১৪ কোটি জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত বাংলাদেশের শতকরা ৮০ ভাগ লোক গ্রামাঞ্চলে বসবাস করেন। যারা শহরে বাস করেন তাদেরও সিংহভাগ ভাসমান অবস্থায় চিলেকোঠায় কিংবা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকেন। শরীরের বিভিন্ন রোগ ব্যাধি লেগেই থাকে।

এইসব রোগ ব্যাধির মধ্যে বেশিরভাগ লোক যে রোগটিতে ভুলে থাকেন তা হলো পেটের পীড়া। আপনি ধনী হন কিংবা গরীব হন, কখনও পেটের পীড়া হয়নি এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না।

বাংলাদেশে গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে পেটের পীড়ার প্রাদুর্ভাব বেশি পরিলক্ষিত হয়।

পেটের পীড়া বলতে সাধারণভাবে আমরা বুঝি আমাশয়, ডায়ারিয়া, পেটের ব্যথা কিংবা হজমের অসুবিধা।

পেটের পীড়া সমূহকে প্রধানতঃ দুভাগে ভাগ করা যায়।

প্রথমতঃ খাদ্যনালী (পাকস্থলী, অগ্ন্যাশয়, ক্ষুদ্রান্ত্র কিংবা বৃহদান্ত্রের রোগ)।

দ্বিতীয়তঃ লিভারের প্রদাহ।

খাদ্যনালী (পাকস্থলী, অগ্ন্যাশয়, ক্ষুদ্রান্ত্র কিংবা বৃহদান্ত)-এর কারণ জনিত পেটের পীড়াকে দু’ভাগে ভাগ করা যেতে পারে।

১। স্বল্প মেয়াদী পেটের পীড়া

২। দীর্ঘ মেয়াদী পেটের পীড়া

স্বল্প মেয়াদী পেটের পীড়ার কারণসমূহঃ

১। আমাশয় ২। রক্ত আমাশয় ৩। ডায়রিয়া

১। আমাশয়ঃ অ্যামিবিক ডিসেন্ট্রি স্বল্প মেয়াদী পেটের পীড়ার অন্যতম কারণ যা E. Histolytica নামক জীবাণু দ্বারা সংক্রমিক হয়। এটি মূলতঃ পানিবাহিত রোগ। যারা যেখানে সেখানে খোলা বা বাসী খাবার খেয়ে থাকেন অথবা দূষিত পানি পান করেন তাদের এ রোগ হয়। শহর অঞ্চলে রাস্তার ধারের খোলা খাবার খেলে এ রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলে যারা যত্র তত্র মলমূত্র ত্যাগ করেন, কিংবা নদী ও পুকুরের পানি পান করেন তাদের এ রোগে আক্রান্ত হওয়াই স্বাভাবিক।

এ রোগের উপসর্গ হঠাৎ করে দেখা দেয়। যেমন, ঘন ঘন পেটে মোচড় দিয়ে পায়খানা হওয়া, পায়খানার সাতে রক্ত বা আম মিশ্রিত থাকতে পারে, পায়খানায় বসলে উঠতে ইচ্ছে হয় না বা উঠতে পারে না। ক্ষেত্র বিশেষ দিনে ২০/৩০ বার পর্যন্ত পায়খানা হতে পারে।

২। রক্ত আমাশয়ঃ রক্ত আমাশর প্রধান কারণ হলো এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া যার নাম শিগেলা। এই শিগেলা নামক ব্যাকটেরিয়াও দূষিত খাবার বা পানির মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। রক্ত আমাশয়ের লক্ষণ হলো-পেটে তীব্র মোচড় দিয়ে ব্যথা হওয়া, অল্প অল্প করে বার বার পায়খানা, পায়খানার সাথে রক্ত যাওয়া এবং মলদ্বারে তীব্র ব্যথা হওয়া।

৩। ডায়রিয়াঃ ডায়রিয়ার অন্যতম কারণ হল খাদ্যে নানা ধরনের পানিবাহিত ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ।

-ছোট শিশুদের ডায়রিয়া সাধারণ রোটাভাইরাস নামকম ভাইরাস দিয়ে হয়ে থাকে।

-আর বড়দের ক্ষেত্রে নানা ধরনের ব্যাকটেরিয়া দিয়ে যে ডায়রিয়া মহামারী আকারে দেখা যায় তার অন্যতম কারণ হলো কলেরা। আমাদের দেশে শীতকালে কলেরার প্রাদুর্ভাব বেশি হয়।

