স্বাস্থ্যকথা - http://health.amardesh.com
ক্রনিক আমাশয় বা আইবিএস
http://health.amardesh.com/articles/574/1/aaaaaa-aaaaa-aa-aaaaaa/Page1.html
Health Info
 
By Health Info
Published on 10/30/2012
 
এক তরুণের বয়স ২২। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। বেশ কিছু দিন ধরে এক জটিল রোগে আক্রান্ত, যা তার পড়াশোনা ও জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করছে। ছয় মাস ধরে তিনি আমাশয়ে ভুগছেন। দিনে চার-পাঁচবার টয়লেটে যেতে হয়। তলপেটে ব্যথা হয়, পায়খানার সাথে মিউকাস বা আম যায়। টয়লেট থেকে আসার পরও মনে হয় পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি এবং মাঝে মাঝে পায়খানার সাথে রক্ত যায়। এসব সমস্যার জন্য নিজে নিজে অনেক ওষুধ খেয়েছেন এবং অনেক ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়েছেন। অনেক রক্ত পরীক্ষা ও অন্যান্য পরীক্ষা করা হয়েছে। কিন্তু অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। ফলে তিনি খুবই চিন্তিত হয়ে পড়েন। তিনি ভাবতে থাকেন এ সমস্যার কি কোনো সমাধান নেই নাকি এটা পায়ুপথের কোনো জটিল সমস্যা, না ক্যান্সার? ওপরের বর্ণনা থেকে আপনারা অনেকেই হয়তো ভাবছেন এটা কী ধরনের রোগ? এর কি কোনো চিকিৎসা এ দেশে নেই?

ক্রনিক আমাশয় বা আইবিএস

এক তরুণের বয়স ২২। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। বেশ কিছু দিন ধরে এক জটিল রোগে আক্রান্ত, যা তার পড়াশোনা ও জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করছে। ছয় মাস ধরে তিনি আমাশয়ে ভুগছেন। দিনে চার-পাঁচবার টয়লেটে যেতে হয়। তলপেটে ব্যথা হয়, পায়খানার সাথে মিউকাস বা আম যায়। টয়লেট থেকে আসার পরও মনে হয় পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি এবং মাঝে মাঝে পায়খানার সাথে রক্ত যায়। এসব সমস্যার জন্য নিজে নিজে অনেক ওষুধ খেয়েছেন এবং অনেক ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়েছেন। অনেক রক্ত পরীক্ষা ও অন্যান্য পরীক্ষা করা হয়েছে। কিন্তু অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। ফলে তিনি খুবই চিন্তিত হয়ে পড়েন। তিনি ভাবতে থাকেন এ সমস্যার কি কোনো সমাধান নেই নাকি এটা পায়ুপথের কোনো জটিল সমস্যা, না ক্যান্সার? ওপরের বর্ণনা থেকে আপনারা অনেকেই হয়তো ভাবছেন এটা কী ধরনের রোগ? এর কি কোনো চিকিৎসা এ দেশে নেই?

এ রোগটির নাম Irritable Bowel Syndrom (IBS)বা সহজ বাংলায় যাকে বলে মানসিক অস্থিরতাজনিত আমাশয় রোগ। জেনারেল প্র্যাকটিশনার থেকে শুরু করে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে পরিপাকতন্ত্রের এই সমস্যা নিয়ে প্রচুর রোগী আসেন। পরিপাকতন্ত্রের এই বিশেষ রোগ নিয়ে গবেষণার কোনো অন্ত নেই। কিন্তু আজ পর্যন্ত এই রোগের কোনো স্বীকৃত কারণ পাওয়া যায়নি। এ জন্য একে Functional disorderও বলা হয়।

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯-১২ শতাংশ এই রোগে আক্রান্ত। পুরুষ বা মহিলা যে কেউই এই রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। অনুপাত ১০:১১। এই রোগের কোনো নির্দিষ্ট বয়সসীমা নেই। যেকোনো বয়সের যে কেউ এই রোগে আক্রান্ত হতে পারেন।

