সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও দেশে মোট ক্যান্সারে আক্রান্ত নারীর মধ্যে ২২ থেকে ২৯ শতাংশই জরায়ুমুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, জরায়ুমুখের আবরণীর কোষগুলোতে বিভিন্ন পরিবর্তন ধীরে ধীরে ক্যান্সারে রূপ নিতে অনেক সময় ১০-১৫ বছর পর্যন্তও সময় লাগে। তাই প্রাথমিক অবস্থায় এ রোগটি চিহ্নিত করার জন্য নিয়মিত জরায়ুমুখ পরীক্ষার কোনো বিকল্প নেই।


জরায়ুমুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত ফরিদা বেগমের (৪৭) মাসিকের রাস্তা দিয়ে প্রথমে পানি ও পরে রক্ত যাওয়া শুরু হয়। এর সঙ্গে যোগ হয় চাক চাক রক্ত যাওয়া ও প্রচণ্ড পেটব্যথা। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে দৃশ্যমান এ ধরনের সমস্যায় ভুগতে থাকেন খুলনার পাইকগাছা থানার চাঁদখালী ইউনিয়নের ফরিদা বেগম। তাঁর ভাষায়, ‘শরীর বেশি খারাপ হওয়ার পর থেইক্যা গ্রামের বহুত ডাক্তার দেখাইছি, কতজনরে জিগাইছি কই যামু, কার কাছে যামু। কিন্তু কোনো লাভ হয় নাই। বিভিন্ন জায়গায় শুধু ঘুরছি আর টাকা খরচ করছি।’

অবশেষে মহাখালীর জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ক্যান্সার কেন্দ্রে এসেছেন ফরিদা বেগম। তত দিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে।

তিনি জানালেন, গ্রামের চিকিৎসকেরা প্রথমে উল্টোপাল্টা ওষুধ দিয়েছেন। পরে খুলনায় এক চিকিৎসক ‘রোগী আর বেশি দিন বাঁচব না, যা খাইতে চায় বাড়িতে নিয়া খাওয়ান’ বলে ফেরত পাঠিয়ে দেন। তাঁর পরিবার হাল না ছেড়ে ঢাকায় নিয়ে আসে। বর্তমানে অনেকটা ভালো থাকলেও কেমোথেরাপি নিতে তাঁকে খুলনা থেকে ঢাকায় আসতে হয়। সঙ্গে কাউকে না কাউকে আনতেই হয়। এর মধ্যে খরচ হয়ে গেছে এক লাখ ২০ হাজার টাকা। ধারদেনার পর জমি বিক্রিতেও হাত দিতে হয়েছে।

চিকিৎসকদের মতে, প্রাথমিক পর্যায়ে এ রোগের কোনো লক্ষণ না থাকায় সমস্যা নেই ভেবে বেশির ভাগ নারী নিশ্চিন্তে ঘরে বসে থাকেন। দেশের নারীরা বিষয়টিতে তেমন সজাগও নন।

বিএসএমএমইউর স্ত্রী ও প্রসূতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা• নার্গিস আকতার বলেন, ‘উন্নত বিশ্বে নারীরা নিয়মিত জরায়ুমুখ পরীক্ষা করান বলে প্রাথমিক পর্যায়ে সমস্যা ধরা পড়ে এবং প্রায় ১০০ ভাগ ক্ষেত্রেই রোগী ভালো হয়ে যায়। অন্যদিকে বাংলাদেশে সচেতনতার অভাব এবং লজ্জার কারণে ৮০ ভাগ রোগীই আসে একেবারে শেষ পর্যায়ে। তত দিনে শরীরে বিভিন্ন জায়গায় ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ে এবং অস্ত্রোপচার করাও তখন সম্ভব হয় না।’

২০০৪ সালের জুলাই মাসে সরকার জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) সহায়তায় ভায়া (ভিস্যুয়াল ইন্সপেকশন উইথ এসেটিক এসিড) টেস্টের একটি পাইলট কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, ৩০ বছর বয়সের পর থেকে নারীদের নিয়মিত জরায়ুমুখ পরীক্ষা করানো। এতে করে ক্যান্সারপূর্ব অবস্থা থেকেই একজন নারী স্ক্রিনিংয়ের আওতায় আসবে এবং যদি কোনো সমস্যা থাকে তাও দ্রুত শনাক্ত হবে।

