.০০ শতাংশ

রক্ত পরিসঞ্চালনের মাধ্যমে এইচআইভি ভাইরাসের মাধ্যমে এইডস রোগ ছড়িয়ে থাকে। এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্ত রক্তদাতার কাছ থেকে একজন রক্তগ্রহণকারী মহিলা, পুরুষ বা শিশু এইডস রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে শতকরা ১০০ ভাগ।

একজন রক্তদাতা রক্তদানের কারণে কোনো সময়ই এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। কারণ, সরকার অনুমোদিত ট্রান্সফিউশন মেডিসিন সেন্টারে রক্ত সংগ্রহের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণগুলো সব সময়ই জীবাণুমুক্ত এবং একবারই কেবল ব্যবহার করা হয়। ব্যবহারের পর আনুষঙ্গিক উপকরণ নষ্ট করে ফেলা হয়।

একজন রক্ত গ্রহীতা অবশ্যই তার গৃহীত রক্ত এইচআইভি ভাইরাসমুক্ত কি না তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য তিনি এইচআইভি স্ক্রিনিং টেস্ট করা হয়েছে কি না তা জেনে নিতে পারেন। এখানে বলে রাখা ভালো যে এই স্ক্রিনিং টেস্টের মাধ্যমে সরাসরি এইচআইভি ভাইরাস নির্ণয় করা যায় না, এই ভাইরাসের উপস্থিতির কারণে শরীরে যে এন্টিবডি তৈরি হয় সেই এন্টিবডিই কেবল নির্ণয় করা যায়। মানুষের শরীরে এই ভাইরাস প্রবেশ করার পরপরই এন্টিবডি তৈরী হয় না সেই জন্য ২-২৪ সপ্তাহ সময় লাগে। এই সময়কালকে ভাইরাসের উইনডো পিরিয়ড বলে। একজন এইচআইভি ভাইরাস আক্রান্ত রক্তদাতা এই উইনডো পিরিয়ডে অবস্থান করলে এন্টিবডি পাওয়া যাবে না বা স্ক্রিনিং টেস্টে নেগেটিভ হবে অথচ এই রক্ত গ্রহীতার এইচআইভি ভাইরাস আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। সুতরাং একজন রক্তদাতার কাউন্সিলিং করার সময় তথ্যাদির ওপর খুব সর্তক থাকতে হবে এবং ঝুঁকিপূর্ণ রক্তদাতা হলে বা স্ক্রিনিং টেস্ট সন্দেহজনক হলে তার কাছ থেকে রক্ত নেয়া যাবে না বা আগেই রক্ত সংগ্রহ করা থাকলে তা নষ্ট করে ফেলতে হবে।

রক্ত পরিসঞ্চালনের মাধ্যমে আক্রান্ত ব্যক্তির দেহে এই রোগের লক্ষণ ৩-৫ বছর পর দেখা যায়, কিন্তু এ ছাড়া অন্য কোনোভাবে আক্রান্ত ব্যক্তির দেহে এই রোগের লক্ষণ ৮-১২ বছর এমন কি এরও অনেক পরে দেখা যায়। এই রোগ সাধারণভাবে ১৫-৪৫ বছর বয়সের মানুষের মধ্যে বেশি দেখা যায়।

এইচআইভি ভাইরাস শরীরে প্রবেশের পর রক্তের শ্বেত কণিকার টি-লিম্ফোসাইটের সাথে সংযুক্ত হয় ও সেলের ভেতর প্রবেশ করে। ভাইরাসের আরএনএ পরে তার একটি এনজাইমের সাহায্যে ডিএনএ-তে পরিণত হয়। মানুষের টি-লিম্ফোসাইটের ডিএনএ’র সাথে ভাইরাসের ডিএনএ সংযুক্ত হয়ে। তার জীবনকাল পর্যন্ত ওই সেলের মধ্যে থাকে এবং অসংখ্য ভাইরাসের জন্ম দেয় এবং একসময় সেলটিকে ধ্বংস করে বের হয়ে আসে আবার নতুন টি-লিম্ফোসাইটের সাথে সংযুক্ত হয়। এইভাবে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে ভাইরাসের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় অন্য দিকে টি-লিম্ফোসাইটের পরিমাণ কমে যায়। ফলে শরীরে রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা হ্রাস পায়। শরীরের সুযোগসন্ধ ানী বিভিন্ন রোগ জীবাণু বংশ বিস্তার করে আর আক্রান্ত ব্যক্তি বিভিন্ন অসুখে ভোগে।

