এইডস রোগের মূলে রয়েছে এইচআইভি সংক্রমণ। এটি যে এখনো পৃথিবীতে রয়েছে, এ জন্য যে আমাদের অনেক কিছু করার আছে-সেসব বিষয় স্মরণ করিয়ে দেওয়াও দিবসটি পালনের অন্যতম উদ্দেশ্য।

ইউএন এইডস সংস্থার অনুমান অনুযায়ী, সারা বিশ্বে এইচআইভিতে সংক্রামিত লোকের সংখ্যা ৩৯·৫ মিলিয়ন; এর মধ্যে ২·৩ মিলিয়নই শিশু। ২০০৬ সালে ৪·৩ মিলিয়ন লোক এইচআইভিতে সংক্রামিত হয়েছে নতুনভাবে। এইচআইভিতে সংক্রামিত মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বয়স ২৫ বছরের কম এবং ৩৫ বছর হওয়ার আগেই এদের মৃতুøর আশঙ্কা রয়েছে।

এইচআইভি/এইডসে আক্রান্ত রোগীদের ৯৫ শতাংশ রয়েছে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। বিশ্বজুড়ে এখন নারী-পুরুষ-শিশু-নির্বিশেষে এই সংক্রমণের হুমকির মুখোমুখি।
বিশ্ব এইডস দিবস প্রথমে আয়োজন করেছিল ইউএন এইডস। এরপর এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ২০০৫ সালে মূল দায়িত্ব পড়ে ওয়ার্ল্ড এইডস ক্যাম্পেইনের (ডব্লিউএসি) ওপর।

এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য বিষয় হলো ‘নেতৃত্ব’, আর ্লোগান হলোঃ ‘রুখব এইডসঃ রাখব অঙ্গীকার’।
এ বছরের জন্য নির্বাচিত এই থিম-‘নেতৃত্ব’-যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। এইডস রোগের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েও একে মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন আমাদের উদ্ভাবনী চিন্তা, দূরদৃষ্টি ও ধৈর্য। এ অভিযানের মধ্য দিয়ে আহ্বান জানানো হচ্ছে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে-কেবল সরকার নয়; সাধারণ মানুষ, পরিবার, সুশীল সমাজ, সবাইকে এইডস মোকাবিলায় উদ্যোগী হতে হবে, নেতৃত্ব দিতে হবে। সর্বস্তরের মনুষকে সম্পৃক্ত করা ছাড়া এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা কঠিন।

তাই এ অভিযান চলবে ২০১০ সাল পর্যন্ত, আর বিশ্বের জন্য এ রোগের পরিস্থিতি সম্পর্কিত একটি থিমও নির্বাচন করা হবে।

শিশুদের এইডস থেকে বাঁচানোর অঙ্গীকার পালনও জরুরি হয়ে পড়েছে। এ বছরের থিমকে অবলম্বন করে কিছু সংগঠন শিশুদের যাতে এ রোগ না হয়, সে উদ্দেশ্যে অভিযানে নেমেছে। সংক্রামিত মায়ের কাছ থেকে শিশুর মধ্যে যাতে এ ভাইরাস না ছড়ায় সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে তারা। শিশুরা যাতে এ ভাইরাসে সংক্রামিত না হয় সে জন্য বর্তমানে উন্নয়নশীল বিশ্বে সংক্রামিত মায়েদের মাত্র নয় শতাংশ এ ধরনের চিকিৎসার আওতায় রয়েছেন। বাকি ৯১ শতাংশ মা রয়েছেন-এর বাইরে। ফলে প্রতিবছর পাঁচ লাখ শিশু এইচআইভিতে সংক্রামিত হচ্ছে। তাই এ অভিযানের মাধ্যমে সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে এ ব্যাপারে উদ্যোগী হতে বলা হচ্ছে।

এইডস প্রথম আবিষ্কৃত হয় ১৯৮০ সালের গোড়ার দিকে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসকেরা কিছু রোগীর মধ্যে অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখতে পান। প্রথমে দেখা যায় নিউইয়র্ক ও ক্যালিফোর্নিয়ার কিছু প্রমোদবালকের মধ্যে এমন কিছু অসুখ, যেমন-কাপোসিস সার্কোমা, ত্বকের বিরল এক ধরনের ক্যান্সার এবং শ্বাসযন্ত্রের পাখিবাহিত এক ধরনের সংক্রমণ। পরপরই এ রকম অসুখ দেখা গেল শিরায় নেশার ওষুধ নেয় কিংবা অনিরাপদ রক্ত নিয়েছে এমন লোকদের মধ্যে। ১৯৮২ সালে এ রোগের একটি নামও হলো-‘অ্যাকোয়ার্ড ইমুন ডেফিসিয়েন্সি সিনড্রোম’-সংক্ষেপে এইডস (অওউঝ)। এইডস রোগের মূলে আছে যে ভাইরাস, এর নাম ‘হিউম্যান ইমুনোডেফিসিয়েন্সি ভাইরাস’ বা এইচআইভি। সংক্রামিত দেহতরলের সরাসরি সংস্পর্শে ছড়ায় এ সংক্রমণ।

