বাংলাদেশে হাজার হাজার মানুষ লিভার, কিডনি, ফুসফুস অকেজো হয়ে মৃত্যুবরণ করে। এক্ষেত্রে রোগীদের উন্নত প্রযুক্তি প্রয়োগ করে সুস্হ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশেই মরণোত্তর কিডনি দান ব্যবস্হা চালু করা সম্ভব। কিডনি অকেজো রোগীদের দেহে প্রতিস্হাপনে এজন্য দেশেই চালু হচ্ছে মরণোত্তর কিডনি দানের ব্যবস্হা। সম্প্রতি চীন-বাংলাদেশ মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে কিডনি ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে শেষ হলো একদিনব্যাপী তৃতীয় জাতীয় সম্মেলন ও বৈজ্ঞানিক সেমিনার। সম্মেলনে বাংলাদেশের বিশিষ্ট নেফ্রোলজি, ইউরোলজি ও ট্রান্সপ্লান্ট বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন। কিডনি ফাউন্ডেশনের সভাপতি অধ্যাপক হারুন আর রশিদের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে সম্মেলনের উদ্বোধন করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের স্বাস্হ্য উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) ডা. এএসএম মতিউর রহমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্হিত হন, স্বাস্হ্য সচিব একেএম জাফর উল্লা খান ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর মোঃ তাহির। সন্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্হিত ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক এম আর খান, পাকিস্তানের করাচির সিন্দ ইসটিটিউট অব ইউরোলজি অ্যান্ড ট্রান্সপ্লান্ট পরিচালক প্রফেসর আদিবুল হাসান রিজভী, জার্মানির লুবেগ ইউনিভার্সিটির ট্রান্সপ্লান্ট সার্জন ডা. সিজি বুর্গ, ভারতের চেন্নাইয়ের বামচন্দ্রন মেডিকেল কলেজের ট্রান্সপ্লান্ট সার্জন সুনীল শরফ প্রমুখ। কীভাবে মৃত ব্যক্তির দেহ থেকে জীবিত অকেজো রোগীর দেহে কিডনি প্রতিস্হাপন করা যায় এবং কীভাবে ল্যাপরোস্কপিক ডোনার নেফরেকটমির মাধ্যমে পেট না কেটে কিডনি সংযোজন করা যায় বিদেশি বিশেষজ্ঞরা সেমিনারে তার ডেমো প্রদর্শন করেন ও বিস্তারিত আলোচনা করেন। এছাড়াও কিডনি সংযোজন করেছেন এমন কয়েকজন রোগী তাদের অভিজ্ঞতার কথা আলোচনা করেন অনুষ্ঠানে।

স্বাস্হ্য উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) ড. এএসএম মতিউর রহমান বলেন, দেশের ১৫ কোটি লোকের মধ্যে যদি এক থেকে দেড় কোটি লোক কিডনি রোগী হন তবে তা বেশ চিন্তার কথা। কিডনি ফেলিওর রোগীর চিকিৎসা অনেক ব্যয়বহুল যা করার সামর্থ ১০ ভাগ লোকেরই নেই। তিনি বলেন, কিডনি রোগে ডোনারের সমস্যা একটা বড় সমস্যা। এর সমাধানে দেশে ক্যাডাভারিক বা মৃত লোকের কিডনি সংযোজন ব্যবস্হা চালু হলে তাৎক্ষণিক সেসব মৃতপ্রায় লোকদের কাছ থেকে কিডনিসহ দরকারি অর্গানগুলো বিযুক্ত করে হাজার হাজার মুমুর্ষু রোগীর জীবন বাঁচানো সম্ভব হবে।

প্রফেসর আবিদুল হাসান রিজভী বলেন, উন্নত বিশ্বে কিডনি রোগীদের শতকরা ৭০ থেকে ৭৫ ভাগ কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট হয় মৃত ব্যক্তির কিডনি সংযোজনের মাধ্যমে। এ ব্যবস্হায় সফলতার হার নব্বই ভাগ। আমরা বাংলাদেশে এসে দেখেছি সে ধরনের সুযোগ-সুবিধা এখানে রয়েছে। তাই বাংলাদেশেও তা সম্ভব।

