সমস্যাঃ আমার বয়স ২১ বছর। স্মাতক শেষ বর্ষের ছাত্র। ছোটবেলা থেকেই আমি একটি সমস্যায় ভুগছি। সমস্যাটি হচ্ছে, আমি কারও সঙ্গে যখন কথা বলি, সাবলীলভাবে বলতে পারি না। অনেক সময় এমনও হয়, কেউ আমাকে নাম, বাবার নাম বা অন্য কিছু জিজ্ঞাসা করছে, অথচ আমি বলতে পারছি না। কথা বের হতেই অনেক সময় লেগে যায়। মনে হয়, গলার মধ্যে কথাগুলো আটকে যাচ্ছে। আমি যদি কাউকে কোনো কিছু জিজ্ঞেস করব বা কোনো কিছু বলব ভাবি, সেটাও পারি না। ক্লাসে শিক্ষক যদি কিছু জিজ্ঞেস করেন, আমি যদি সেটা জানিও, বলতে পারি না। এ জন্য ভীষণ লজ্জায় পড়তে হয়। বন্ধুবান্ধবের সঙ্গেও সহজে মিশতে পারি না।

দেলোয়ার, ঠিকানা প্রকাশে অনিচ্ছুক।

পরামর্শঃ আপনি যে সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন, তা মূলত সোশ্যাল ফোবিয়া বা সামাজিক দক্ষতার অভাব। এ ধরনের সমস্যার কারণে অনেকেই নিজেকে প্রকাশ করতে পারে না। যদিও আপনার বুদ্ধিমত্তার অভাব নেই, পড়াশোনাও কম নয় এবং যেকোনো সমস্যার বিশ্লেষণধর্মী সমাধানের ক্ষমতাও আপনার আছে।

সমস্যার মূল কারণ আপনার ব্যক্তিত্বের ধরনের মধ্যেই। আপনি সম্ভবত ছোটবেলা থেকেই যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজেকে প্রকাশ করার সুযোগ পাননি। এর পেছনে হয়তো কিছুটা পারিপার্শিক পরিস্থিতি, সুযোগের অভাব-সব মিলিয়ে আপনার চরিত্র গঠনে এবং আত্মবিশ্বাসী হতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এ থেকে উত্তরণের উপায় মূলত মানসিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বের করতে হবে। ওষুধের ভূমিকা এখানে খুবই কম। সামাজিক দক্ষতা উন্নয়নের জন্য কিছু বিশেষ অনুশীলন করতে হবে। প্রথমত, নিজেকে বিশ্বাস করতে হবে এবং নিজের প্রতি আস্থা রাখতে হবে যে আপনি অন্যদের মতো বা তাদের চেয়ে অনেক ক্ষেত্রেই ভালো।

দ্বিতীয়ত, আপনাকে বুঝতে হবে, আপনি যাদের সঙ্গে মেলামেশা করছেন, তাদের কেউ কেউ আপনার চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান, কেউ হয়তো আপনার চেয়ে কম। তাই আত্মবিশ্বাস নিয়ে আপনি বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে মেলামেশা করুন বা সমস্যাগুলো মোকাবিলা করার চেষ্টা করুন। আসলে আপনি ব্যক্তিত্বের ধরনের কারণে এক ধরনের উদ্বিগ্নতায় ভুগছেন। ফলে যা বলতে চান বা যেভাবে বলতে চান, সেভাবে প্রকাশ করতে পারেন না। যখন পারছেন না, তখনই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন; যদিও জানেন যে আপনার পক্ষে নিজেকে প্রকাশ করা অসম্ভব ছিল না।
এই পরামর্শগুলো থেকে হয়তো রাতারাতি কোনো ফল পাওয়া যাবে না। দীর্ঘদিন থেকে যেটা চলে আসছে, সেটা কাটাতে হলে আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে সামাজিক দক্ষতা বাড়ানোর জন্য সক্রিয়ভাবে চেষ্টা করুন। মনে রাখবেন, নিজেকে বুঝতে ও জানতে হবে; সেটা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। আপনার মধ্যে যে গুণাবলি আছে, সেগুলোকে আরও শক্তিশালী করার জন্য ইতিবাচক গুণাবলিকে সক্রিয়ভাবে প্রকাশের চেষ্টা করুন; আর যেসব নেতিবাচক দিক রয়েছে, সেগুলোকে পরিহার করা সম্ভব না হলে কম গুরুত্ব দিতে চেষ্টা করুন। আপনাকে জানতে ও বুঝতে হবে-আমাদের যেসব দুর্বলতা থাকে, জীবনযুদ্ধে জয়ী হতে হলে আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে সার্বক্ষণিক অনুশীলনের মাধ্যমে সেগুলো অতিক্রম করে নিজেকে প্রকাশের চেষ্টা করা দরকার। প্রথম দিকে যাদের সঙ্গে মেলামেশায় স্বচ্ছন্দ বোধ করেন এবং নিজের মতো চলতে পারেন, তাদের সঙ্গে মেলামেশা করুন এবং যেকোনো বিষয়ে আলোচনা ও মতবিনিময় করুন। মনে রাখবেন, কে কী ভাবল বা মূল্যায়ন করল তা তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আপনি নিজের সম্পর্কে নিজে কী ভাবেন সেটা। নিজের চারদিকে ভালো দিকগুলো প্রকাশে যত্নবান হোন। এবং আপনার মধ্যে যে নেতিবাচক দিক আছে, সেগুলোকে যত্নের সঙ্গে অতিক্রম করার চেষ্টা করুন; তাহলে দেখবেন আপনি যেগুলোকে বড় সমস্যা মনে করছেন সেগুলো অতিক্রম করা মোটেও কষ্টকর হবে না।

*******************************
লেখকঃ অধ্যাপক ডা· হেদায়েতুল ইসলাম
সাবেক পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড রিসার্চ, ঢাকা, গেস্ট টিচার, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
উৎসঃ দৈনিক প্রথম আলো, ১০ অক্টোবর ২০০৭