পাতলা পায়খানা হলে যদি চাল ধোয়া পানির মতো হয় তবে সেটা কলেরার লক্ষণ। এর সাথে তলপেটে ব্যথা হওয়া, বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া, ঘন ঘন পায়খানায় যাওয়া এবং শরীর আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে যাওয়া এ রোগের মারাত্মক উপসর্গ। এই সময়ে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া অতি জরুরী। তাছাড়া পেটের পীড়ার অন্যান্য কারণ সমূহের মধ্যে রয়েছে পিত্তথলির প্রদাহ, পাকস্থলীর প্রদাহ, অগ্নাশয়ের প্রদান এবং অন্ত্রের প্রদাহ।

-দীর্ঘমেয়াদী পেটের পীড়ার মধ্যে রয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী আমাশয়। এই দীর্ঘস্থায়ী আমাশয় মূলতঃ তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যেমনঃ

১। ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম

২। খাদ্য হজম না হওয়া জনিত পেটের পীড়া

৩। বৃহদান্ত্রের প্রদানজনিত পেটের পীড়া

এই অসুখগুলো মূলতঃ ক্ষুদ্রান্ত্র ও বৃহদান্ত্রের রোগ।

ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম (IBS): অল্প বয়স্ক বা উঠতি বয়স্ক যারা বিশ্ববিদ্যালয় পড় য়া ছাত্র-ছাত্রী, কিংবা যারা নবীন চাকুরীজীবী তাদের মধ্যে IBS রোগটি বেশি দেখা যায়। এই রোগের লক্ষণ হলো পেটে মোচড় দিয়ে ঘন ঘন পায়খানা হওয়া, যা সকালে নাস্তার আগে ও পরে লক্ষণীয়। IBS হলে অনেকের পায়খানা নরম বা অনেকের পায়খানা কঠিন হয়।

কঠিন বা নরম যাই হোক না কেন রোগীর পায়খানার সাথে বাতাস যায় এবং পেটে অস্বস্তি ভাব কাজ করে। অনেকে বলেন, দুধ, পোলাও কোরমা, বিরিয়ানী খেলে এটি বেশি হয়। পেটের পীড়ার অন্যতম কারণ এই IBS যাদের হয় তাদের স্বাস্থ্যহানী হওয়ার সম্ভাবনা কম।

খাদ্য হজম না হওয়া জনিত পেটের পীড়াঃ পেটের পীড়ার আরও একটি কারণ হল Malabsorption Syndrome ।ক্ষুদ্রান্ত্র এবং অগ্নাশয়ে দীর্ঘ মেয়াদী প্রদাহ থাকলে এ রোগটি হয়ে থাকে। প্রচুর পরিমাণে দুর্গন্ধযুক্ত, সাদা পায়খানা বের হওয়া, পায়খানার সাথে হজম না হওয়া খাদ্য কনার মিশ্রন এবং নির্গত মল পানির উপরে ভাসতে থাকা এ রোগের অন্যতম উপসর্গ। এর সাথে পেটে মোচড় দিয়ে ব্যথা হওয়া, পেট ফুলে পাওয়া কিংবা ধীরে ধীরে শরীরের ওজন কমে যাওয়া এ রোগের লক্ষণ।

বৃহদান্ত্রের প্রদাহ জনিত পেটের পীড়াঃ এটি একটি মারাত্মক ব্যাধি। অবশ্য আমাদের দেশে এ রোগের প্রাদুর্ভাব কম, উন্নত বিশ্বে এই রোগ বেশি হয়। এ রোগের লক্ষণ হলো আম ও রক্তমিশ্রিত পায়খানা হওয়া, জ্বর কিংবা জ্বর জ্বর ভাব হওয়া এবং শরীর আস্তে আস্তে ভেঙ্গে যাওয়া।

সব বয়সের মানুষের এ রোগ হয়। Colonoscopy নামক পরীক্ষার মাধ্যমে এ রোগ সঠিকভাবে নির্ণয় করা যায় এবং বিশেষ চিকিৎসা পেলে এ রোগ ভাল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

