গত কয়েক দশক ধরে অ্যাজমা এবং দৈহিক স্খূলতার সংখ্যা বেড়ে চলেছে। এই প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে উচ্চবর্গের মানুষের মধ্যে। সে কারণেই বিভিন্ন পর্যায়ে গবেষণা ও সমীক্ষা চালানো হচ্ছে এই দু’টির মধ্যে কোনো সুনির্দিষ্ট সম্পর্ক আছে কি না তা খুঁজে বের করার জন্য।

দৈহিক স্খূলতা বৃদ্ধির প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে সেসব মানুষের মধ্যে যারা কায়িকশ্রমের বদলে মানসিক শ্রমে নিয়োজিত থাকেন বেশি এবং খাদ্যাভাসে যাদের রয়েছে নিয়ন্ত্রণহীনতা। অন্যদিকে অ্যাজমা রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণ হিসেবে ধারণা করা হচ্ছে, ইনডোর অর্থাৎ ঘরের মধ্যে বেশি সময় কাটানোকে, যার ফলে সেই ব্যক্তি ধুলোর জীবাণু, পোষা প্রাণীর বর্জ্য এবং ছত্রাকের মুখোমুখি হচ্ছেন বেশি। সেই সাথে শারীরিক পরিশ্রমের অভাব।
যদিও কিছু ঝুঁকিপূর্ণ বিষয় খুঁজে পাওয়া গেছে, যেগুলো অ্যাজমা ও স্খূলতার আন্ত:সম্পর্কের দিকে ইঙ্গিত করছে, তবে সবচেয়ে বেশি গবেষণা চলছে এই দু’টির মধ্যে কোনো জেনেটিক সংযোগ আছে কি না তা খুঁজে বের করার জন্যই। বডি মাস ইনডেক্সের (উচ্চতা ও ওজনের হার) সাথে অ্যাজমায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকির আন্ত:সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া গেছে বলে কয়েকটি সমীক্ষায় দাবি করা হয়েছে।

জার্মান গবেষকরা এক সমীক্ষায় অ্যাজমা ও স্খুলতার মধ্যে সম্পর্ক আছে বলে দাবি করেছেন তবে তারা স্খূলতা ও অ্যালার্জির মধ্যে কোনো সম্পর্ক খুঁজে পাননি। তারা ধারণা করছেন, অ্যাজমা ও স্খুলতার সম্পর্ক জেনেটিক নয়, বরং শারীরিক। বিশেষভাবে তারা মনে করছেন যে, স্খুল ব্যক্তির ফুসফুসকে শরীরের চাহিদা পূরণের জন্য বাড়তি কাজ করতে হয়, ফলে অ্যাজমার সূত্রপাত ঘটে। এই দুই রোগের মধ্যে আন্ত:সম্পর্কের সূত্র এটাই।
স্খূলতার আরেকটি কারণ শারীরিক ব্যায়ামের অভাব। এটিও অ্যাজমার উৎপত্তিতে ভূমিকা রাখে। ব্যায়ামের সময় গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে হয় শ্বাসতন্ত্রের গভীরতম অংশগুলোও সঙ্কোচন-প্রসারণে অংশ নিতে পারে। ফলে তারা শক্তিশালী হয়ে ওঠে ও অ্যাজমা প্রতিরোধ সম্ভব হয়।

দুর্ভাগ্যবশত অনেক কারণ, যারা অ্যাজমা ও স্খূলতা তৈরিতে ভূমিকা রাখে, তারা আবার পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। কখনো কখনো একটি অপরটির প্রকোপ বাড়িয়ে দেয়। যেমন, অনিয়ন্ত্রিত অ্যাজমা ও শ্বাসতন্ত্রের অন্যান্য রোগের শারীরিক পরিশ্রম বন্ধ করতে রোগী বাধ্য হয়। তখন এই কায়িক শ্রমহীনতা আবার অ্যাজমার প্রকোপ প্রতিরোধের শারীরিক সক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
তদুপরি শ্বাসকষ্টের কারণে শিশুরা অধিক সময় ঘরে থাকতে বাধ্য হয়, তাদের শরীরের ক্যালরি ঠিক পরিমাণে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় বা এর ফলে তাদের স্খূলতাতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়।

স্খূলতার সাথে সংশ্লিষ্ট আরেকটি বিষয় অ্যাজমা চিকিৎসায় বিরূপ ভূমিকা পালন করে। তা হচ্ছে বিষাদ বা হতাশা ।

যেসব কিশোর-কিশোরী বেশি স্খূল হয়ে যায়, তারা হীনম্মন্যতায় ভোগে। তাদের আত্মবিশ্বাস কমে যায়। এই হতাশার কারণে অ্যাজমা আক্রান্ত শিশু ঠিকমতো ওষুধ ব্যবহারে অনীহা প্রকাশ করে। ফলে অ্যাজমার প্রকোপ বেড়ে যায়। আবার এই অ্যাজমার আক্রমণে শিশু ঘরে বন্দি থাকতে বাধ্য হয়, তার শারীরিক ব্যায়াম বìধ হয়ে যায়, ফলে তার আরো মোটা হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

অ্যাজমা এবং স্খূলতার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক আছে কি না, সেই বিতর্ক হয়তো আরো কিছুদিন ধরে চলতে থাকবে। এ ব্যাপারে স্খির উপসংহারে পৌঁছানো এখনো সম্ভব হয়নি। তবে এটি অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, শিশুদের মধ্যে ভিডিও গেম ও টেলিভিশন দেখার বেশি প্রবণতা অ্যাজমা ও স্খূলতা­ উভয় রোগেরই প্রকোপ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

*************************
লেখকঃ  ডা. গোবিন্দ চন্দ্র দাস
এলার্জি ও অ্যাজমা রোগ বিশেষজ্ঞ, সিনিয়র কনসালটেন্ট ও বিভাগীয় প্রধান, অ্যালার্জি অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল ইমুনোলজি বিভাগ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, ঢাকা। 

উৎসঃ  দৈনিক নয়াদিগন্ত, ২৫শে নভেম্বর ২০০৭