হৃদরোগ আর কোলেস্টেরল এ দুটো শব্দের সাথে আমরা সবাই কমবেশী পরিচিত। বলা যায়, এ দুটো শব্দ একে অপরের পরিপূরক। একটি ছাড়া আরেকটি প্রায় অসম্পূর্ণ। হ্নদরোগ বা হার্টের যে কোন রোগের অন্যতম প্রধান কারণ দেহে কোলেস্টেরোলের আধিক্য, অত্যধিক দুশ্চিন্তা ও অতিমাত্রায় চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণ। ডিমের কুসুম, যকৃত, মস্তিষ্ক, চর্বিযুক্ত মাংস, দুগ্ধ, চিংড়ি প্রভৃতিতে প্রচুর পরিমাণে কোলেস্টেরোল রয়েছে। সাধারণত মানবদেহে ১০০ মিঃলিঃ রক্তে ১৫০-২০০ মিঃলিঃ কোলেস্টেরল থাকে। রক্তে এই কোলেস্টেরোলের মাত্রা বেড়ে গেলে তা ধীরে ধীরে হৃদরোগের সৃষ্টি করে। খাদ্যে কোলেস্টেরোলের মাত্রা বৃদ্ধি পেলে এথেরোসক্লেরোসিস হয়। যার ফলে ধমনীর গাত্রে একরকম আঠরি সৃষ্টি হয় এবং ধমনীর পথ সরু হতে থাকে। কোলেস্টেরোল রক্তকে ভারি করে দেয় এবং কৌশিক জালিকার গায়ে জমা হয়ে নালীপথ সরু করে দেয়। ফলে সেই পথে রক্ত চলাচল ব্যাহত হয় এবং প্লাক তৈরী করে। এ কারণে রক্ত চলাচল বন্ধ হলে হ্নদযন্ত্রের কিছু অংশ নষ্ট হয়ে যায় এবং হৃদপিণ্ডের কার্য বন্ধ হয়ে মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

দেহে অতিরিক্ত কোলেস্টেরোলের সুবিধা-অসুবিধাঃ

দেহে কোলেস্টেরোল আধিক্যের সুবিধার চেয়ে অসুবিধাই বেশী। কোলেস্টেরোল এক প্রকার চর্বি জাতীয় পদার্থ, যা শরীরের বিভিন্ন অংশে জমা থাকে এবং দেহের অভ্যন্তরীণ নানা ক্রিয়াকলাপে সহায়তা করে। কিন্তু যখনই এর মাত্রা বেড়ে যায় তখনই এটা ভয়াবহ রূপ ধারণ করে
(১) হৃদরোগ এথোরোসক্লেরোসিস, উচ্চ রক্তচাপ প্রভৃতি দেখা হয়।
২) এটি শরীরকে ভারি করে, ওজন এবং স্থূলতা বৃদ্ধি করে। ফলে যে কোন কাজ করতে কষ্ট হয়, শরীর একটুতেই হাঁপিয়ে ওঠে, বাহ্যিক সৌন্দর্য নষ্ট হয় এবং মনে অশান্তি দেখা দেয়।
৩) দেহে কোলেস্টেরোলের আধিক্যের ফলে যেসব রোগ হয় তা অনেক সময় মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এজন্য সকলেরই কোলেস্টেরোল গ্রহণের পরিমাণ সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।

দেহের অতিরিক্ত কোলেস্টেরোল কমানোর কিছু সহজ উপায়ঃ দেহের কোলেস্টেরোলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা খুবই সহজ, শুধু প্রয়োজন সামান্য সচেতনতা। -তেল বা চর্বি জাতীয় খাদ্যগুলো খুবই মুখরোচক, কিন্তু এগুলোই শরীরের জন্য সবচেয়ে বেশী ক্ষতিকর। তেল জাতীয় বা ভাজা-পোড়া জিনিস কম খাবেন। চিংড়ি মাছ, ডিমের কুসুম প্রভৃতি উচ্চ কোলেস্টেরোলযুক্ত খাবার চেষ্টা করবেন পরিহার করতে। -দৈনিক খাদ্য তালিকায় একটু করে হলেও আঁশ জাতীয় খাদ্য রাখার চেষ্টা করুন। আঁশ জাতীয় খাদ্য যেমনঃ ইসুবগুল, কচুর লতি, ডাঁটা, বিভিন্ন শাক প্রভৃতি। এগুলো রক্তের কোলেস্টেরোল ও LDL কমাতে সাহায্য করে। -দৈনিক ব্যায়াম করবেন, না পারলে অন্তত এক ঘন্টা হাঁটার অভ্যাস করুন। ব্যায়াম করলে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক হয়। ফলে হ্নদরোগের ঝুঁকি কিছুটা কমে। ওজন কমাতে চেষ্টা করুন। -চিনি বা মিষ্টি জাতীয় খাবার যত পারবেন কম খাওয়ার চেষ্টা করুন। মিষ্টি জাতীয় খাবার দেহে শক্তি যোগায়। ফলে দেহে এর প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু অধিক পরিমাণে গ্রহণ করলে তা নানারূপ সমস্যার সৃষ্টি হয়। -বেশি বেশি ভিটামিন সি বা টক জাতীয় খাবার খাবেন। টক জাতীয় খাদ্যে কোলেস্টেরোল কমাতে জাদুর মত কাজ করে। -অনেকেরই ধারণা মাছের তেল কোলেস্টেরোল বাড়ায়। কিছু কিছু মাছের তেল রয়েছে যেগুলো রক্তের কোলেস্টেরোলের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। যাদের দেহে চর্বি বেশি, তাদের মাছের তেল খেতে দিলে ৬৮% কোলেস্টেরোল কমে। উদ্ভিদজাত তেল অনেক সময় কোলেস্টেরোল হ্রাস করে। ফালমন মাছের তেল খেলে ৪২% কোলেস্টেরোল কমে যায়। -বিভিন্ন গাছন্ত ওষুধ খেতে পারেন যেমন-অর্জুনের ছাল, চিরতা, এগুলোও কোলেস্টেরোল কমাতে সাহায্য করে। -প্রচুর পরিমাণে ফলমূল ও শাক-সবজি খাবেন। দেহের কোলেস্টেরোল কমাতে এ দুটোর বিকল্প আর কিছু নেই। বেশি বেশি শসা খাবেন। শসা খুবই উপকারী দেহের ওজন হ্রাস করতে, কোলেস্টেরোল কমাতে। -এখন রক্তে কোলেস্টেরোল কমানোর নানারকম এন্টিবায়োটিক রয়েছে, যেগুলোর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া রয়েছে। তবে নানারকম হারবাল ওষুধ সেক্ষেত্রে বেশ ফলদায়ক। হঠাৎ রক্তে কোলেস্টেরোলের মাত্রা বেড়ে গেলে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। অনেকে খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দেয়। এটা শরীরের জন্য আরও বেশি ক্ষতিকর। পরিমিত পরিমাণে দেহের চাহিদা মিটিয়ে খাদ্য গ্রহণ করে, সামান্য ব্যায়াম ও নিয়ম মেনে চলে ধীরে ধীরে খুব সহজেই এই কোলেস্টেরোলের মাত্রা কমিয়ে আনা যায়। তবে চেষ্টা করবেন যতদূর সম্ভব কম কোলেস্টেরোলযুক্ত খাদ্য গ্রহণ করতে।

**************************
দৈনিক ইত্তেফাক, ৩১ মে ২০০৮