স্বাস্থ্যকথা - http://health.amardesh.com
ওরে বাবা এ যে ইয়াবা!
http://health.amardesh.com/articles/68/1/aaa-aaaa-a-aa-aaaaa/Page1.html
Daily Prothom Alo
 
By Daily Prothom Alo
Published on 11/26/2007
 
(প্রথম আলো) ইয়াবা’ নিয়ে অনেক আলোচনা চারদিকে| এটি আসলে কী? আমি প্রথম আলো মাদকবিরোধী আন্দোলনের একজন সক্রিয় সদস্য ও উপদেষ্টা | প্রায়ই ভাবি, আমাদের একটা বই থাকা দরকার বা একটা ওয়েবসাইট, যেখানে সব ধরনের মাদকের কুফল সম্পর্কে তথ্য থাকবে|

ওরে বাবা এ যে ইয়াবা!
‘ইয়াবা’ নিয়ে অনেক আলোচনা চারদিকে| এটি আসলে কী? আমি প্রথম আলো মাদকবিরোধী আন্দোলনের একজন সক্রিয় সদস্য ও উপদেষ্টা | প্রায়ই ভাবি, আমাদের একটা বই থাকা দরকার বা একটা ওয়েবসাইট, যেখানে সব ধরনের মাদকের কুফল সম্পর্কে তথ্য থাকবে| ব্যস্ততা বা আলসেমির কারণে এটা এখনো হয়ে ওঠেনি| এ লেখাটা দিয়েই শুরু হোক| ‘ইয়াবা’ বলে দুটো জায়গা আছে পৃথিবীতে একটা লাগোসে, আরেকটা বুরকিনা ফাসোতে|

এ ড্রাগের নাম কিন্তু সেসব জায়গা থেকে আসেনি| থাইল্যান্ডে এ ড্রাগের ব্যবহার ও উৎপাদন বেশি বলে এর নাম থাই ভাষায় ‘ইয়াবা’| এর মানে ক্রেজি মেডিসিন বা পাগলা ওষুধ| অনেকে একে বলে নাজি স্পিড বা শুধু স্পিড| ১৯৭০ সালে এ ওষুধের মূল উপাদান থাইল্যান্ড এবং সারা বিশ্বে নিষিদ্ধ করা হলেও থাইল্যান্ডের ট্রাকচালকদের মধ্যে এর বহুল ব্যবহার ছিল| কারণ ইয়াবা খেলে ঘুম আসে না, রাতভর ট্রাক চালানো যায়| কিছু ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর সবাই টের পেল যে রাতভর ট্রাক চলে বটে, তবে তা পথে নয়, চলে খানাখন্দ আর ব্রিজ ভেঙে নদীতে| একসময় থাইল্যান্ডে এ ড্রাগ পেট্রলপাম্পে বিক্রি হতো|

ইয়াবার মূল উপাদান মেথ্যামফিটামিন| সঙ্গে থাকে উত্তেজক পদার্থ ক্যাফিন| ২৫ থেকে ৩৫ মিলিগ্রাম মেথ্যামফিটামিনের সঙ্গে ৪৫ থেকে ৬৫ মিলিগ্রাম ক্যাফিন মিশিয়ে তৈরি এ ট্যাবলেটের রং সাধারণত সবুজ বা লালচে কমলা হয়ে থাকে| এর নানা রকম ফ্লেভার আছে| আঙ্গুর, কমলা বা ভ্যানিলার স্বাদে একে অনেকে ক্যান্ডি বলে ভুল করবে| এ কারণে এগুলো সহজে পরিবহন ও লুকিয়ে রাখা যায়| এর আকৃতি ড্রিঙ্কিং স্ট্রর ছিদ্রের সমান| স্বাদ-গন্ধ থাকার ফলে বিক্রেতারা সহজেই তরুণ-তরুণীদের এর ব্যাপারে আকৃষ্ট করতে পারে এবং তারা একে ক্ষতিকারক মনে করে না| না করারই কথা| লজেন্স ভেবে অনেকে এটাকে সহজেই খেয়ে নেয়|

এবার জানা যাক মেথ্যামফিটামিনের ইতিহাস| ১৯১৯ সালে জাপানে সর্দি আর নাক বন্ধের ওষুধ হিসেবে এটি ব্যবহার করা হতো| একসময় মেদভঁুড়ি কমানোর জন্যও এ জিনিস ব্যবহার করা হয়েছে| দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান, ব্রিটেন, জার্মানি ও আমেরিকায় সেনাবাহিনীর সদস্যরা জেগে থাকতে এবং ক্লান্তি দূর করতে এটা খেত| যুদ্ধের পর এ ওষুধের বিশাল মিলিটারি স্টক ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের হাতে| ১৯৫০ সাল পর্যন্ত আমেরিকায় এ ড্রাগটা আইনসংগতভাবে তৈরি হতো| পরে ছাত্রছাত্রী, ট্রাকচালক ও অ্যাথলেটরা এর যথেচ্ছ ব্যবহার করতে থাকলে কুফল সম্পর্কে জানা যায়| ১৯৭০ সালে বিশ্বব্যাপী এটা নিষিদ্ধ করা হয়|