জার্মানির ট্রান্সপ্লান্ট সার্জন ডা. সিজি বুর্গ বলেন, প্রথম কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট শুরু হয় ১৮৮০ সালে। বাংলাদেশে এতদিনে এটা চালু হওয়া উচিত ছিল, আর বাংলাদেশে এটা ২০০৬ সালে প্রথমবারের মতো চালু করতে পেরে আমরাও গর্বিত।

কিডনি ফাউন্ডেশনের সভাপতি অধ্যাপক হারুন আর রশিদ বলেন, একজন মৃতব্যক্তি পারে একসঙ্গে ৫ জন মানুষকে বাঁচাতে। প্রথমত তার দুটি কিডনি দু’জন, একটা লিভার একজনের দেহে, একটা ফুসফুস একজনের দেহে, একটা হার্ট একজনের দেহে প্রতিস্হাপন করে ভিন্ন ভিন্ন পাঁচজন রোগীকে বাঁচিয়ে তোলা সম্ভব। তিনি এর জন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ‘ব্রেইন ডেথ কমিটি’ গঠন এবং ঢাকার জন্য একটি পুর্ণাঙ্গ ‘অরগান প্রকিউরম্যান কমিটি’ গঠন করার আহ্বান জানান। যে কমিটির কাজ হবে ব্রেইন ডেথ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে রোগীর কাছে আত্মীয়কে অঙ্গ দানে সম্মত করা এবং রোগীর আত্মীয়-স্বজন রাজী হলে অর্গান প্রকিউর করে তা সংরক্ষণের ব্যবস্হা করে উপযুক্ত হাসপাতালে পৌঁছে দেয়া। এ পদ্ধতি কার্যকর করা গেলে বাংলাদেশে হাজার হাজার কিডনি অকেজো রোগীসহ অন্যান্য রোগী নতুন জীবন ফিরে পেতে পারেন বলে তিনি সেমিনারে আশা প্রকাশ করেন।

ক্যাডাভারিক কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট কী?
যখন মৃত ব্যাক্তির দেহ থেকে কিডনি নিয়ে জীবিত কোনো কিডনি অকেজো রোগীর দেহে প্রতিস্হাপন করা হয় তখন তাকে ক্যাডাভারিক কিডনি ট্রান্সপ্লান্টেশন বলা হয়। যে হাসপাতালে কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট করা হবে সে হাসপাতালে একটি ব্রেইন ডেথ কমিটি এবং একটি অর্গান প্রকিউরমেন্ট কমিটি থাকবে। এরপর কিডনি অকেজো রোগী যারা ট্রান্সপ্লান্ট করাতে আগ্রহী তাদের সঙ্গে ব্লাড গ্রুপ এবং টিস্যু টাইপিংয়ের মিল বের করে নেয়া হয়। এরপর সংগৃহীত কিডনিটিকে জীবন রক্ষাকারী মেশিনের দ্বারা কার্যক্ষম রাখা হয়। এই অবস্হায় মৃত ব্যক্তির কিডনি নিয়ে বরফের ভেতর রেখে ৩-১৭ ঘণ্টার মধ্যে সম্ভাব্য রোগীর কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

ল্যাপরোস্কপিক পদ্ধতিতে কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট কী?
এতদিন বাংলাদেশে কিডনি ট্রান্সপ্লান্টেসনের জন্য ডোনারের পেট কেটে কিডনি নেয়া হতো এবং সে কিডনি অকেজো রোগীর দেহে ট্রান্সপ্লান্ট করা হতো। কিন্তু উন্নত বিশ্বের অনেক দেশে পেট না কেটে ল্যাপরোস্কপির মাধ্যমে কিডনি নেয়া হয়। এ পদ্ধতিতে কিডনি ডোনারের পেট না কেটে ল্যাপরোস্কপির মাধ্যমে কিডনি নিয়ে কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট সম্পম্ন করা হয়। যাকে বলে-ল্যাপরোস্কপিক ডোনার নেফরেকটমি (খথহথড়সঢ়ধসহমধ উসষসড় ঘপহভড়পধয়সশী)। ইতোমধ্যে কিডনি ফাউন্ডেশনে ল্যাপরোস্কপিক পদ্ধতিতে কয়েকটি কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট সফলভাবে সম্ভব হয়েছে। এ নেফরেকটমি পদ্ধতিতে কিডনি ট্রান্সপ্লান্টের সুবিধা হলো এতে কিডনি ডোনারের হাসপাতালে অবস্হান করার সময় কম লাগবে। যেখানে ৬ থেকে ১০ দিন থাকতে হতো সেখানে মাত্র দুই দিন হাসপাতালে থেকেই তিনি বাড়িতে ফিরে যেতে পারবেন। পরবর্তী সময়ে এ প্রযুক্তি দিয়ে নিয়মিতভাবে কিডনি সংযোজন শুরু করলে ডোনারকে আর হাসপাতালে থাকতে হবে না। এতে খরচও অনেক কমে যাবে।