এছাড়া পিত্তথলির পাথর, পিত্তনালীর প্রদাহ, অগ্নাশয়ের প্রদাহ এবং পাকস্থলির ও ক্ষুদ্রান্ত্রের প্রদাহের কারণে পেটের পীড়া হতে পারে। এবার সে সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করা যাকঃ

পিত্তথলির পাথর ও পিত্তনালীর প্রদাহ জনিত পেটের পীড়াঃ পিত্তথলির পাথর ও পিত্তনালির প্রদাহের ফলে যাদের পেটের পীড়া হয়, তাদের তীব্র পেট ব্যথা হতে পারে। কয়েকদিন পর পর ব্যথা উঠে এবং কয়েকদিন পর্যন্ত তা থাকে। ব্যথার সাথে বমি ও জ্বর হতে পারে। ব্যথাটা পেটের ডানপাশে উপরিভাগে অনুভূত হয়। ব্যথা তীব্র হলে রোগী কষ্টে কাতরাতে থাকেন।

অগ্নাশয়ের প্রদাহ জনিত পেটের পীড়াঃ পেটের পীড়ার আরও একটি কারণ হল অগ্নাশয়ের প্রদাহ বা Pancreatitis অগ্নাশয় একটি লম্বা অঙ্গ বা Organ যা পেটের ভিতরে পেছনে অবস্থিত। এই অগ্নাশয়ের কাজের উপর নির্ভর করে হজমের ক্ষমতা এবং রক্তে গস্নুকোজের পরিমাণ ঠিক রাখা। স্বল্পমেয়াদী অগ্নাশয়ের প্রদাহ হলে তাকে Acute Pancreatitis বলে, যার অন্যতম কারণঃ

১। ভূরিভোজ করা।

২। পিত্তনালী বা পিত্তথলিতে পাথর এবং

৩। অ্যালকোহল পানে আসক্তি

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মৃদু বা সহনীয় ব্যথা ভাল হয়ে যায়। তবে অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসায় বিলম্ব কিংবা অবহেলা করলে জটিল আকার ধারণ করতে পারে এমনকি প্রাণহানিও ঘটতে পারে।

পাকস্থলি ও ক্ষুদ্রান্ত্রের প্রদাহঃ উপরের পেটে দীর্ঘদিন বার বার ব্যথা হওয়া, Peptic Ulcer রোগের লক্ষণ যা পাকস্থলি (Stomach বা ক্ষুদ্রান্ত্রের ( Duodenum) এর প্রদাহের কারণে হয়। এই প্রদাহ দুরারোগ্য ব্যাধি। যাদের হয়, বার বার হয়। রোগীও সারে না, রোগও ছাড়ে না।

এই রোগকে পেটের পীড়ার অন্যতম কারণ হিসাবে বলা যায়। কেননা আমাদের দেশে ১২% লোক Peptic Ulcer -এ ভুগছেন। এছাড়া যারা অনিয়মিত খান, অতিরিক্ত ধূমপান করেন তাদের এ রোগ বেশি হয়।

লক্ষণের মধ্যে রয়েছে, খালি পেটে ব্যথা, শেষরাতে ব্যথা এবং দীর্ঘমেয়াদী ব্যথা। এ রোগ সেরেও সেরে উঠে না। এবারের শেষটায় এসে যে কথা বলতে চাই-খাবারের প্রতি অনীহা, অরুচি, অস্বস্তি, ওজন কমে যাওয়া- এসব কিছুরই অন্যতম কারণ দীর্ঘমেয়াদী লিভারের প্রদাহ। এ দীর্ঘমেয়াদী লিভারের প্রদাহ এমন আকার ধারণ করে যা কিনা দীর্ঘস্থায়ী জটিল লিভার সিরোসিসে রূপ নিতে পারে।

পেটের পীড়ার চিকিৎসাঃ -স্বল্পমেয়াদী পেটের পীড়ায় আক্রান্ত রোগীর শরীর খুব তাড়াতাড়ি পানি শূন্য হয়ে যায়। তাই এ অবস্থা প্রতিরোধের জন্য রোগীরকে প্রচুর পরিমাণে খাবার স্যালাইন খাওয়াতে হবে এবং প্রতিবার পাতলা পায়খানা হওয়ার পর খাবার স্যালাইন খাওয়ানো বাঞ্ছনীয়।

