উন্নত বিশ্বে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ হার্ট অ্যাটাকের রোগী উপযুক্ত চিকিৎসা শুরু করার আগেই মৃত্যুবরণ করেন এবং মস্তিষ্কের স্ট্রোক রোগীদের জন্য উন্নত চিকিৎসা এবং ব্যবস্থাপনা থাকলেও স্ট্রোকের ফলে ৬০ ভাগ রোগী মৃত্যু বা পঙ্গুত্ববরণ করেন। হার্ট অ্যাটাক ও ব্রেন স্ট্রোকের অন্যতম মূল কারণ হচ্ছে উচ্চ রক্তচাপ। ঝুঁকিপূর্ণ কয়েকটি শারীরিক সমস্যা ও ঝুঁকিপূর্ণ কয়েকটি উপাদান নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোক থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব হতে পারে।

ঝুঁকিপূর্ণ উপাদানগুলোর ক্ষতিকর অবদানঃ

তামাকঃ তামাক শরীরে অক্সিজেনের পরিমাণ কমিয়ে দেয়, যার ফলে হৃদপিণ্ড ও মস্তিষ্কের কাজের ব্যাঘাত ঘটায়। তামাকের ক্ষতিকারক পদার্থগুলো রক্তনালী ও ফুসফুসের ক্ষত সৃষ্টি করে। তাই অধিক তামাক ব্যবহারে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক ও ক্যান্সারের বৃদ্ধি ঘটায়।

স্বাস্থ্য অনুপযোগী খাবারঃ অসম খাদ্য বলতেই

০ অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ (অতিরিক্ত ক্যালরি)

০ অধিক চর্বি, শর্করা ও লবণ

০ অপর্যাপ্ত ফল ও সবজি গ্রহণ

অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ তারই সাজে যিনি অতিরিক্ত পরিশ্রম করেন। শারীরিক পরিশ্রম কম অথচ অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ ওজন বৃদ্ধির জন্য দায়ী। অধিক ওজন, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও উচ্চ কোলেস্টেরল (রক্তের চর্বির আধিক্য) অকাল মৃত্যুর ঝুঁকিসমূহের বৃদ্ধি ঘটায়। এরূপ অবস্থার বৃদ্ধি ঘটতে ঘটতে শরীরের কেন্দ্রে অর্থাৎ পেট ও পেটের পাশে মেদ জমানোই হলো হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের জন্য সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি। অসম খাদ্য বলতে ফাস্টফুড জাতীয় খাবার, যার সঙ্গে আবার অধিক চর্বি, লবণ ও শর্করা রয়েছে। শর্করানির্ভর বিভিন্ন কোমল পানীয় নিত্যই ক্ষতি করছে অনেক বেশি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ঝুঁকি এমনিতে বৃদ্ধি পায় তবে অনিয়মিত খাদ্যখাবার ও অত্যধিক ওজন অল্প বয়সে মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। আর্থিক সচ্ছলতার সঙ্গে সঙ্গে অনেক উন্নয়নশীল দেশের উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠীর শরীরের ওজন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমনকি অল্প বয়সে বয়সকালীন ডায়াবেটিস (টাইপ-২ ডায়াবেটিস) একরূপ মহামারি আকারে বিস্তার লাভ করছে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, দুই দশক পূর্বে চীন দেশের জনসাধারণের হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুর অবস্থান অসুখসমূহের ৬ষ্ঠ অবস্থানে ছিল অর্থাৎ মাত্র ৬%। কিন্তু বর্তমানে তা বৃদ্ধি পেয়ে অসুস্থতাজনিত মৃত্যুর ১ম স্থানে উন্নীত হয়েছে যা ২৭%। আধুনিক চীনে ফাষ্ট ফুড কালচার ও বিলাসবহুল জীবন যাপনকে এ জন্য গবেষকরা দায়ী করছেন। শারীরিক পরিশ্রমঃ এক কথায় শারীরিক পরিশ্রম-বিমুখতা হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেকাংশে বৃদ্ধি করে।