জাতীয় সংসদ কর্তৃক গৃহীত মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন বিধান আইন ও ধর্মীয় বিধান বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ কর্তৃক গৃহীত মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজনের বিধান করার উদ্দেশে প্রণীত ‘মানব দেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন; ১৮৮৮’ নামে অভিহিত আইনের ধারা-৫ এ বলা আছে ‘কোনো ব্যক্তির ব্রেইন ডেথ ঘোষণার পর ১. সে ব্যক্তি যদি তাহার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কাহারও দেহে সংযোজনের উদ্দেশ্যে উইল করিয়া থাকে অথবা ২. তাহার কোনো আইনানুগ উত্তরাধিকারী যদি উক্ত ব্যক্তির দেহ হইতে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিযুক্ত করিবার জন্য লিখিত অনুমতি প্রদান করিয়া থাকে অথবা ৩. উক্ত ব্যক্তির চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে যদি কেহ মৃতদেহ দাবি না করেন, তাহা হইলে সেই মৃত ব্যক্তির অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিযুক্ত করা যাইবে। আবার একই আইনের ৫ এর (১) ধারায় বলা আছে মেডিসিন, নিউরোলজি অথবা ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিনে বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বা সহযোগী অধ্যাপক অথবা সহকারী অধ্যাপক বা সমমর্যাদার অন্যুন তিনজন চিকিৎসক যৌথভাবে কোনো ব্যক্তির ব্রেইন ডেথ ঘোষণা করতে পারে।

সৌদি আরবসহ অন্য মুসলিম ওলামাগণ ১৮৭৭ সালে এ মর্মে উপনীত হন যে, মৃত্যুর পর কিডনিসহ অন্যান্য অঙ্গ দান করায় সামাজিক বা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো বাধা নেই। ফলে দুই দশক ধরে সৌদি আরবসহ অন্যান্য আরব দেশে সাফল্যজনকভাবে মৃত ব্যক্তির কিডনিসহ অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন করা হচ্ছে।

দ্বিতীয় সেশনে শুরু হয় বৈজ্ঞানিক সেমিনার। এখানে আলোচনা করেন প্রফেসর আব্দুস সালাম, প্রফেসর মোঃ মুহিবুর রহমান, প্রফেসর এমএ ওয়াহাব, ডা. শহিদুল ইসলাম সেলিম প্রমুখ। আরো জানানো হয় বাংলাদেশে এ মুহুর্তে অবস্হান করছে জার্মান, ভারত ও পাকিস্তানের একদল ট্রান্সপ্লান্ট সার্জন যারা ল্যাপরোস্কপির মাধ্যমেও মৃত রোগীর কিডনি সংযোজনের সঙ্গে জড়িত। ইতোমধ্যে জার্মান সার্জারি দলটি কিডনি ফাউন্ডেশনে তিনজন রোগীর দেহে এ পদ্ধতিতে কিডনি ডোনারের পেট না কেটে কিডনি নিয়ে কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট সম্পন্ন করেছে।

দেশে প্রথমবারের মতো যুগান্তকারী বিষয় হলো মৃত রোগীর কিডনি সংযোজন ও ল্যাপরোস্কপির মাধ্যমে রোগীর কিডনি সংযোজন। এর সঙ্গে সুচিত হলো একটি নতুন ইতিহাস।

*********************************
লেখকঃ আতাউর রহমান কাবুল
উৎসঃ দৈনিক আমার দেশ, ২৭ নভেম্বর ২০০৭