মনের চাপ কমান দীর্ঘজীবী হোন আমাদের ব্যস্ত জীবনের বুননের মধ্যে অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে মানসিক চাপ, স্বাস্থ্যের ওপর আসে বড় বিপর্যয়-জীবনের ওপরও বটে। মানসিক চাপের প্রভাব চাপের ঝক্কিঝামেলার সময় মানুষ পলায়ন করে বা যুদ্ধ করে, বেঁচে থাকার উদ্দেশ্যে মানুষ স্বয়ং প্রবৃত্ত হয় এসব কাজে। তখন রক্তে বেরিয়ে আসে হরমোন ইপনেফ্রিন বা এড্রিনালিন।

মানসিক চাপ হলে দেহের অন্তঃক্ষরাগ্রন্থি এড্রিনাল গ্লান্ড থেকে নিঃসৃত হয় হরমোন এড্রিনালিন। এখন চাপ হলে বা বিপদে পড়লে মানুষ বেঁচে থাকার জন্য পলায়ন করে বা লড়াই করে, সে জন্য দেহে শক্তির চাহিদা বাড়ে। এ হরমোনের নির্দেশে যকৃতের জমাট শর্করা পরিণত হয় গ্লুকোজে। গ্লুকোজ জোগায় শক্তি। অবশ্য এ দৃশ্যপট ঠিকমতো অভিনীত হয় না এবং বাড়তি রক্তের সুগার যা ব্যবহার হয় না, সেটি চর্বিতে রূপান্তরিত হয়ে জমা হয়।
এভাবে যদি মানুষ ক্রমাগত চাপের মুখোমুখি হয় এবং বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করতে থাকে বা পলায়ন করতে থাকে, তখন দুটি ব্যাপারের মধ্যে একটি ঘটতে পারে।
প্রথমত, বাড়তি সুগারকে শরীর মেদ হিসেবে জমা করতে থাকে এবং আরও সুগার থেকে আরও শক্তি আহরণের চাহিদা বাড়ে। তখন ওজনও বাড়ে শরীরের। মানসিক চাপের একটি নেতিবাচক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলো দেহে ওজন বৃদ্ধি।

দ্বিতীয়টি হলোঃ এসব মানসিক চাপ, টানাপোড়েন, প্রচেষ্টা অনবরত নিঃশেষিত করতে থাকে শরীরের শক্তির উৎস। এসব কারণে অতিরিক্তভাবে শরীর নুয়ে, দুমড়ে পড়তেও পারে। এড্রিনালগ্রন্থি হয়ে পড়ে অবসন্ন, নার্ভ ভেঙে যেতে পারে, দেহ প্রতিরোধব্যবস্থাও ভেঙে পড়তে পারে, তখন রোগের মুখোমুখি হয় মানুষ। এ অন্ধচক্র ঘুরতে থাকে বারবার, এই ইঁদুরদৌড়ের হাত থেকে মুক্ত হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

চাপ কমাতে করণীয় জীবনযাপনে কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাস ঢোকাতে পারলে চাপ থেকে কিছুটা হলেও রেহাই পাওয়া সম্ভব। ক্যাফিন গ্রহণ কমান ক্যাফিন উদ্দীপিত করে এড্রিনালিন হরমোনের ক্ষরণ। এক কাপ কফির বদলে ক্যাফিনমুক্ত হারবাল চা অনেক ভালো। কফির বদলে পান করতে পারেন গ্রিন টি। গ্রিন টিতে ক্যাফিন হলো কফির এক-তৃতীয়াংশ, অথচ এতে রয়েছে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট গুণাগুণ। ধ্যান অভ্যাস করুন ব্যস্ত দিনের শেষে বা টেনশন কমাতে, চাপ কমাতে দৈনিক ধ্যানের অভ্যাস খুবই কার্যকর।

শ্বাসক্রিয়ার চর্চা চাপকে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিন। নির্দিষ্ট ব্যায়াম শরীরকে বিষমুক্ত করতে পারে এবং উজ্জীবিত করে। চীনা গিগং থেকে নেওয়া এ ব্যায়াম অনুসরণ করা যেতে পারে। প্রথমে নিচে নেমে আসা ধীরে ধীরে, এরপর মসৃণ ভ্রমণ এবং প্রতিটি শ্বাসকে গভীর করে তোলা। শরীরের একেকটি অংশ থেকে টেনশন শ্বাসের মাধ্যমে বের করতে থাকুন। প্রথমে মাথার তালু থেকে শুরু করে শরীরের নিচের দিকে যেতে যেতে পায়ের পাতা পর্যন্ত আসুন। পায়ের আঙ্গুল ও পদতল দিয়ে টেনশনকে বেরিয়ে যেতে দিন।

বিশৃঙ্খলা, জঞ্জাল পরিষ্কার করুন অপ্রয়োজনীয় জিনিস, জঞ্জাল থেকে মুক্ত হোন। তা না হলে এগুলো পরিষ্কার করতে এবং বজায় রাখতে শক্তি নিংড়ে নেবে শরীরের। এতে আরও বিশৃঙ্খলা হবে, তালগোল পাকিয়ে যাবে সব, বাড়বে চাপ আরও।

পরামর্শ হলোঃ যেকোনো কিছু, যা ছয় মাস ব্যবহার করেননি, সেগুলো দান করে দিন। কর্মসূচি হালকা করুন অঙ্গীকার হালকা করুন। বেশি থাকলে কমান, সাধ্যমতো একে রাখুন। অবসর সময় পেলে একা সময় কাটান ও রিলাক্স করুন।

দৃষ্টিভঙ্গি পুনর্মূল্যায়ন করুন দিন যাপনের সময় লক্ষ করুন, কী কারণে মনে চাপ পড়ে। আমরা এতে যেভাবে সাড়া দিই, এর ওপর নির্ভর করে কীভাবে এর চাপ পড়বে শরীরে। চাপযুক্ত পরিবেশে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে বদলালে অনেক সময় বিপদকে ভয় পাব না, মন থাকবে শান্ত একে মোকাবিলার জন্য। এভাবে মনের চাপ থাকবে দখলে।

************************************
লেখকঃ
অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরীর কলম থেকে
পরিচালক, ল্যাবরেটরি সার্ভিসেস
বারডেম হাসপাতাল, ঢাকা।
উৎসঃ দৈনিক প্রথম আলো, ১০ অক্টোবর ২০০৭