পৃথিবীতে এইডসের জীবাণু বহনকারী লোকের  সংখ্যা  বেড়েই চলেছে। ধারণা করা হচ্ছে পৃথিবীর চার কোটির বেশি মানুষ এইডসের জীবাণু বহন করছে। রাষ্ট্রসংঘের এইডসবিষয়ক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, বিশ্বে প্রায় ৪ কোটি ৩ লাখ লোক এইচআইভি ধারণ করছে তাদের দেহে। ২০০৫ সালে গত ১০ মাসেই প্রায় ৫০ লাখ মানুষ নতুন করে এইচআইভি দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। এ বছর পৃথিবীতে মোট ৩০ লাখ লোক এইডস রোগ ও এর জটিলতায় মৃত্যুবরণ করেছে। তাদের মধ্যে শিশু ছিল ৫ লক্ষাধিক। প্রতিবেদনে দেখা যায় আফ্রিকা ও সাব সাহারা দেশসমুহে এখনো এইডসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি খুব বেশি। বিশ্বের এইচআইভি বহনকারী মানুষের মোট জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশই বসবাস করে সাব সাহারা দেশসমুহে। ২০০৫ সালে প্রায় ২৪ লাখ এইডস সংশ্লিষ্ট রোগে মারা গেছে। একই সময়ে নতুন করে এইচআইভিতে এ অঞ্চলের প্রায় ৩২ লাখ মানুষ আক্রান্ত হয়েছে।

রাষ্ট্রসংঘের এইডসবিষয়ক কমিটি বর্তমান পরিস্হিতিতে সবিশেষ উদ্বিগ্ন। তারা জানান যে, এর মধ্যেই মধ্য পুর্ব এশিয়ার এইডস মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। ভারত ও পাকিস্তানে এইডস আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। ২০০৩ সালে ভারতে এইচআইভি বহনকারী মানুষের সংখ্যা ছিল ৫১ লাখ। ভারতের তালিমনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ, কর্নাটক ও মহারাষ্ট্রে এইচআইভি সংক্রমণের হার স্হিতিশীল থাকলেও অন্য কয়েকটি রাজ্যে সর্বাধিক ঝুঁকিপুর্ণ হিসেবে চিহ্নিত লোকের সংখ্যা ভয়ংকর রকমভাবে বেড়েই চলেছে। ভারতের নিম্ন আয়ের জনবসতির প্রদেশ উত্তর প্রদেশ ও বিহারের মতো ঘনবসতিপুর্ণ রাজ্যে গর্ভবতী মহিলাদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণের হার এখনো কম। ভারতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিবাহিত মহিলা তাদের স্বামীদের মাধ্যমে এইচআইভিতে আক্রান্ত হচ্ছে। স্বামীরা হরহামেশা পতিতালয়ে গমন করায় যৌন কর্মীদের মাধ্যমে তারা প্রাণঘাতী এইডস রোগের জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে। পাকিস্তানের করাচি শহরে এইডস পরিস্হিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