এখন এ ড্রাগের সবচেয়ে বেশি উৎপাদন হয় মিয়ানমারে এবং এর বিরাট বাজার হলো থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশ| আমেরিকাসহ পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোও এর ছোবলের বাইরে নেই| দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোতেও এর ব্যবহার বাড়ছে দ্রুত| পার্টি ড্রাগ হিসেবে এর ব্যবহার হয় এবং একসট্যাসি নামের অন্য একটি ড্রাগের সস্তা বিকল্প হিসেবে এটি আমেরিকায় ড্রাগ অ্যাডিক্টদের কাছে প্রিয় হয়ে উঠেছে|

ইয়াবা প্রধানত খায়| অনেকে এটা পাতলা অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল ব্যবহার করে তাপ দিয়ে পুড়িয়ে ধোঁয়া সেবন করে| বেশি আসক্তরা শিরাপথেও এটা নেয়|

ইয়াবার প্রচণ্ড উত্তেজক-ক্ষমতা আছে এবং তা অনেকক্ষণ থাকে বলে কোকেনের চেয়ে অ্যাডিক্টরা এটা বেশি পছন্দ করে| ইয়াবা খেলে সাময়িক আনন্দ ও উত্তেজনা, অনিদ্রা, খিটখিটে ভাব ও আগ্রাসী প্রবণতা বা মারামারি করার ইচ্ছা, ক্ষুধা কমে যাওয়া ও বমি ভাব, ঘাম, কান-মুখ লাল হয়ে যাওয়া এবং শারীরিক সঙ্গের ইচ্ছা বেড়ে যায়| তবে এ সবই অল্প কয়েক দিনের বিষয়| বাড়ে হূৎস্পন্দনের গতি, রক্তচাপ, শ্বাস-প্রশ্বাস এবং শরীরের তাপমাত্রা| মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম রক্তনালিগুলোর ক্ষতি হতে থাকে এবং কারও কারও এগুলো ছিঁড়ে রক্তক্ষরণ শুরু হয়ে যায়| কিছুদিন পর থেকে ইয়াবাসেবীর হাত-পা কাঁপে, হ্যালুসিনেশন হয়, পাগলামি ভাব দেখা দেয়, প্যারানয়া হয়| হ্যালুসিনেশন হলে রোগী উল্টোপাল্টা দেখে, গায়েবি আওয়াজ শোনে| আর প্যারানয়াতে ভুগলে রোগী ভাবে, অনেকেই তার সঙ্গে শত্রুতা করছে| তারা অনেক সময় মারামারি ও সন্ত্রাস করতে পছন্দ করে| কারও কারও শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়, খিঁচুনি হয়| খিটখিটে ভাব, অহেতুক রাগারাগি, ভাঙচুর, নার্ভাসনেসে ভুগতে থাকে ইয়াবা আসক্ত ব্যক্তিরা| 

স্ম্বরনশক্তি কমে যায়, সিদ্ধান্তহীনতা শুরু হয় এবং কারও কারও সিজোফ্রেনিয়ার লক্ষণ দেখা দেয়| অনেকে পাগল হয়ে যায়| লেখাপড়ায় খারাপ হয়ে একসময় ডিপ্রেশন বা হতাশাজনিত নানা রকম অপরাধ প্রবণতা, এমনকি আত্মহত্যাও করে থাকে| হার্টের ভেতরে ইনফেকশন হয়ে বা মস্তিষ্কের রক্তনালি ছিঁড়ে অনেকে মারা যায়| অনেকে মরে রাস্তায় দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে| কেউ কেউ টানা সাত থেকে ১০ দিন জেগে থাকে, তারপর ড্রাগ ওভার ডোজেও মরে যায়|

দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা করলে ইয়াবার আসক্তি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব| তবে শারীরিক ক্ষতি পুরোপুরি সারানো সম্ভব নাও হতে পারে| তাই আসক্ত ব্যক্তিকে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিতে হবে|

ইয়াবার বিস্তার রোধ করতে হলে চাই সামগ্রিক প্রতিরোধ| বন্ধ করতে হবে উৎপাদন ও পরিবহন| থাইল্যান্ড ও মিয়ানমার থেকে এর চোরাচালান আটকাতে হবে| পুল ক্লাব, লাউঞ্জ, বার, এন্টারটেইনমেন্ট ক্লাবগুলোতে কড়া নজরদারি রাখতে হবে| এটার ব্যবহার হয়ে থাকে হৈ-হুল্লোড় করা পার্টিপ্রেমী তরুণ-তরুণীদের মধ্যে বেশি| ইয়াবার কুফল সম্পর্কে তাদের সচেতন করতে হবে| পার্টি করতে হলে কতৃêপক্ষের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে এবং কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে জামিনদার হতে হবে যে এ পার্টিতে কোনো নিষিদ্ধ বস্তুর ব্যবহার ঘটবে না| অনেক অভিভাবক ছেলেমেয়েদের হাতে অনেক টাকা তুলে দেন, এটা বন্ধ করতে হবে| তাদের টাকা দিলে কোথায় খরচ করল তার হিসাব নিতে হবে| আর ড্রাগ ব্যবসায়ী ধরা পড়লে দ্রুত তাকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে| 

**********************************
লেখকঃ প্রথম আলো
উৎসঃ দৈনিক প্রথম আলো, ২৪ অক্টোবর ২০০৭