-রোগীর শরীরে জ্বর থাকলে এবং পেটে ব্যথা হলে চিকিৎসকের পরামর্শক্রমে রোগীকে প্রয়োজনীয় এন্টিবায়োটিক প্রদান করতে হবে।

-শিশুদের ক্ষেত্রে যেহেতু ভাইরাসজনিত কারণে পেটের পীড়া বেশি হয়। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া রোগীকে কোনো প্রকার ওষুধ না খাওয়ানোই শ্রেয়। তবে শিশুর শরীর যাতে পানি শূন্য না হয়, সেজন্য প্রতিবার পাতলা পায়খানা হলে শিশুকে খাবার স্যালাইন খাওয়াতে হবে। পাশাপাশি শিশুকে তার সকল প্রকার খাদ্য প্রদান অব্যাহত রাখতে হবে। যদি শিশু মায়ের দুধ পান করে থাকে, তবে কোনো অবস্থাতেই তা বন্ধ করা যাবে না।

-দীর্ঘমেয়াদী পেটের পীড়া যেহেতু পিত্তথলির পাথর, পিত্তনালীর প্রদাহ, অগ্নাশয়ের প্রদাহ, পাকস্থলির ও ক্ষুদ্রান্ত্রের প্রদাহ, বৃহদান্ত্রের প্রদাহ এবং দীর্ঘমেয়াদী লিভারের প্রদাহের কারণে হয় তাই এ সমস্ত ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়াই শ্রেয়। অনেকে কবিরাজি, গাছ-গাছড়া বা ঝাড় ফুকের মাধ্যমে এ জাতীয় পেটের পীড়া থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করেন। এতে রোগীর ভেগান্তিই কেবল বাড়ে এবং রোগও জটিল রূপ ধারণ করে।

পেটের পীড়া প্রতিরোধে করণীয়ঃ

১। পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হলে ভীত না হয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ ও চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

২। খাদ্র গ্রহণের পূর্বে এবং মলত্যাগের পর নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার করতে হবে। যে সমস্ত অভিভাবক শিশুকে খওয়ান, তারা শিশুকে খাবার প্রদানের পূর্বে এবং শিশুর মলত্যাগের পর একই নিয়মে হাত পরিষ্কার করবেন।

৩। পরিষ্কার পানিতে আহারের বাসনপত্র, গৃহস্থালী ও রান্নার জিনিস এবং কাপড়-চোপড় ধোয়া সম্পন্ন করতে হবে এবং প্রয়োজনে সাবান ব্যবহার করতে হবে।

৪। পায়খানার জন্যে সর্বদা স্যানেটারী ল্যাট্রিন ব্যবহার করতে হবে। ৫। রান্নাঘর ও বাথরুমের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা স্বাস্থ্যসম্মত রাখতে হবে।

৬। যারা গ্রামে বসবাস করেন, তাদের যেখানে সেখানে বা পুকুর নদীর ধারে মলত্যাগের অভ্যাস পরিহার করতে হবে।

৭। খালি পায়ে বাথরুমে বা মলত্যাগ করতে না গিয়ে সর্বদা স্যান্ডেল বা জুতা ব্যবহার করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

৮। খাবারের জন্য ফুটানো পানি ব্যবহার করতে হবে এবং পানি ফুটানোর ব্যবস্থা না থাকলে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ব্যবহার করতে হবে।

৯। আহারের জন্য তৈরিকৃত খাদ্য সামগ্রী এবং পান করার জন্য নির্ধারিত পানি সর্বদা ঢেকে রাখতে হবে।

১০। পুরোনো, বাসী বা দুর্গন্ধযুক্ত খাবার কখনোই খাওয়া যাবে না।

মনে রাখবেন, পেটের পীড়া প্রতিরোধে সচেতনতাই সবচেয়ে বড় পন্থা। আপনি আপনার খাদ্যাভাস, পানি পান, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা সর্বোপরি ব্যক্তিগত পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে সচেতন হলে পেটের পীড়া থেকে মুক্ত হতে পারবেন।

**************************
অধ্যাপক মবিন খান
লেখকঃ চেয়ারম্যান, লিভার বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
দৈনিক ইত্তেফাক, ৩১ মে ২০০৮