স্বাস্থ্যকথা

হাড়

মামুন সাহেব (ছদ্মনাম)। বয়স ৩৫ পেরিয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রম করেন। নিজেই গাড়ি চালান। মাথায় রাজ্যের টেনশন নিয়ে কাটে দিন। আয়েশের জন্য ফোমের বিছানায় ঘুমান। হঠাত্ একদিন সকালে উঠে দেখলেন, ঘাড় ঘোরাতে পারছেন না। প্রচণ্ড ব্যথা। ব্যথায় হাত ঝিঁঝি করছে। পিঠের দিকেও যাচ্ছে ব্যথা। এ অবস্থায় অনেক ক্ষেত্রেই রোগীরা চিকিত্সকের পরামর্শ নেন না। নিজে নিজেই ব্যথার ওষুধ খান বা গরম সেঁক দিয়ে ব্যথা উপশমের চেষ্টা করেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে খেয়াল রাখবেন, ঘাড়ের ব্যথা হাত বা পিঠের দিকে যাচ্ছে কি না। এ রকম হলে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। ঘাড়ের একটি এক্স-রে করান। এতেই আপনার ঘাড় ব্যথার প্রকৃত কারণ বের হয়ে আসবে।
যক্ষ্মা রোগ এ দেশে মারাত্মক রোগ হিসেবে পরিগণিত ছিল। কথায় আছে, ‘যার হয় যক্ষ্মা তার নাই রক্ষা’। সময়ের ব্যবধানে মানুষ এই রোগ জয় করতে পেরেছে। যক্ষ্মা রোগ বলতে মানুষ সাধারণত ফুসফুসের রোগকেই বুঝে থাকে। কিন্তু যক্ষ্মা ফুসফুস ছাড়াও শরীরের অন্যান্য স্থানেও হতে পারে। তন্মধ্যে অস্থি ও অস্থিসন্ধি অন্যতম। অস্থির মধ্যে কশেরুকা ও অস্থিসন্ধিতে যক্ষ্মা বেশি দেখা যায়। লম্বা অস্থি কিংবা হাত ও পায়ের অস্থিতে যক্ষ্মা দেখা দিতে পারে। প্রথমে অস্থিসন্ধি আক্রান্ত হয়। তারপর অস্থিতে ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত অংশ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং সেখান থেকে পুঁজ জাতীয় পদার্থ বের হতে পারে।
বয়স বাড়ার সাথে সাথে অস্টিওপোরোসিস বা হাড়ের ক্ষয় হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে থাকে। ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ‘ডি’-এর অভাবে অস্থির পুষ্টি ব্যাহত হয়। মেয়েদের মধ্যে অস্টিওপোরোসিস রোগে আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি। অস্টিওপোরোসিস রোগের অনেক কারণ রয়েছে। এ রোগে হাড়ের ক্ষয় একটু দ্রুতগতিতে ঘটতে থাকে।
অষ্টিও আর্থাইটিসে কষ্ট পান অনেকেই। অষ্টিও আর্থ্রাইটিস শব্দটির সঙ্গে ব্যথা-বেদনার একটা নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। বিভিন্ন ধরনের আর্থ্রাইটিসের মধ্যে সবচেয়ে কমন হচ্ছে অষ্টিও আর্থ্রাইটিস। এটি হচ্ছে এক ধরনের ডিজেনারেটিভ আর্থ্রাইটিস। শরীরের বিভিন্ন জয়েন্টে হাড়ের শেষ প্রান্তে যে কার্টিলেজ থাকে তা একটা কুশনের মতো কাজ করে। ক্রমাগত মুভমেন্টের ফলে জয়েন্টের হাড়ের মধ্যে ঘর্ষণ হয়। এই ঘর্ষণের কারণে সম্ভাব্য ক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা করে কার্টিলেজ। নানা কারণে ক্ষয় হতে হতে এই কার্টিলেজের টোটাল ক্ষতি হয়। এর ফলে অষ্টিও আর্থাইটিস হয়, জয়েন্টে ব্যথা হয় ও মবিলিটি কমতে থাকে। জয়েন্ট মার্জিনে নতুন হাড় তৈরি হয়।
অস্থিক্ষয় বা অস্টিও পোরেসিস হচ্ছে এমন একটি অসুখ যার ফলে অস্থি বা হাড়ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। হাড়ের শক্তি কমে যায়, ফলে প্রবণতা তৈরি হয় হাড় ভাঙ্গার। অস্টিও পোরোসিসের দ্বারা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় যে হাড়গুলি তারা হচ্ছে মেরুদন্ডের ছোট ছোট হাড় (কশেরুকা), কবজি, বাহু এবং বস্থি প্রদেশের হাড়গুলি।
বাতজনিত কারণেই কোমরে ব্যথা বেশি হয়ে থাকে। বিভিন্ন বয়সে বিভিন্ন ধরনের বাত দেখা দেয়। তবে বয়স বাড়লে সাধারণত লাম্বার স্পনডাইলোসিস নামক বাত জাতীয় রোগের জন্য কোমরে ব্যথা হয়ে থাকে। এখানে বার্ধক্যজনিত কোমরে ব্যথা নিয়ে আলোচনা করব। মেরুদণ্ডের নিচের হাড়ের মধ্যবর্তী তরুণাস্থি বা ডিস্কের বার্ধক্যজনিত পরিবর্তনের ফলেই এ রোগের সূত্রপাত হয়। তরুণাস্থির এ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মেরুদণ্ডের নিচের দিকে সংবেদনশীল পরিবর্তন সাধিত হয়। সাধারণত এ পরিবর্তন ৩০ বৎসর বয়স থেকে শুরু হয় এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা বাড়তে থাকে।
আমাদের শরীরে ২০৬টি হাড় রয়েছে। এই হাড়গুলো বিভিন্ন বন্ধনী দিয়ে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। শরীরের যে স্থানে দুটো হাড় বা অস্থি একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাকে বলে অস্থিসন্ধি বা হাড়ের গাঁথুনি বা হাড়ের সংযুক্তি। আমাদের শরীরে এমন অসংখ্য হাড় আছে। এই হাড়গুলোর মধ্যে অস্থিবন্ধনী রয়েছে। অস্থি, মাংসপেশি ও লিগামেন্ট দিয়ে অস্থিবন্ধনী তৈরি হয়। লিগামেন্ট কিছুটা স্থিতিস্থাপকতাসমৃদ্ধ, ভীষণ শক্ত, সাদা বর্ণের বিশেষ ধরনের মাংসপেশি। এটি হাড়ের গাঁথুনিতে শক্ত রশির মতো কাজ করে।
হাটু, কোমর আর গোড়ালিকে যদি সচল ও প্রানবন্ত রাখা না যায়, সুখে স্বস্তিতে না রাখা যায় তাহলে জীবনেও তো স্বস্তি আসে না।