সারভিক্যাল ক্যান্সার অ্যান্ড ব্রেস্ট ক্যান্সার স্ক্রিনিং প্রোগ্রামের ফোকাল পয়েন্ট বিএসএমএমইউর স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা• আশরাফুন্নেসা জানান, কার্যক্রমটি এ পর্যন্ত ৩৬টি জেলা ও আটটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চালু করা সম্ভব হয়েছে। বিএসএমএমইউসহ বিভিন্ন জায়গায় বিনামূল্যে ভায়া টেস্টের সুযোগ পাচ্ছেন নারীরা।

এ পাইলট কর্মসূচিটি সমাপ্ত হওয়ার পর তা আরও পাঁচ বছরের জন্য (২০০৬ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত) বাড়ানো হয়েছে।

জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ক্যান্সার ইপিডেমিওলজি বিভাগ থেকে সর্বশেষ প্রকাশ করা (২০০৫ সালে) প্রতিবেদনমতে, পাঁচ হাজার ৪১১ জন মোট ক্যান্সার শনাক্ত রোগীর মধ্যে নারীর সংখ্যা ছিল দুই হাজার ২৭৫।
এর মধ্যে জরায়ুমুখের ক্যান্সারের রোগী ছিল ৫৬১ জন। হাসপাতালের তথ্যমতে, বিভিন্ন প্রজননতন্ত্রের ক্যান্সারে আক্রান্ত নারীদের মধ্যে জরায়ুর ক্যান্সার প্রথম অবস্থানে ছিল। এর পরই অবস্থান ছিল স্তন ক্যান্সারের।

চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জরায়ুমুখ হচ্ছে জরায়ুর সবচেয়ে নিচের অংশ এবং জরায়ু থেকে সন্তান প্রসবের পথ। জরায়ুর বিভিন্ন অংশের মধ্যে এ অংশে ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নারীদের মৃত্যুর অন্যতম কারণও জরায়ুমুখের ক্যান্সার। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগের লক্ষণ না থাকলেও অনেকের বেলায় অতিরিক্ত সাদা স্রাব, দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব, অতিরিক্ত অথবা অনিয়মিত রক্তস্রাব, সহবাসের পর রক্তপাত, মাসিক পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পুনরায় রক্তপাত, কোমরে, তলপেটে বা ঊরুতে ব্যথা হতে পারে।

এ রোগটিতে নারীরা সাধারণত ৪০ বছরের পরে আক্রান্ত হয়ে থাকে। তবে দেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতায় আরও আগেই আক্রান্ত হচ্ছে বলে চিকিৎসকেরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

ক্যান্সার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ২০০৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ ক্যান্সারে আক্রান্ত ৫৬১ জনের মধ্যে ২১৩ জনেরই বয়স ছিল ৪০ থেকে ৪৯ বছর বয়সের মধ্যে। আর ২০ থেকে ২৯ বছর বয়সের মধ্যে ছিল ২৬ জন।

পরিসংখ্যানমতে, এই নারীদের বেশির ভাগই ছিল গৃহিণী এবং তাদের বেশির ভাগের পরিবারের আয় ছিল মাত্র এক হাজার থেকে তিন হাজার টাকা।

মিরপুরের আহ্‌ছানিয়া মিশন ক্যান্সার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালের ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা• ফজলে এলাহী বলেন, ‘কম বয়সে বিয়ে হওয়া, অনেক সন্তানের জ্ন দেওয়া, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব, আর্থিক ও সামাজিক অবস্থান খারাপ হওয়া, অনেকের ক্ষেত্রে লাগামহীন যৌনজীবনও এ ক্যান্সারের একটি কারণ হতে পারে। তবে এসবের পাশাপাশি এ ক্যান্সারের জন্য একটি ভাইরাসও দায়ী।’

ডা• আশরাফুন্নেসা প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ ও প্রতিষ্ঠানে ভায়া টেস্টের ওপর সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। নারীদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে সচেতনতা আসা শুরু হয়েছে।

অন্তত জরায়ুমুখ পরীক্ষা করতে বললে কেউ নিষেধ করছেন না এবং অনেক নারী নিজে থেকেও আসছেন।

তবে বিষয়টি আরও জোরালোভাবে প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে।’ 

**************************
মানসুরা হোসাইন
প্রথম আলো, ২৮ মে ২০০৮