IBSরোগের নির্দিষ্ট কোনো কারণ জানা না গেলেও বিজ্ঞানীরা বেশ ক’টি ব্যাপারকে এ রোগের জন্য দায়ী বলে মনে করেন। যেমন, মানসিক কারণ, পরিপাকতন্ত্রের পরিবর্তিত চলাচল, পরিপাকতন্ত্রের প্রসারণ সংক্রান্ত জটিলতা ইত্যাদি। এসব কারণের মধ্যে ৫০ শতাংশ রোগীই মানসিক সমস্যায় ভোগেন। যেমনঃ উত্তেজনা, দুশ্চিন্তা, অবসাদগ্রস্ততা, ভয় পাওয়া, মানসিক বিপর্যস্ততা ইত্যাদি। পরিপাকতন্ত্রের পরিবর্তিত আচরণ আরেকটি উল্লেখযোগ্য কারণ।

এই রোগে যেসব উপসর্গ দেখা দেয় তাদের আমরা দু’টি ভাগে ভাগ করতে পারি। একটি হলো পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা, অন্যটি হলো অন্যান্য শারীরিক সমস্যা। পরিপাকতন্ত্রের সমস্যাগুলো হলো তলপেটে ব্যথা, যা টয়লেটে যাওয়ার পর কমে যায়, পেট ফুলে ওঠা। IBSরোগীরা দুই ধরনের সমস্যা নিয়ে ডাক্তারদের কাছে আসতে পারেন। একধরনের রোগীরা আসেন ডায়রিয়াজনিত সমস্যা এবং অন্য ধরনের রোগীরা আসেন কোষ্ঠকাঠিন্যজনিত সমস্যা নিয়ে। আবার অনেক রোগী আসেন যাদের এই দুই ধরনের সমস্যাই থাকে। যেসব রোগী ডায়রিয়াজনিত সমস্যা নিয়ে আসেন তারা প্রায়ই ঘন ঘন টয়লেটে যাওয়া, পরিষ্কারভাবে পায়খানা না হওয়া, আম যাওয়া ইত্যাদি উপসর্গের কথা বলেন। আর যারা কোষ্ঠকাঠিন্য, পায়খানার রাস্তায় ব্যথা ও পেটে ব্যথা এসব সমস্যায় ভোগেন। ওইঝ-এর অনেক রোগী অনেক সময় মলদ্বারের বিভিন্ন জটিল রোগে ভুগে থাকেন। ওইঝ-এর বেশিরভাগ মহিলা ও পুরুষ রোগী আবার এনাল ফিশার রোগে ভুগে থাকেন। অনেকে পাইলস রোগে আক্রান্ত হন। এনাল ফিশার বা পাইলস রোগে আক্রান্ত হলে পায়খানার রাস্তা দিয়ে রক্ত যেতে পারে। পায়খানার রাস্তা ফুলে উঠতে পারে, পায়খানার পর জ্বালা-যন্ত্রণা বা ব্যথা করতে পারে। অথবা পায়খানার রাস্তা বের হয়ে আসতে পারে। উপসর্গের ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য যে, রোগীর বিশেষ ধরনের খাবার খাওয়ার পর রোগের উপসর্গ প্রকটভাবে দেখা দেয়। বেশ কিছু খাবার রয়েছে যেমনঃ গরুর দুধ, গোশত, চিংড়িমাছ, তৈল জাতীয় খাবার বা মসলাবহুল খাবার। এসব খাবার খেলে রোগীদের পেট ব্যথা, পাতলা পায়খানা দেখা দেয়।

IBSরোগ নিরূপণের জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয়। যেমন­ রক্ত পরীক্ষা, মলদ্বারে বিশেষ ধরনের যন্ত্রের মাধ্যমে পরীক্ষা (কলোনস্কোপি, সিগময়ডোস্কপি), বিশেষ এক্স-রে করা যেতে পারে। কলোনস্কোপি, সিগময়ডোস্কপি অবশ্যই বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের মাধ্যমে করানো উচিত। কারণ অনেক সময় মলদ্বার ও বৃহদান্ত্রের ক্যান্সার রোগীরাও একই ধরনের উপসর্গ নিয়ে ডাক্তারের কাছে আসতে পারেন। বিশেষ ধরনের পরীক্ষার মধ্যে রয়েছে থাইরয়েড হরমোন পরীক্ষা, মল পরীক্ষা, দুধ সহ্যক্ষমতা পরীক্ষা ইত্যাদি।