এইচআইভি ভাইরাস মানবদেহে সংক্রমিত হয়ে দেহের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা পর্যায়ক্রমে ধ্বংস করে ফেলে। ফলে সাধারণ রোগজীবাণু প্রতিরোধ ক্ষমতাহীন দেহে নানা রকম রোগের জন্ম দেয়, যেমন- ছত্রাকজনিত সংক্রমণ, যক্ষ্মা, ক্যান্সার ইত্যাদি।
এইচআইভি ভাইরাস শরীরে প্রবেশের পর কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ফ্লুর মতো জ্বর, মাথাব্যথা, একটু একটু শরীর ব্যথা হয়ে থাকে। এই উপসর্গগুলো কিছু দিনের মধ্যেই চলে যায়। এরপর দীর্ঘ ৩-১২ বছর পর্যন্ত আর কোনো উপসর্গ থাকে না। এরপর যখন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমতে থাকে তখন এইডস রোগের লক্ষণগুলো দেখা যায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে গুরুত্বপূর্ণ উপসর্গগুলো হলোঃ
দেহের ওজন শতকরা দশ ভাগের বেশি কমে যাওয়া।
এক মাসের অধিক সময় ধরে মাঝে মধ্যে বা সারাক্ষণ জ্বর থাকা।
এক মাসের অধিক সময় ধরে ডায়রিয়া থাকা।
কম গুরুত্বপূর্ণ উপসর্গগুলো হলোঃ
এক মাসের অধিক সময় ধরে কাশি থাকা।
শরীরে চুলকানি থাকা। বার বার হারপিস জোস্টারে ভোগা। মুখগহ্বর ও গলায় ক্যানডিডা ফাঙ্গাসে আক্রান্ত হওয়া। হারপিস সিমপ্লেক্সের সংক্রমণ ক্রমাগতভাবে ছড়িয়ে পড়া। শরীরের বিভিন্ন স্থানের লিম্ফনোডগুলো ফুলে যাওয়া
উপরের দু’টি গুরুত্বপূর্ণ ও দু’টি কম গুরুত্বপূর্ণ উপসর্গগুলো এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্তের মধ্যে দেখা গেলে মনে করা যেতে পারে তিনি এইডস রোগে ভুগছেন যদিও আরো অনেক ভাইরাস রোগে ওই একই রকম উপসর্গগুলো দেখা যায়।
এইচআইভি সংক্রমিত রক্তগ্রহণ করলে এইডস হওয়ার সম্ভাবনা থাকে শতকরা প্রায় ১০০ ভাগ। যা কিনা অন্যান্য মাধ্যমের চেয়ে অনেক বেশি ও ভয়াবহ। এই ভাইরাস অত্যন্ত সংবেদনশীল যা দেহের বাইরে অধিক সময় পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে না। ভাইরাসটি অতি সহজেই ডিটারজেন্ট, সাবান, অ্যালকোহল, হাইড্রোজেন পার অক্সাইড বা ব্লিচিং পাউডার দিয়ে নষ্ট করা যায়। ৫৬০ সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় ১০ মিনিটে এইচআইভি ভাইরাস মারা যায়। পানিতে ফুটালে ১ সেকেন্ডে এই ভাইরাস মারা যায়।

**************************
ডা. মুহাম্মদ মাহবুব-উল-আলম
 লেখকঃ ট্রান্সফিউশন ইমিউনোলজি ও রক্ত রোগ বিশেষজ্ঞ, ই-মেইলঃ mm_a696@yahoo.com
দৈনিক নয়া দিগন্ত, ২৫ মে ২০০৮