অসচেতন ও অন্যমনস্ক হয়ে আমরা অনেকেই আমাদের দাঁতের অনেক ক্ষতি করে থাকি। এমন অনেকগুলো অভ্যাস আছে যা প্রত্যক্ষভাবে দাঁতের ক্ষতি না করলেও দাঁতের রোগ সৃষ্টিতে সাহায্য করে থাকে। এমনই একটি বদঅভ্যাস হচ্ছে ব্রুক্সিং, যাকে আমরা গাইন্ডিং বা ক্লিচিংও বলে থাকি। অসচেতন অবস্হায় উপরের ও নিচের দাঁত দিয়ে পরস্পরকে ঘর্ষণ করার প্রক্রিয়াই হচ্ছে ব্রুক্সিং। সাধারণ অর্থে যাকে বলা হয় দাঁত কিড়মিড় বা দাঁত খিঁচানি। আমরা অনেকেই এক বা একাধিকবার এই ব্রুক্সিং করে থাকি। অন্যমনস্ক কোনো কারণে চিন্তিত কিংবা মেজাজ খারাপ থাকলে এটি আমরা বেশি করে থাকি। ঘুমন্ত অবস্হায় আমরা অনেকে ব্রুক্সিং বা দাঁত কিড়মিড় করে থাকি। এটিকে নাইট গ্রাইল্ডিং বলা হয়। ব্রুক্সিং আমাদের দাঁতের জন্য কতটা ক্ষতিকর আসুন তা ধাপে ধাপে জেনে নেয়া যাক।

ব্রুক্সিং বা দাঁত কিড়মিড় টুথ-ডিকে অর্থাৎ দন্ডক্ষয় রোগের প্রবণতাকে বাড়িয়ে তোলে। উপরের ও নিচের দাঁতের ঘর্ষণে ক্রমাগত দাঁতের ক্ষয় হতে থাকে। অনবরত ব্রুক্সিং-এর ফলে ডেন্টাল ডাক্তার দ্বারা চিকিৎসা হয়ে থাকলে আপনার দাঁতের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। অত্যধিক ঘর্ষণে ফিলিং করা দাঁতের বিভিন্ন অংশে ফ্র্যাকচার বা ফাটল দেখা দিতে পারে। অবশেষে যা দন্তক্ষয় রোগে পরিণত হয়।

ব্রুক্সিং বা দাঁত কিড়মিড় দাঁতের পেরিওডোন্টাল রোগ অর্থাৎ প্ল্যাকজনিত সমস্যার জন্য মারাত্মক। এর কারণে পেরিওডোন্টাল লিগামেন্ট মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হয় এবং প্ল্যাক অর্থাৎ দাঁতে ময়লা দ্রুত জমতে থাকে। ব্রুক্সিং-এর কারণে দাঁতের স্পর্শকাতরতা বেড়ে যায়। পেরিওডোন্টাল লিগামেন্ট চাপ পড়ার ফলেই এটি হয়ে থাকে। আর তাই ঠান্ডা কিছু খাওয়ার সময় হঠাৎ করে দাঁত শিরশির করে ওঠে। এটি দাঁতের একটি স্পর্শকাতরতামুলক সমস্যা; যাতে আমরা অনেকেই ভুগে থাকি। অনবরত ব্রুক্সিং-এর ফলে দাঁতের প্রচন্ড ব্যথা হতে পারে।

ব্রুক্সিং-এর কারণে দাঁতে অসংখ্য অদৃশ্য কিন্তু ক্ষতিকর ক্র্যাক বা দাগ দেখা দেয়। এ সমস্যাকে ক্র্যাকড টুথ সিমড্রম বলা হয়। ব্রুক্সিং দাঁতের স্বাভাবিক কাজের ক্ষমতাকে হ্রাস করে ফেলে। ফিলিং, ক্রাউন, ইমপ্লান্ট অর্থাৎ চিকিৎসাকৃত দাঁতের ক্ষতি হয় সর্বাধিক। অত্যধিক ব্রুক্সিং-এর কারণে দাঁত অনেক সময় ভেঙে যায়, যা খুবই মারাত্মক। ব্রুক্সিং বা দাঁত কিড়মিড় দাঁতের মাঢ়ির চারদিকে চাপ প্রয়োগ করে দাঁতের গঠনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে থাকে। একে অ্যাবফ্যাকশন বলে। এর ফলে মাঢ়িজনিত সমস্যার কারণে দাঁত অনেক দুর্বল হয়ে যায়। এ দুর্বল দাঁতে যখন খুব দ্রুত ব্রাশ করা হয় তখন দাঁতের গঠনকে আরো ক্ষতিগ্রস্ত ও দুর্বল করে তোলে।

ব্রুক্সিং বা দাঁত কিড়মিড় দাঁতের সুস্হতাকে নষ্ট করে দেয়। এটি কোনো রোগ নয়, তবে এ থেকেই টুথ-ডিকে, প্ল্যাক, ক্র্যাকড টুথ-সিনড্রমসহ দেখা দেয় বিভিন্ন দাঁতের রোগ। এহেন বদঅভ্যাস আমাদের অনেকেরই আছে। ঘুমের মধ্যে যারা এ কাজটি করে থাকেন তারা ডেন্টাল ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে ব্যবহার করতে পারেন ব্রুক্সিং গার্ড, যা এক ধরনের প্লাস্টিকের তৈরি অ্যাপল্যায়েস। তবে এটি কোনো স্হায়ী সমাধান নয়। এর জন্য সবার আগে ব্রুক্সিং-এর ব্যাপারে আমাদের সচেতন হতে হবে। প্রতিদিন মনে করে যেভাবে আমরা দাঁত ব্রাশ করি, তেমনি করে মনে রাখতে হবে ব্রুক্সিং-এর অপকারিতার কথা। আপনি নিজে এই বদঅভ্যাস থেকে বিরত থাকুন এবং আপনার জানামতে অন্য কেউ যদি এই অভ্যাসে অভ্যস্হ থাকে তবে তাকে নিষেধ করুন। ব্রুক্সিং বা দাঁত কিড়মিড় থেকে সৃষ্ট যে কোনো দাঁতের সমস্যায় দ্রুত একজন অভিজ্ঞ ডেন্টাল ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করুন।

**************************
ডা. আওরঙ্গজেব আরু  
আমার দেশ, ৩ জুন ২০০৮