IBSরোগরে চিকিৎসার অন্যতম প্রধান ধাপ হলো রোগীকে আস্বস্ত করা। বেশিরভাগ রোগীই মনে করেন তাদের ক্যান্সার হয়েছে। এ ব্যাপারে তারা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। ফলে তাদের রোগের উপসর্গ আরো প্রকট হয়ে ওঠে। প্রত্যেক রোগীকে অবশ্যই যথেষ্ট সময় দিতে হবে। ধৈর্যসহ তাদরে সব সমস্যার কথা শুনতে হবে, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। তাদের বুঝতে হবে যে এটা দেহের কোনো অঙ্গের রোগ নয়, এটা অনেকটা মানসিক অস্থিরতা ও অন্ত্রের উল্টাপাল্টা আচরণের ফল। যেসব রোগী এসব উপদেশের পরও আশ্বস্ত না হন কেবল তাদের ক্ষেত্রেই চিকিৎসা প্রয়োজন হয়।

প্রত্যেক রোগীর খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রা সম্পর্কে ইতিহাস নিতে হবে। যেসব রোগী কোষ্ঠকাঠিন্য ধরনের IBSরোগরে বর্ণণা দেবেন, তাদের ক্ষেত্রে খাদ্যে যথেষ্ট পরিমাণ আঁশাযুক্ত খাবার আছে কি না, নিয়মিত ব্যায়াম করেন কি না এবং টয়লেটে যথেষ্ট সময় দেন কি না এ ব্যাপারে ইতিহাস নিতে হবে। এসব রোগীকে খাদ্যে আঁশযুক্ত খাবার বেশি করে খেতে বলতে হবে, যেন কোষ্ঠকাঠিন্য কমে আসে। অন্য দিকে যেসব রোগীর ডায়রিয়াজনিত IBSথাকে তাদের খাদ্যের তালিকা থেকে অতিরিক্ত শর্করা জাতীয় খাবার, ফল, চা ইত্যাদি কম করে খেতে বলতে হবে। এ ছাড়াও যেসব খাবার খেলে (যেমন­ দুধ, পোলাও ও চিংড়ি) যাদের সমস্যা হয়, তা খাদ্য তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে, দুধ বা দুধজাতীয় খাবার বাদ দিলে তারা বেশ ভালো থাকেন।

যেসব রোগীকে তার রোগ সম্পর্কে পুরোপুরি বুঝিয়ে বলা এবং আশ্বস্ত করার পরও উপসর্গ পুরোপুরি না যায়, কেবল তাদের ক্ষেত্রে ওষুধ ব্যবহার করা হয়। এসব ওষুধের বেশিরভাগই তল পেটের ব্যথানাশক এবং অবসাদ, হতাশা দূর করার ওষুধ।
যেসব রোগীর খুব ঘন ঘন বাথরুমে যেতে হয় বা পায়খানা এলে ধরে রাখতে পারেন না, কেবল তাদের ক্ষেত্রে ডায়রিয়া প্রতিরোধকারী ওষুধ প্রয়োগ করতে হয়। কোষ্ঠকাঠিন্য ধরনের IBSরোগীদের ক্ষেত্রে আঁশজাতীয় খাবারের পাশাপাশি ইসবগুলের ভূসি খাবার জন্য উপদেশ দেয়া হয়।

অনেক রোগী, যার ওইঝ-এর পাশাপাশি মলদ্বারে বিভিন্ন সমস্যা যেমন এনাল ফিশার বা পাইলস বা মলদ্বার বের হয়ে আসা রোগে আক্রান্ত হয় তাদের অবশ্যই বৃহদন্ত্র ও মলদ্বারের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশই সব ধরনের উন্নত চিকিৎসার প্রচলন রয়েছে। 

**************************
অধ্যাপক ডা. এ কে এম ফজলুল হক
লেখকঃ বৃহদন্ত্র ও পায়ুপথ সার্জারি বিশেষজ্ঞ
চেয়ারম্যান, কলোরেকটাল সার্জারি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা। জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হসপিটাল, ৫৫ সাতমসজিদ রোড, ধানমন্ডি, ঢাকা।