এ ভাইরাস আক্রমণ করে দেহের প্রতিরোধব্যবস্থাকে। সংক্রমণ প্রতিরোধক্ষমতা খর্ব হতে থাকে শরীরের, আর শরীর অসহায়ভাবে আত্মসমর্পণ করে সরল-সহজ জীবাণুর সংক্রমণের কাছে। দেহপ্রতিরোধী সেই কোষগুলো হলো এক ধরনের শ্বেতকণিকা-‘টি কোষ’ বা ঈউ৪ কোষ। বলা হয় যে এইচআইভিতে সংক্রামিত লোকদের দেহে এই কোষ গণনা যখন ২০০-এর নিচে পেঁৗছায়, তখনই এইডস রোগের সূচনা হয়। এইডস কেবল একটি রোগ নয়, কয়েকটি রোগের সমষ্টিরূপে প্রকাশ পায়। এ জন্য এর নামকরণ করা হয়েছে ‘সিনড্রোম’ বা ‘রোগসমষ্টি’।

দেহের প্রতিরোধশক্তি সুস্থ রয়েছে এমন লোকদের মধ্যে যেসব সাধারণ ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও পরজীবী গুরুতর রোগ ঘটাতে পারে না, সেগুলোও এইচআইভিতে আক্রান্ত লোকদের মধ্যে ঘটায় সুবিধাবাদী মারাত্মক অসুখ। আর মৃত্যুও ঘটে সে জন্য। মানুষের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণের প্রধান পথ হলো অনিরাপদ যৌনমিলন।

অবশ্য অনিরাপদ রক্ত নিলে, নেশার ওষুধ গ্রহণকারী লোকদের সংক্রামিত সুচ ভাগাভাগি করে ব্যবহার করলে, সংক্রামিত মা থেকে শিশুর মধ্যে এ সংক্রমণ ঘটতে পারে। আক্নিকভাবে সংক্রামিত সুচের আঘাত পেলে, সংক্রামিত রেজর বা ক্ষুর ব্যবহার করলে, দেহযন্ত্র সংস্থাপনের মাধ্যমেও কদাচিৎ সংক্রমণ ঘটতে পারে।
তবে কোলাকুলি, করমর্দন, স্পর্শ করলে, থালাবাসন ব্যবহার করলে, টয়লেট শিট ব্যবহার করলে, হাঁচি বা কাশির মাধ্যমে, খেলাধুলা করলে, পতঙ্গের দংশনে এইচআইভি ছড়ায় না।

এ রোগের চিকিৎসা হয় ভাইরাসরোধক ওষুধ দিয়ে; তবে নিরাময় হয় না। আর চিকিৎসা এত ব্যয়বহুল যে, করাও কঠিন। টিকা আবিষ্কার সুদূরপরাহত। তাই প্রতিরোধই এর প্রধান উপায়।

এইডস সম্পর্কে জানতে হবে, সবাইকে জানাতে হবে। স্বামী-স্ত্রীর মিলনকে, সমাজের প্রচলিত মূল্যবোধকে, ধর্মীয় অনুশাসনকে এইডস রুখতে যাওয়ার পথে প্রধান উপায় বলে আমাদের জানতে হবে।

নিরাপদ যৌনমিলন, কনডম ব্যবহার-এসব বিষয়ও প্রতিরোধের উপায় হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। ‘নিরাপদ যৌনতা’ বিষয়টি শিক্ষার মাধ্যমে জনগণকে বোঝাতে হবে। অনিরাপদ রক্তভরণ না নেওয়া, একবার ব্যবহার্য (ডিসপোজেবল) সুচ ও সিরিঞ্জের ব্যবহার, সেলুনে রেজর বা ব্লেড নতুন ব্যবহার করা, গর্ভধারণের আগে সংক্রামিত মায়ের চিকিৎসা পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
এসব ব্যাপার, চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার এ আয়োজন সবাইকে নিয়ে করতে হবে।

সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা, নির্মল জীবনযাপন, রোগ সম্পর্কে জানা ও অন্যকে জানানো এইডস রুখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাই আসুন সবাই সম্মিলিতভাবে এইডস রুখতে ঐক্যবদ্ধ হই।

********************************
লেখকঃ অধ্যাপক ডা· শুভাগত চৌধুরী
পরিচালক, ল্যাবরেটরি সার্ভিসেস,
বারডেম হাসপাতাল, ঢাকা।
উৎসঃ দৈনিক প্রথম আলো, ২৮ নভেম্বর ২০০৭