সুস্থ পারিবারিক জীবন মানে এমন একটি জীবন যেখানে জীবনের মৌলিক চাহিদাগুলো খুব সুন্দর, সহজ ও স্বাভাবিকভাবে পূরণ করা যায়। টানাপড়েনের সঙ্ঘাতে জীবন এখানে খুঁড়িয়ে চলে না। তাই সুস্থ পারিবারিক জীবন গঠনে এমন একটি জীবনের কথা চিন্তা করতে হবে, যেখানে জীবন অর্থাভাবে, স্থানাভাবে ও চিকিৎসার অভাবে ভারাক্রান্ত নয়।

আর এরকম সুস্থ বা স্বাস্থ্যকর জীবন গঠনের মূলকথা হলো পরিবার পরিকল্পনা সঠিক পথটি সময়মতো বেছে নেয়া। যেমন ধরুন, আপনারা নববিবাহিত দম্পতি বিয়ের পরপরই সন্তানের বোঝা নিতে চাচ্ছেন না, নতুন জীবনের সুমধুর, আস্বাদে দিন কত নিশ্চিন্তে নির্ভাবনায় অতিবাহিত করার জন্য চাই একটি উত্তম পরিবার পরিকল্পনা পন্থা। মনে করুন, একটি উন্নতমানের আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত বাড়ি এ সময়ে আপনাকে দিতে পারে সেই কাঙ্ক্ষিত সুখ ও স্বস্তি বা এমন হতে পারে যে বর্তমানে আপনার আর্থিক অবস্থা আরো একটি সন্তান লালন পালন করার অনুকূলে নয়, অনাবশ্যক একটি সন্তানের বোঝা বাড়িয়ে সংসারে অভাব ও অনটনকে টেনে আনার কোনো মানে হয় না­ এ অবস্থায় আপনি আগ থেকেই সতর্ক হোন যাতে আপনার গর্ভে অনভিপ্রেতভাবে সন্তান জন্ম না নেয়।

আপনি মা হবেন। মাতৃত্ব প্রত্যেক নারীর পরম কাম্য ও চরম সাধনার জিনিস। তাই সেই পাওয়া আপনার জন্য শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা এবং সৌভাগ্যের কারণ হয়ে আসুক, অনভিপ্রেতভাবে নয়।

ধরুন, আপনি একটি সন্তানের মা হয়েছেন, আপনার নিজের শরীর সুস্থ রাখার জন্য ও শিশুটির স্বাস্থ্য রক্ষার্থেও পবিরারের সবার সুষ্ঠুভাবে দেখাশোনা ও যত্নের সুবিধার্থে আপনি দ্বিতীয় সন্তানটি অন্তত তিন বছর পর নিন।

অথবা এমন হতে পারে যে, আপনার দু’টি সন্তান হয়েছে, আপনার স্বামী একজন সরকারি কর্মচারী, সীমিত আয়ে সুন্দর করে সংসার গড়ার দায়িত্ব আপনার ওপর­ এর ওপর বাড়তি চাপ, প্রায় সংসারে হয়তো স্বামীর বা আপনার মা আছেন, দু-একটি ভাইবোন থাকাটাও খুব স্বাভাবিকের মধ্যেই আপনাকে মানিয়ে চলতে হবে। সুন্দরভাবে জীবনকে গড়তে হবে। স্বামী তো মাসশেষে টাকা এনে আপনার হাতে তুলে দিয়েই খালাস, সুতরাং আপনি সচেতন হোন। পরিবার পরিকল্পনার পদ্ধতি গ্রহণ করে সংসারকে ছোট রাখুন। দেখবেন সীমিত আয়ের মধ্যেও আপনি সুন্দর করে গুছিয়ে সংসার চালাতে পারবেন।

এরপর বিপরীতটি চিন্তা করুন। আপনি বছর বছর সন্তান ধারণ করছেন, একটি কোলে, একটি কাঁধে আর একটি মাত্র হাঁটতে শিখেছে এবং এদের বড় আরো পাঁচটি ছেলেপুলে আছে, সংসারে নুন আনতে পাস্তা ফুরায়, তার ওপর অসুখ-বিসুখ আছে, খাওয়াটা ভালো করে জোটে না, তো ডাক্তার আর চিকিৎসার খরচ আসে কোত্থেকে। অথচ দেখুন এ অবস্থাটা আপনি ও আপনার স্বামী খুব সহজেই এড়িয়ে যেতে পারেন পরিকল্পিত পরিবার পদ্ধতির মাধ্যমে।

এখন জানতে হবে কী কী আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে পরিবার পরিকল্পনা করা যেতে পারে। আপনি যদি নববিবাহিত দম্পতি হোন তবে খাবার বড়িই উৎকৃষ্ট পন্থা। একটি ভুল ধারণা আছে যে, খাবার বড়ি খেলে ভবিষ্যতে সন্তান না হওয়ার আশঙ্কা থাকে কিন্তু এটা সম্পূর্ণ ভুল। খাবার বড়ি খাওয়া ছেড়ে দেয়ার পর আপনার গর্ভ সঞ্চার হবে।

আপনার যদি একটি সন্তান থাকে আপনি স্থায়ী বন্ধ্যাকরণ পদ্ধতি বা টিউবেকটমি করাতে পারেন নতুবা আপনার স্বামীকে ভেসেকটমি করাতে পারেন। এই টিউবেকটমি বা ভেসেকটমির কোনো সাইড ইফেক্ট বা জটিলতা নেই। এ রকম শুধু আপনার অনভিপ্রেত ইচ্ছার বিরুদ্ধে সন্তান হবে না। কিন্তু আপনার স্বাস্থ্য ভালো থাকবে, মাসিক ঋতুস্রাব নিয়মিত হবে, এমনকি আপনার যৌন ক্ষমতা সম্পূর্ণ অটুট থাকবে।

আপনি আজই পরিবার পরিকল্পনার যেকোনো একটি পদ্ধতি বেছে নিন এবং সুস্থ পারিবারিক জীবন গঠনে সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসুন।

*********************************
লেখকঃ চেয়ারম্যান, প্রসূতিবিদ্যা ও স্ত্রীরোগ বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

দৈনিক নয়াদিগন্ত, ২১ অক্টোবর ২০০৭  এ প্রকাশিত