রাষ্ট্রসংঘের এইডস বিষয়ক কমিটির প্রতিবেদনটি আরো জানায়, পুর্ব এশিয়ার থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার যৌন কর্মী এবং তাদের খদ্দেরদের মাঝে এইচআইভি সংক্রমণের হার কমেছে। একইভাবে উগান্ডার যুবসমাজ, স্পেন ও ব্রাজিলের পাদকসেবী এবং পশ্চিম ইউরোপের সমকামী পুরুষদের এইচআইভি সংক্রমণ কমেছে। শিক্ষা ও জনসচেতনতা এবং প্রতিরোধমুলক কর্মসুচির কারণে এ সাফল্য এসেছে। প্রতিবেদনটি আরো জানায়, এইচআইভি আক্রান্তদের চিকিৎসায় বিশ্বব্যাপী নাটকীয় অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। এখন কেবল উত্তর আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপের ধনী দেশগুলোর জনগণই নয়, অন্যান্য অঞ্চলের মানুষও এ প্রাণঘাতী রোগের ওষুধ ও চিকিৎসা পাচ্ছে। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, চিলি ও কিউবায় এখন শতকরা ৭০ ভাগেরও বেশি এইচআইভি বহনকারী চিকিৎসার আওতায় এসেছে। তবে রাষ্ট্রসংঘের এইডস প্রতিবেদনে বলা হলো যে, বিশ্বের দরিদ্রতম দেশের লোকদের জন্য পরিস্হিতি এখনো ভয়ঙ্কর। বর্তমানে প্রতি দশজনের একজন আফ্রিকান এবং সাতজনের একজন এশীয় এইডসের ওষুধ পাচ্ছে। এ হিসাব এ বছরের মাঝামাঝি পর্যন্ত দেয়া হয়েছে। তবে রাষ্ট্রসংঘের এইডস কমিটির প্রধান বলেছেন যে, এইডসের মতো ভয়ানক, প্রবল বিধ্বংসী, প্রাণঘাতী রোগটির মহামারি ঠেকানোর মতো ব্যাপক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কর্মকান্ড খুবই অপ্রতুল। তিনি বলেন যে, এইচআইভি সংক্রমণ প্রতিরোধের মাত্রা ও আওতা অনেকগুণ বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, আমাদের এ উদ্দেশ্যে স্বল্পমেয়াদি ছোট ছোট প্রকল্প থেকে দীর্ঘমেয়াদি ব্যাপক ভিত্তিক কৌশল গ্রহণ করতে হবে। আমরা এখন পর্যন্ত এইচআইভি মহামারি নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হইনি।

কিছু কিছু সম্প্রদায়ের মানুষের মাঝে নতুন করে  সংক্রমণের হার কমে যাওয়ার এ কথা প্রমাণিত হয়েছে যে, আমরা এইডস বিরোধী সংগ্রামে জিততে পারি। কিন্তু এজন্য আমাদের প্রয়োজন সম্পদ। জনগণের চাপ ও রাজনৈতিক কর্মসুচি। তারা জানান যে, সমকামী পুরুষ-মহিলা ও আফ্রিকানদের মধ্যে নিরাপদ যৌনতা সম্পর্কে প্রচারাভিযান চালাতে অনেক বেশি অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে। ত্রিশ্চিয়ান এইডের কর্মকর্তারা আরো বেশি করে অর্থ এইডসের মতো মহামারি প্রতিরোধে বিনিয়োগের জন্য আহ্বান জানান। তারা জানান যে, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অর্জিত হয়েছে প্রায় ২১০ কোটি পাউন্ড। কিন্তু প্রয়োজন ছিল এর দ্বিগুণের বেশি। তারা অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন যে, পৃথিবীর বিপুল পরিমাণ ঝুঁকিপুর্ণ মানুষকে কিছুসংখ্যক ধনী ও শক্তিশালী দেশগুলোর অঙ্গীকারের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। তারা অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলেন, পৃথিবীর বহু মানুষ প্রায় বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে। বাংলাদেশের মতো নাজুক অর্থনীতি ও অস্হির রাজনীতির দেশের জনগণের ভবিষ্যৎ আরো ভয়ংকর। দিন দিন বেশিসংখ্যক মানুষ এইডসের জীবাণু বহন করছে এবং ঝুঁকিপ্রবণ মানুষের সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। একই সঙ্গে যদি সংক্রমণ রোধের ব্যাপক ও কার্যকর ব্যবস্হা নেয়া না হয় তবে অসংখ্য মানুষকে এ প্রাণঘাতী রোগে মৃত্যুবরণ করতে হবে।

পৃথিবীর এইচআইভি ঝুঁকির সম্মুখীন এক-পঞ্চমাংশ লোকও এইডস প্রতিরোধের মৌলিক স্বাস্হ্যসেবা পাচ্ছে না। এইচআইভি বহনকারী দশ জনের মধ্যে মাত্র একজনকে এ পর্যন্ত চিহ্নিত করা হয়েছে। আর নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে এইচআইভির জীবন রক্ষাকারী ওষুধ যাদের প্রয়োজন তারা মাত্র ১৫% রোগী বর্তমানে পাচ্ছে। ৭৫% রোগী জীবন রক্ষাকারী ওষুধ থেকে বঞ্চিত।

****************************
লেখকঃ ডা. শাহজাদা সেলিম 
উৎসঃ দৈনিক আমার দেশ, ২৭ নভেম্বর ২০০৭