০ পরিশ্রম শর্করা ও চর্বিকে পুড়ে ফেলে এবং ওজন সঠিক রাখতে সাহায্য করে

০ উচ্চ রক্তচাপ কমিয়ে আনে

০ শরীরের অক্সিজেনের চাহিদা বাড়ায় ও দুশ্চিন্তা কমায়

০ হৃদ মাংসপেশি ও হাড়গুলোকে শক্তিশালী করে

০ রক্ত চলাচল বৃদ্ধি করে ও মাংসপেশি সতেজ রাখে

উচ্চ রক্তচাপঃ আমাদের দেশে উচ্চ রক্তচাপের পরিমাণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বয়স্ক জনগোষ্ঠীর মধ্যে বর্তমানে ১৫-২০% জনগণ উচ্চ রক্তচাপে ভোগেন। আমেরিকায় বর্তমানে এক-তৃতীয়াংশ জনসাধারণ উচ্চ রক্তচাপে ভোগেন। অর্ধেক ভুক্তভোগীই অবশ্য সে বিষয়ে জানেন না। উচ্চ রক্তচাপ মানেই রক্ত শিরার গায়ে জোরে আঘাত আর এ জন্য হৃৎপিণ্ডের বেশি পরিশ্রম করতে হয় এবং শেষে হৃদযন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে। উচ্চ রক্তচাপ মানেই হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বৃদ্ধি। এসব ঝুঁকি কমাতে শারীরিক পরিশ্রমের সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্যকর খাদ্য প্রয়োজন। রক্তচাপ স্বাভাবিক অর্থাৎ ১২০/৮০ মিমি পারদ রাখার জন্য প্রয়োজনে অল্প ওষুধ ও চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে।

ডায়াবেটিস (রক্তে শর্করার আধিক্য): রক্তে বেশি শর্করা মানেই রক্তনালিতে বাধা ও রক্ত জমাটের আশঙ্কা এবং সেই সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ বা অধিক ওজন বা ধূমপান হার্ট অ্যাটাক, কিডনি রোগ, স্ট্রোক, ক্যান্সার ইত্যাদির আশঙ্কাকের অনেকগুণে বৃদ্ধি করে।
রক্তে চর্বির আধিক্য (উচ্চ মাত্রায় কোলেস্টেরল): রক্তে চর্বির মাত্রা বেশি মানেই মৃত্যুঝুঁকিও বেশি। বেশি চর্বি রক্তনালিতে জমে রক্তনালিকে সরু ও শক্ত করে ফেলে, পরিণতিতে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক হয়। রক্তনালিতে চর্বি কমানোর জন্য কম চর্বি জাতীয় খাবার খাওয়ার বিকল্প নেই, বিশেষ করে পশুর চর্বি তবে মাছের তেল আবার অনেকাংশে উপকারী।

ওজন কমানো, পরিশ্রম বা ব্যায়াম করা ও প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ মত চলতে হবে। মনে রাখতে হবে অধিক ভাত ও আলু, মিষ্টিমিষ্টান্ন খাওয়ার ফলে অধিক চর্বি (ট্রাইগিস্নসারেড কোলেস্টেরল) এমনিতেই বেশি থাকে। যা কমানো জরুরি। ফল-মূল ও সবজি বেশি পরিমাণে কিন্তু লবণ কম অর্থাৎ সর্বাধিক ৫ গ্রাম পর্যন্ত খাওয়া যাবে। এক/দুই বার খুব বেশি করে না খেয়ে ঘন ঘন অর্থাৎ ৫/৬ বার অল্প অল্প করে খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। প্রত্যহ প্রয়োজনীয় পরিশ্রম অর্থাৎ ৩০-৪০ মিনিট জোরে হাঁটা, খেলাধুলা বা বাগানবাড়ির কাজ করতে হবে। এতদসঙ্গে দুশ্চিন্তা ও উচ্চ রক্তচাপ কমাতে পারলে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোক থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। এই সঙ্গে বহুমূত্র, কিডনী রোগ এমনকি কোন কোন ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণ করাও সম্ভব হবে।

**************************
ডাঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ
এম বি বি এস। এম পি এইচ (ইপিডিমিওলজি)
উন্নয়ন ও গবেষণা কর্মকর্তা
জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ও রিসার্চ ইন্সটিটিউট, দিনাজপুর। ফোনঃ ৬৫৭৩৫৬১০৭৭।
দৈনিক ইত্তেফাক, ১৫ নভেম্বর ২০০৮।